ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পিএসসির নিয়োগে প্রশাসনের ছায়া

পিএসসির নিয়োগে প্রশাসনের ছায়া
×

ছবি-সংগৃহীত

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৭ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:২৬

এবার সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আওতাভুক্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করেছে সরকার। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় এই কমিটি কীভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজ দ্রুত করতে সহায়তা করবে তা স্পষ্ট নয়। ফলে জনপ্রশাসনেই এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  

এর আগে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমানো এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এতে নিয়োগে স্বচ্ছতার ঘাটতি ও অনিয়মের আশঙ্কা করে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সোচ্চার হয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। প্রসঙ্গ গড়িয়েছে সংসদেও।   

গত রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে কমিটির প্রধান কাজ। প্রয়োজনে নতুন সদস্য যুক্ত করতে পারবে কমিটি। প্রয়োজন অনুযায়ী বৈঠকও করতে পারবে তারা। কমিটিকে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

এই পদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কৃষি মন্ত্রণালয়। তাদের অনুরোধে পিএসসি প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করেছে। বিসিএসের বাইরে এই নিয়োগও পিএসসির প্রাতিষ্ঠানিক কাজের অংশ। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদটি পিএসসির বৃহত্তর নন-ক্যাডার নিয়োগ কাঠামোর অংশ। ফলে এই একটি পদের নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে সরকারের পৃথক উচ্চপর্যায়ের কমিটি কেন প্রয়োজন– তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। 

নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে প্রশাসনিক কমিটি করা হলেও তাতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাউকে রাখা হয়নি। কমিটির কার্যপরিধি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিয়োগ কীভাবে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে এ বিষয়ে কার্যপরিধিতে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি।

কমিটি গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী গতকাল বুধবার রাতে সমকালকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখনও কোনো চিঠি পাইনি। আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) অফিসে গিয়ে দেখে বলতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের। এখানে জনপ্রশাসনের কাজ নেই।’

গত ৬ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। ৮ সেপ্টেম্বর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা/সমমান কৃষি কর্মকর্তা পদে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে পিএসসি। এতে ৪৩০ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। লিখিত পরীক্ষা হয়েছিল গত বছরের ৬ অক্টোবর। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পদটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১০ম গ্রেডভুক্ত। 

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মোট পদ রয়েছে ১৪ হাজার ১০০টি। এর মধ্যে তিন হাজার ৭৫১টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য পিএসসিতে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম সমকালকে বলেন, কমিটি গঠনের বিষয়ে মন্তব্য করা তাঁর পক্ষে সমীচীন হবে না। তবে শূন্য পদ পূরণের জন্য পিএসসিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এখন পিএসসি তাদের সুবিধা অনুযায়ী নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই কর্ম কমিশনের অন্যতম প্রধান কাজ। কিন্তু জারি করা প্রজ্ঞাপনে এই কমিটির কার্যপরিধি হিসেবে শুধু ‘নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ’-এর কথা বলা হয়েছে। কীভাবে এই গতি আনা হবে, পিএসসির কোন পর্যায়ে কমিটি কাজ করবে কিংবা কমিশনের চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কমিটির ভূমিকা কী– তা স্পষ্ট করা হয়নি। 

লিখিত পরীক্ষার পর প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা ও চূড়ান্ত নিয়োগের ধাপ সামনে। পিএসসির অধীনে চলমান একটি প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগে প্রশাসনের এই কমিটির প্রয়োজন কেন– জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, পিএসসির সুপারিশ ছাড়া নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে আপাতত দুটি পথ খোলা রয়েছে। এক. বিধিমালা সংশোধন করে পদগুলোকে পিএসসির আওতার বাইরে নেওয়া। দুই. অ্যাডহক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। দুটি প্রক্রিয়াতেই নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ এতে অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কা থাকে। 

একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, যদি সমস্যাটি পিএসসির সক্ষমতা বা দীর্ঘসূত্রতা হয়, তাহলে সেটি সমাধানের জন্য পিএসসির সঙ্গে সমন্বয় করা স্বাভাবিক পদ্ধতি। কিন্তু চলমান নিয়োগ কার্যক্রমের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কমিটি করে দিলে তা ভালো নজির হিসেবে বিবেচিত হবে না। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রিপরিষদের সাবেক এক সচিব বলেন, কার্যপরিধি স্পষ্ট না হওয়ায় কমিটির প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা বোঝা যাচ্ছে না। একজন প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে ওই কমিটির সদস্য করার বিষয়টিও দৃষ্টিকটু বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদ। উন্নত দেশগুলোতে সাধারণত এভাবে কমিটি করা হয় না। মন্ত্রিপরিষদের সচিবকে কমিটির সদস্য করার নজির বাংলাদেশেও খুব বেশি নেই।

আরও পড়ুন

×