ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্বে যখন ২০২৬, ইথিওপিয়ায় কেন শুরু হলো ২০১৯

বিশ্বে যখন ২০২৬, ইথিওপিয়ায় কেন শুরু হলো ২০১৯
×

ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে ইথিওপিয়ার মানুষজন। ছবি: এএফপি

দ্য ইকোনোমিক টাইমস

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:০৮

বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে যখন ২০২৬ সাল চলছে, তখন ইথিওপিয়ায় শুরু হয়েছে ২০১৯ সাল। গত ১১ সেপ্টেম্বর দেশটিতে উদ্‌যাপিত হয়েছে এনকুতাতাশ-ইথিওপিয়ার নববর্ষ। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে দেশটির প্রচলিত ক্যালেন্ডারের পার্থক্যের কারণে ইথিওপিয়া বিশ্বের প্রচলিত সময়গণনা থেকে প্রায় সাত থেকে আট বছর পিছিয়ে।

ইথিওপিয়ার এই ভিন্নধর্মী ক্যালেন্ডারের পেছনে রয়েছে দেশটির ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রাচীন সময়গণনার পদ্ধতি।

কেন ইথিওপিয়ার সাল ২০১৯?

ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডারে মোট ১৩টি মাস। প্রথম ১২ মাসের প্রতিটিতে ৩০ দিন করে থাকে। ১৩তম মাসটির নাম পাগুমে। সাধারণ বছরে এই মাসে পাঁচ দিন এবং অধিবর্ষে ছয় দিন থাকে।

গ্রেগরিয়ান ও ইথিওপীয় ক্যালেন্ডারের মধ্যে এই পার্থক্যের মূল কারণ যিশু খ্রিষ্টের জন্মতারিখ নির্ধারণে ব্যবহৃত ভিন্ন হিসাবপদ্ধতি। ইথিওপীয় ক্যালেন্ডার আলেকজান্দ্রীয় কালপঞ্জির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স তেওয়াহেদো চার্চের ঐতিহ্যে সংরক্ষিত হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমা ক্যালেন্ডার ষষ্ঠ শতকের ডায়োনিসিয়াস এক্সিগুয়াসের কালপঞ্জির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

এ কারণেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ২০২৬ সাল চললেও ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডারে শুরু হয়েছে ২০১৯ সাল।

ইথিওপিয়ার প্রাচীন সময়গণনাতেও প্রকৃতি ও ঋতুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রাচীন গিজ ভাষার লেখায় আকাশের বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ, ঋতু পরিবর্তন ও সময় পরিমাপের উল্লেখ পাওয়া যায়। কৃষিনির্ভর সমাজে ঋতুর পরিবর্তনও সময় নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল।

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন বছর

ইথিওপিয়ার নববর্ষের নাম এনকুতাতাশ। দেশটির প্রধান বর্ষাকাল শেষ হওয়ার সময় এই উৎসব আসে। ইথিওপিয়ার উচ্চভূমির বিভিন্ন এলাকায় এ সময় হলুদ রঙের আদেই আবেবা ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফলে উৎসবটির সঙ্গে ঋতু পরিবর্তন ও প্রকৃতিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

নববর্ষের আগের রাত থেকেই বিভিন্ন এলাকায় প্রস্তুতি শুরু হয়। এ সময় শুকনো ডালপালা ও কাঠ দিয়ে তৈরি ‘চিবো’ নামের মশাল জ্বালানো হয়। বর্ষার অবসান এবং রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের আগমনকে প্রতীকীভাবে বোঝায় এই মশাল।

প্রকৃতি, পরিবার ও কৃষির সঙ্গে এনকুতাতাশের এই যোগসূত্র ইথিওপিয়ার নিজস্ব সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্যালেন্ডারের মাস, বর্ষাকাল, ফুল ফোটা ও কৃষির মৌসুমি চক্র-সবকিছুই নববর্ষ উদ্‌যাপনের সঙ্গে যুক্ত।

ইতিহাসেও স্বতন্ত্র ইথিওপিয়া

ইথিওপিয়ার এই আলাদা ক্যালেন্ডার দেশটির স্বতন্ত্র ইতিহাসেরও একটি প্রতিফলন। আফ্রিকার প্রাচীন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ইথিওপিয়া ১৮৯৬ সালের আদওয়া যুদ্ধে ইতালীয় বাহিনীকে পরাজিত করে। আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতার সময় এই বিজয়ের মাধ্যমে দেশটি তার সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

তবে ১৯৩৫ সালে ইতালি আবার ইথিওপিয়া আক্রমণ করে এবং ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত দেশটির একটি বড় অংশ দখলে রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর সহায়তায় ইথিওপীয় প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত ইতালীয় দখলের অবসান ঘটায় এবং সম্রাট হাইলে সেলাসি ক্ষমতায় ফিরে আসেন।

ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডার তাই শুধু সময় গণনার একটি আলাদা পদ্ধতি নয়; দেশটির ধর্মীয় ঐতিহ্য, প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন এবং দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে জড়িত।
 

আরও পড়ুন

×