ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপাল-তিব্বতে বিপর্যয়

সীমান্তের একসময়ের ব্যস্ত বন্দরের চিহ্ন পর্যন্ত নেই

সীমান্তের একসময়ের ব্যস্ত বন্দরের চিহ্ন পর্যন্ত নেই
×

ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৩৯

যেখানে একসময় ব্যস্ত কোলাহল, তীর্থযাত্রী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল, সেখানে এখন কেবলই সুনসান নীরবতা আর কাদার সমুদ্র। হিমালয়ের কোলঘেঁষা নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত বন্দরটি দুই দেশের বাণিজ্য ও ধর্মীয় মেলবন্ধনের কেন্দ্র ছিল। গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া ভয়াবহ বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেই বন্দরটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, দুর্যোগের ১২ দিন পর গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সীমান্ত এলাকায় প্রবেশের সুযোগ দেয় চীন। তবে দূর থেকে দেখা সেই দৃশ্যে মেলে কেবলই ধ্বংসস্তূপ আর স্বজনহারাদের হাহাকার।

চীন-নেপাল সীমান্তের কিইরোং ক্রসিং থেকে সরেজমিন দেখা গেছে, দুই দেশের সংযোগকারী ব্যস্ত বন্দরটির কোনো চিহ্নই এখন আর অবশিষ্ট নেই। সীমান্ত পাহারা দেওয়া সেই ২০ মিটার উঁচু বিশাল তোরণটি ভেসে গেছে কাদার তোড়ে। তোরণটির জায়গায় এখন উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চীনের একটি লাল পতাকা। দুর্যোগের আগে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচতলা উঁচু চীনের কাস্টমস ভবনটি স্রেফ মাটির নিচে তলিয়ে গেছে। একমাত্র একটি ওয়াটার টাওয়ারের কিছু অংশ ছাড়া পুরোনো কোনো কাঠামোর অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে উজ্জ্বল কমলা রঙের পোশাক পরা উদ্ধারকর্মীরা ভূগর্ভস্থ রাডার এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে নিখোঁজ মানুষের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই কিইরোং সীমান্ত বন্দরটি নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০১৫ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর অন্য একটি পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই বন্দরটিই মূল ভরসা হয়ে ওঠে। প্রতিদিন চীনের তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য এই পথে নেপালে যেত। তবে শুধু বাণিজ্যই নয়, হিন্দু ও বৌদ্ধদের অন্যতম পবিত্র স্থান কৈলাস পর্বতে যাওয়ার প্রধান পথ ছিল এটি। প্রতিবছর হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী এই পথেই তিব্বতে যেতেন।

ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধারকাজ
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার মিটারেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত কিইরোং কাউন্টিতে উদ্ধারকাজ চালানো চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, ঘন কাদা ও নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। এলাকাটিকে বর্তমানে সাতটি অঞ্চলে ভাগ করে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। দীর্ঘ চেষ্টা শেষে সড়ক যোগাযোগ চালু হওয়ায় চীন ভারী যন্ত্রপাতি এনে কাদা সরানোর কাজ জোরদার করেছে।

পাশাপাশি সাময়িকভাবে বিদ্যুতের খুঁটি বসিয়ে ধ্বংসস্তূপে আলো ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তবে তিব্বত অঞ্চলে চীনের কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সেখানে উন্মুক্তভাবে যেতে পারছে না। উদ্ধারকাজের খবর প্রকাশ হলেও স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ সেখানে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

অলৌকিক কিছু ঘটার আশা
এএফপির খবর অনুসারে, সীমান্তের অপর পাশে নেপালে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই ভেসে আসছে জীবনের অবিশ্বাস্য সব গল্প। এই হিমালয় সুনামিতে নেপাল ও তিব্বতে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৩৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেপালে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩৪১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন চার হাজার ৯৯৬ জন। অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অংশে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে এবং সেখানে এখনও নিখোঁজ ৫১৯ জন।

এত বড় দুর্যোগের মধ্যেও গত কয়েক দিনে চারজনকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। গত শনিবার ৬৪ বছর বয়সী নেপালি নারী চন্দ্রিকা শ্রেষ্ঠাকে নিজের কাদায় ঢাকা ঘর থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ জানান, এই উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি পুরো জাতিকে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালে অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে প্রায় ৮৪ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল সরকার ইতোমধ্যে মৃতদেহ সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় ডিএনএ নমুনা রেখে শত শত দেহ গণকবরে দাফন করছে। এই প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়ের ১৩তম দিন আজ সোমবার নেপালে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হবে।

আরও পড়ুন

×