ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বন্দিশিবিরে আটকা পড়া শৈশব

বন্দিশিবিরে আটকা পড়া শৈশব
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২১ | ০৩:৪২ | আপডেট: ১৩ মে ২০২১ | ০৪:০৭

কোপিকার বয়স পাঁচ বছর। যেই বয়সে তার মুক্তভাবে হেসেখেলে বেড়ানোর কথা সেখানে তার শৈশবের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বন্দীদশায়। কারণ ২০১৯ সালে, তার পরিবারকে ভারত মহাসাগরের অস্ট্রেলিয়ান ফাঁড়ির ক্রিসমাস দ্বীপে একটি বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়।

অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ২৪ ঘণ্টার নজরদারিতে পরিবারের সাথে সেখানেই কাটছে তার শৈশব।  তবে বন্দিশিবিরে থাকলেও কোপিকা পুলিশ ভ্যানে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে । কোপিকার কাছে স্কুল খুশির জায়গা। কারণ সেখানে সে মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারে।

কোপিকার প্রশ্ন, কেন তাদেরকে সবসময় অনসুরণ করা হয়।

কোপিকার এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পেছনে তাকাতে হয়। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,  প্রায় এক দশক আগে শ্রীলঙ্কার তামিল শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় চেয়ে তার পরিবার এখানে এসেছিল। পরবর্তীতে তার পরিবার কুইন্সল্যান্ডের একটি শহরে বাস করতে শুরু করে। দ্বীপটিতে নির্বাসিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কয়েক বছর কোপিকার পরিবার সেখানেই ছিল।

ক্রিসমাস দ্বীপে নির্বাসিত হওয়ার আগে শ্রীলঙ্কান তামিল এই শরণার্থী পরিবারটি কুইন্সল্যান্ডে থাকার জন্য লড়াই করেছিল। এজন্য তারা অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ আদালতে টানা আইনি লড়াইও করে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাদেরকে ক্রিসমাস দ্বীপে বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়।

বাবা-মা, বোনের সঙ্গে কোপিকা

কোপিকার পরিবারে চারজন সদস্য রয়েছে। মা প্রিয়া, বাবা নাদেস, কোপিকা এবং তার তিন বছরের বোন থারনিকা।

নাদেস আর প্রিয়া ২০১২ এবং ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পৃথক ভ্রমণে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। পরে অস্ট্রেলিয়ান সরকার তাদেরকে অস্থায়ী সুরক্ষা ভিসা দেয়।

এরপর তারা দুজনেই কুইন্সল্যান্ডের ছোট্ট শহর বিলোলেতে চলে যান। সেখানে তামিল আশ্রয়প্রার্থীসহ নতুন অভিবাসীদের রাখার ব্যবস্থা হয়েছিল। পরে সেখানেই প্রিয়া আর নাদেসের প্রেম ও বিয়ে হয়। এরপর একে একে তাদের দুই সন্তানের জন্ম হয়।

শ্রীলঙ্কায় থাকাকালীন গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় প্রিয়া এবং নাদেস দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় শ্রীলঙ্কান সরকার তামিলদের হয়রানি করছিল ও আটকে রাখছিল।

অস্ট্রেলিয়া আসার পর শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়ের জন্য এই দম্পতি বছরের পর বছর আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হন। অস্ট্রেলিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শরণার্থী হিসাবে বিবেচিত হওয়ার যে মানদণ্ড রয়েছে তা পূরণ করতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদেরকে দু'বার নির্বাসন দেওয়ার চেষ্টা করে। ২০১৮ সালে যখন প্রথমবার বিলোল পরিবারের অস্থায়ী ভিসার মেয়াদ শেষ হয় তখন তাদেরকে মেলবোর্নের একটি বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং শ্রীলঙ্কায় ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। পরে বিলোলে শহরের অধিবাসীদের জোর প্রতিবাদের মুখে আইনজীবীদের প্রচেষ্টায় তাদের নির্বাসন ঠেকানো হয়। ২০১৯ সালে তাদেরকে শেষ পর্যন্ত ক্রিসমাস দ্বীপের বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোপিকার মা প্রিয়া বলেন, এ জীবনটা কতটা দুর্বিসহ কল্পনা করতে পারবেন না। আমরা কারও সঙ্গে কথা বলতে পারি না। চাইলেই নিজের থেকে বাইরে যেতে পারি না। এটা কোনো বন্দিশিবির নয়, জেলখানা।

কয়েক বছর ধরে আটকা থাকায় প্রিয়া মানসিক ও শারীরিকভাবে অসাড় হয়ে পড়েছেন। তার ভয় তিনি সন্তানদের ঠিকমতো বড় করতে পারবেন না।

প্রিয়া বলেন, আমার মেয়ে দুটি এখন বড় হয়েছে। তারা বাইরে যেতে, সব কিছু দেখতে এবং পৃথিবীটা উপভোগ করতে চায়। তারা স্বাধীনভাবে থাকতে চায়।

শরনার্থী পরিবারটি বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটা দুই রুমের বাড়িতে থাকে। সেখানে প্রচণ্ড গরমের তাপ। তাদের বাড়ির দরজা ভিতরে থেকে লক করা যায় না। গার্ডরা সারাক্ষণ তাদের পাহাড়া দেয়। কীটপতঙ্গ এবং পোকামাকড় তাদের ঘরে ঘোরাফেরা করে।

বোনের সঙ্গে কোপিকা



প্রিয়া জানান, তাদের জীবনের প্রতিটা মিনিট এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যেন তারা অপরাধী।

কোপিকাকে যখন স্কুলের কোনো বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন তার আমন্ত্রণটি মূল ভূখণ্ডের অফিসে পাঠানো হয়। সেখানে বিষয়টি বিবেচনা করে তবেই তাকে সেসব পার্টিতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত একজন গার্ডের সাথে কোপিকাকে কয়েকটি জন্মদিনের পার্টিতে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

প্রিয়া জানান, মেলবোর্নে আটক থাকাকালীন তার মেয়েদের প্রতিদিন মাত্র আধা ঘন্টা করে বাইরে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এখানে সে সুযোগও নেই।

প্রিয়ার ভাষায়, দীর্ঘদিন সূর্যের আলো গায়ে না লাগানোর ফলে কোপিকার শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি দেখা দিয়েছে, দাঁত পচতে শুরু করেছে।প্রিয়ারও ডায়াবেটিসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রিয়া জানান, নিজের ও মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি বেশ চিন্তিত। গত বছর মদ্যপ অবস্থায় একজন গার্ড ঘরে ঢুকে তাকে যৌন হয়রানির চেষ্ট করেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। যখন খুশী গার্ডরা দরজা খুলে ঢুকে পড়ে বলে তিনি ওই বন্দিশিবিরে মোটেও নিরাপদ বোধ করছেন বলে জানান।

যৌন হয়রানি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান সরকারের কেউ মন্তব্য না করলেও ওই পরিবারে কল্যাণে নিয়োজিত একজন মুখপাত্র বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ান বর্ডার ফোর্স পরিবারটির স্বাস্থ্য ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা সবসময় নার্স, চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তাদের দেখাশোনা করছেন বলেও দাবি করেন।

আদালত আবারও অস্ট্রেলিয়ায় পরিবারটির আশ্রয় দাবির বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। যদিও সরকার বিভিন্ন দফায় তাদের দাবিকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে।

পরিবারের ব্যারিস্টার ক্যারিনা ফোর্ড বলেছেন, সরকার চাইলে তাদের দুর্ভোগ আগামীকালই শেষ হতে পারে।



আরও পড়ুন

×