ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

ইন্দ্রিয়নিবিড় কবিতা

ইন্দ্রিয়নিবিড় কবিতা
×

আল মাহমুদ [১১ জুলাই ১৯৩৬–১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯]

মোস্তাক আহমাদ দীন

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আম্মা বলেন, পড়রে সোনা
আব্বা বলেন, মন দে;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।
 
শৈশবের প্রথম পাঠে এই স্তবকটিকে ভালো লেগেছিল তার ধ্বনি, ছন্দ আর অর্থের গুণে– সেই বয়সে কে আর স্কুলের পড়া পড়তে চায় বলুন– পরে, এই ভালো-লাগা আরও দ্বিগুণ হয়ে এলো কাঁঠালচাঁপার গন্ধে, ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের তাৎপর্যে। তারও পরে, কল্পনার অপূর্ব বিস্তারে এলো ঘোর মুগ্ধতা– পড়লাম, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কর্ণফুলী নদীর কূলে ফেরেশতারা কীভাবে দুধভরা চাঁদের বাটি ওল্টায়, তার বর্ণনা। এই কবিতাটিকে যারা ছড়া বা কিশোর কবিতা বলবেন, তাদের রুচির তারিফ করতে আমরা অপারগ: জ্ঞানরাজ্যের কেবল পুথিতাড়িত পরিবেশে এই আপাতআড়াল, এই প্রাকৃতিক প্রতিবাদ যে পরে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে, তা বুঝতে হলে শুধু আরণ্যক হলেই হয়, পরিবেশবিদ্যার আশ্রয় নিতে হয় না। কবির এই আড়ালটুকু মূলত শিশুকে লজেন্স দেখিয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানোর মতো সুন্দর চাতুর্যের উদাহরণ। আবার কখনও উল্টোটাও হয়– অর্থাৎ কোনো মর্মান্তিক প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কোনো কবিতায়ও দেখা যায় এমন কিছু আবহ ও শিহরণকর বর্ণনা, যা মূল মর্মকেও আচ্ছন্ন করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে আল মাহমুদের বহুলআদৃত কবিতার বই ‘সোনালি কাবিন’-এর প্রথম কবিতাটির কথা : 

কতদূর এগোল মানুষ!
কিন্তু আমি ঘোরলাগা বর্ষণের মাঝে
উবু হয়ে আছি।... 

শুরুর বাক্যটিতে জিজ্ঞাসা নয় শুধু, সূক্ষ্ম বিদ্রুপও আছে; মানুষ যে সামনের দিকে এক কদমও এগোয়নি, দুনিয়াজোড়া উচ্চণ্ড ঘটনার পর ঘটনায় একথা আজ কে না জানে। কিন্তু এই কবিতার মূল কথাটি রেখে আমার কেবলই শৈশবের অবারিত খেলার মাঠ আর হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে ঘোরলাগা বর্ষণে নৌকার গুরায় বসে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে দুই পাটির দাঁতে কপাট লেগে যাওয়ার স্মৃতিও মনে পড়ছে। বর্ষাকালের তুমুল বৃষ্টির দিনেই যে শুধু এমন মনে হবে তা নয়, আজকের এই ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেও মনে পড়ছে, শীতের দিনে উদাম পিঠে কারও ভেজা হাত পড়ার শিহরণকর অনুভূতির কথা। কবিতায় উল্লিখিত ‘মাঠ’ আর ‘পিঠ’-এর মধ্যকার মাঠ হলো দেখা-বাস্তব, দ্বিতীয়টি প্রতীক; হ্যাঁ প্রতীক বটে, তবু, সে আরও অধিক স্মরণযোগ্য বাস্তবতাও : ‘বর্ষণে ভিজছে মাঠ। যেন কার ভেজা হাতখানি/ রয়েছে আমার পিঠে।’ বৃষ্টিভেজা মাঠের সূত্রে পিঠে কারও ভেজা হাতের এই অনুভব রবীন্দ্রনাথের একদৈহিক অনুভবের কথাটিও মনে করিয়ে দেয়। তাঁর মনে হয়েছিল, একসময় তিনি যখন পৃথিবীর সঙ্গে এক হয়ে ছিলেন, তখন তার ওপর সবুজ ঘাস উঠত, শরতের আলো পড়ত, সূর্যের আলোয় সুদূর-বিস্তৃত শ্যামল অঙ্গের প্রত্যেক রোমকূপ থেকে যৌবনের সুগন্ধ উত্তাপ বের হতো। কাজী আবদুল ওদুদের নদীবক্ষ উপন্যাসের চরিত্র লালুরও নাও বাইতে বাইতে মনে হয়েছিল, ‘ক্ষেতে যেমন সরষের ফুল ফুটে থাকে, আমার শরীরের মধ্যেও তেমনই লাগছে।’ 
     তবে তিতাসপারের এই কবি শুধু অনুভবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, তিনি আশ্লেষতাড়িতও; যখন প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো দেখেন, তখন আস্বাদনের ইন্দ্রিয়গুলো তাঁর চেতনায় গন্ধ ও স্বাদ গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে : ‘...ক্ষীরের মতন গাঢ় মাটির নরমে/ কোমল ধানের চারা রুয়ে দিতে গিয়ে/ ভাবলাম, এ-মৃত্তিকা কিষাণী আমার।/ বিলের জমির মত জলসিক্ত সুখদ লজ্জায় যে নারী উদাম করে তার সর্ব উর্বর আধার।’ এভাবে, ইন্দ্রিয় অনুভব থেকে সুখকর অভিজ্ঞতা লাভের জন্য এগিয়ে যাওয়ার চিরকালীন আদিম বাসনা চরিতার্থের কথা বারবার ঘুরে এসেছে তাঁর কবিতায়। এটি যে আল মাহমুদের উল্লেখযোগ্য মৌলিক প্রবণতা, তার প্রমাণ শুধু তাঁর কবিতায় নয়, তাঁর একাধিক গল্পেও রয়েছে। এখানে মাটির বিলের জমিকে যেমন তার নারী বলে মনে হয়, তেমনই তাঁর বহুলপঠিত ‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে পানকৌড়ির শরীর, তার উড়াল ও অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি এবং গুলি-খাওয়া শরীরের রক্ত– সবকিছুই তাঁর সদ্যবিবাহিত স্ত্রী আদিনার শরীরের প্রতিরূপ বলেই মনে হয়। আল মাহমুদের কবিতার এই সবিশেষ প্রবণতার কথা, তাঁর জীবনের প্রথম পর্ব ও শেষ পর্বের কবিতার কথা মাথায় রেখেও বলা যায়। 
     একসময় তিনি তাঁর ‘সোনালি কাবিন’ শীর্ষক কবিতা সিরিজে, মাৎস্যন্যায়ে তাঁর কোনো সায় নেই বলে কৌম সমাজের প্রতিভূ হয়ে প্রিয়তমা নারীকে সরল সাম্যের বাণী শুনিয়েছিলেন এবং নিজেকে লালন বলে কল্পনা করেছিলেন, কিন্তু সেখানেও আছে সেই পানিউড়ী বা পানকৌড়ি বিষয়ে এমন সব পঙ্‌ক্তি :                  

রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ী রাতের ছতরে
শিষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাঙে ছল ছল
আমার চুম্বন রাশি ক্রমাগত তোমার গতরে
ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল
এর ব্যতিক্রমে বানু এ-মস্তকে নামুক লানৎ
ভাষার শপথ আর প্রেমময় কাব্যের শপথ।  

এই কবিতা আর ‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্প যেন একই ভাবেরই দু-রকম উৎসারণ। এরপর, অর্থাৎ আরও দু-দশক পরে প্রকাশিত হয় আরেকটি কবিতার বই দোয়েল ও দয়িতা, যেখানে রয়েছে ‘হে আমার আরম্ভ ও শেষ’-এর মতো কবিতা, যেটিকে অনায়াসে পূর্বসূরি কোনো সুফি কবির কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। কবিতার শুরুতেই রয়েছে বাকা বিল্লাহর বিকাশমান ঝলক, আবার একটু পরে আছে ফানা ফিল্লাহর সবিনয় দ্যুতিও। এই দ্বৈত-ভাবের কবিতাটিতে রয়েছে এক উদিত নক্ষত্রের কথা, যে শূন্যতার বিরোধী এবং যে নিজের আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করে তোলে; এ ছাড়া এখানে আভাসে ইঙ্গিতে রয়েছে হজরত ইউসুফের স্বপ্ন-দর্শনের নিবিড় প্রতিচ্ছায়াও : ‘আরম্ভ ও অন্তিমের মাঝখানে স্বপ্ন দেখি সূর্যের সিজদারত নিঃশেষিত/ আগুনের বিনীত গোলক।’ এরপরই আবার রয়েছে, চিরবিরাজমান সত্তার প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম, রুকু আর সিজদা জানানোর কথা। 
     কিন্তু এই বইয়েই রয়েছে ‘দোয়েল ও দয়িতা’র মতো এমন একটি কবিতা– যেটি কিনা বইয়ের নামকবিতাও– সেটি আল মাহমুদের কবিতার মূল প্রবণতার প্রতিনিধিত্বকারী একটি শ্রেষ্ঠ কবিতার নজিররূপে  বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। কবিতাটি সংগীত-অনুষঙ্গে বাক্সময়, এখানে আছে এক উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পীর গল্প, যিনি তার বন্দিশ শেষ করে নৈঃশব্দ্যে ঢুলছিলেন। জানালা খোলা থাকায় তিনি দেখলেন, দোয়েল পাখি তার লেজ উঁচিয়ে বিরুদ্ধ-বন্দিশ গাইছে, আর টাঙ্গাইল শাড়ি-পরিহিতা আরেকজন নারী, যিনি নিজেই যেন বন্দিশের বিরুদ্ধে আরেক সাক্ষাৎ বন্দিশ। কবি লিখছেন, তিনি যদি জানতেন গানের পরেই তার জন্য অপেক্ষা করে আছে ‘এক বিন্দু পাখি ও এক ছতর ঢাকা লজ্জা’, ‘তাহলে কে আর ফিরে ফিরে মালকোশের অন্তরায়/ সুরের গিটকিরি খেলত?’ তাঁর কথায়, সংগীত শেষ করে তাঁর যখন নৈঃশব্দ্য পোহানোর কথা, তখনই তিনি আরেক সংগীতের মুখোমুখি :       

যে ওঁৎপেতে থাকা মাংস সহসা সংগীতের পর পরই শব্দ করে ওঠে
তাকে কেবল স্তন বললে কি আর পোষায়? আমি তাকে
সংগীতই বলি। গানের বিরুদ্ধে গান। ঐ তো
ব্লাউজে উঁচু হয়ে আছে বাণীর আভোগ।

বন্দিশের বিরুদ্ধে বন্দিশ।  

আমরা জানি আল মাহমুদের জীবনে নানা পরিবর্তন এসেছে, এই পরিবর্তনের কারণে তিনি একই সঙ্গে অভিযুক্ত এবং অভিষিক্তও হয়েছেন, তাঁর কবিতায়ও সেই পরিবর্তনের কিছু প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু এইসব কিছুর মধ্যেও আদিম প্রাকৃতিক ইন্দ্রিয়নিবিড় কবিতা রচনায় আল মাহমুদ ছিলেন সক্রিয়, বাঙালি পাঠকের কাছে এইসব কবিতার আবেদন দূর-ভবিষ্যতেও শেষ হয়ে যাবে বলে মনে হয় না।  

আরও পড়ুন

×