ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে ঝুঁকিতে পারস্য উপসাগরের বাস্তুতন্ত্র 

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে ঝুঁকিতে পারস্য উপসাগরের বাস্তুতন্ত্র 
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৫১

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ এখন স্থলভাগ ছেড়ে সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি এবং এর আশপাশের এলাকায় দুপক্ষই একে অপরের তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও বিভিন্ন জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের পাঁচটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালায়। এর জবাবে জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে আটটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারসহ ১০টি জাহাজে হামলা করে তেহরান। এর মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র আরও তিনটি ইরানি ট্যাঙ্কারে হামলা করার কথা জানিয়েছিল। 

আলজাজিরার একটি এক্সপ্লেইনারে বলা হয়েছে, পাল্টাপাল্টি এসব হামলায় পারস্য উপসাগরের বাস্তুতন্ত্র এখন চরম পরিবেশগত হুমকির মুখে পড়েছে। মেরিন ট্রাফিকের তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা ৪২টি বিশালাকায় ট্যাঙ্কারের মধ্যে অন্তত ১৮টিতে সরাসরি জ্বালানি তেল রয়েছে। জাহাজগুলোয় মোট প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার বা প্রায় এক কোটি ১১ লাখ ব্যারেল তেল রয়েছে। এই পরিমাণ তেল পুরো বিশ্বের এক দিনের মোট চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশের সমান। কোনো একটি বড় ট্যাঙ্কার ডুবে গেলে বা বিস্ফোরিত হলে, কোটি কোটি লিটার তেল পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে পড়বে। এতে উপকূলীয় এলাকা, মাছের প্রজনন কেন্দ্র এবং স্পর্শকাতর সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বিষাক্ত হয়ে উঠবে। 

ওমান উপকূলে ছড়িয়ে পড়া তেলের বিপর্যয় 

গত জুনের শুরুর দিকে ওমান উপকূল থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দূরে ‘ক্যারোলিন বেজেঙ্গি’ নামে একটি ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনার শিকার হয়। বিস্ফোরণের পর থেকেই জাহাজটি থেকে তেল সাগরে মিশছে। এ ছাড়া গত ৩ আগস্ট ‘মিনোয়ান পাইওনিয়ার’ নামে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আগুন ধরে যায়। ১০ আগস্টের উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায়, ইরানের কেশম দ্বীপ ও সিরি দ্বীপের কাছে সাগরে তেলের বিশাল আস্তরণ ভেসে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেশম দ্বীপের তেলের আস্তরণটি ওই ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। 

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত 

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান কেন্দ্রের গবেষক ফারেস আল-মোমানি ও পন্নুমনি ভেথামনি জানান, আশির দশক থেকেই পারস্য উপসাগর চরম পরিবেশ দূষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। ফলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সামুদ্রিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।  ৩৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের এই যুদ্ধ আবারও সেই ভঙ্গুর পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা আটকা পরা জাহাজগুলো থেকে প্রতিনিয়ত তেল লিক হওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন।  সাগরের পানির ওপর তেলের আস্তরণ জমে থাকলে তা প্রবাল প্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বনকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে। ওমানের সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হুসেইন সামহ আল-মাসরুরি জানান, তেলের বিষাক্ত উপাদান মাছের ডিম ও পোনা ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে মাছের বংশবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে উপকূলীয় জেলেদের জীবিকা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। 

সুপেয় পানির তীব্র সংকটের ভয়াবহতা

উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষ তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির জন্য সমুদ্রের পানি শোধনাগারের (ডিস্যালিনেশন প্লান্ট) ওপর নির্ভর করে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলেও অনেকগুলো পানি শোধনাগার রয়েছে, যার কয়েকটিতে ইতোমধ্যে মার্কিন হামলা হয়েছে। এই উপকূলীয় এলাকায় প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ মানুষের বাস।

সমুদ্রের পানিতে তেল মিশে গেলে শোধনাগারগুলোর প্রাথমিক পানি গ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়। যদিও আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে প্রাথমিক অবস্থায় তেল শনাক্ত করে প্লান্ট রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। তবে সংঘাত বাড়তে থাকলে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খাবার পানির হাহাকার তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

×