আলো অন্ধকারে যাই
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার
প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জীবনানন্দ দাশকে কেউ কেউ অন্ধকারের কবি হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বহু কবিতায় ‘অন্ধকার’ শব্দটি আছে, কিংবা আঁধার। ক্ষুধা, ক্রোধ, ভয় ও মর্মযাতনার প্রতীক হিসেবে ‘অন্ধকার’ একটি লাগসই শব্দ, সন্দেহ নেই। রাত্রি রহস্যময় কারণ আলো দূরীভূত হয়ে অন্ধকার ঢেকে ফেলে পৃথিবীকে। অনেক অঘটন ঘটে যায় রাত্রির অন্ধকারে। অনেক কবি সেভাবেই দেখেছেন অন্ধকারকে। অনেক কবির কাছে অন্ধকার ব্যর্থতা, হতাশা ও যন্ত্রণার প্রতীক। অভিন্ন সূত্রে আলো চরিতার্থতা, আশা ও আনন্দের অতর্কযোগ্য নির্দেশক।
মানবজীবনের অন্ধকার নিয়ে কবিতা লেখা যায়। চার্লস বুকোস্কি দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বড় রাস্তার পাশের গলিতে বেশ্যাদের পসরা, বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা, কামড় দেওয়া আপেল থেকে নির্গত কৃমি, শুঁড়িখানা, গারদ, প্রেমিকাদের আত্মহনন– এইসব নৈয়ায়িক নির্দেশক দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন আধুনিক মানুষের অন্ধকার জীবন।
জীবনানন্দ দাশেরও কাছে কখনও মনে হয়েছে: ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন।’ গভীর রাত্রির অন্ধকারে জীবনানন্দ প্রত্যক্ষ করেছেন, ‘হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল।’ দেখেছেন কোথাও কমলা আলো সূর্যের রক্তে নিভে যায় আর নদীর বিপথে ভেসে রাজহাঁস ডুবে যায় অন্ধকারের ভেতর। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, ‘যত পাখি যত পশু ফড়িং গুবরে কেঁচো/ মানুষ ফেলেছে খেয়ে সব/ এখন রাজত্ব শুধু আটপেয়ে লক্কা মাকড়সার’। মনে হয়েছে: ‘কেবলি জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে/ দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয়/ সেই শস্য অগণন মানুষের শব’।
মানুষের জীবনে অনিবার্য অন্ধকার আছে। অন্ধকার রয়েছে সভ্যতার জরায়ুতে। জীবনানন্দের ‘অন্ধকার’ কবিতাটির শুরুতে আমরা পড়ি, ‘গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার/ তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া/ গুটিয়ে নিয়েছে যেন/ কীর্তিনাশার দিকে।’ এ কবিতাতেই লিখেছেন, ‘সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি-কোটি শুয়োরের আর্তনাদে/ উৎসব শুরু করেছে।’ – মানুষের পৃথিবী যেন পূর্ণ শত-শত শূকরের চিৎকারে আর সেখানে শত-শত শূকরীর প্রসববেদনার আড়ম্বর। সম্ভবত তাই তাঁর মনে হয়েছিল।
২.
‘এর চেয়ে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া ভালো।’ – যে অন্ধকারে সব ক্লেদ ও কুৎসিত, রক্ত ও বমি ঢাকা পড়ে যায়।
উপর্যুক্ত ‘অন্ধকার’ শিরোনামের কবিতাটি ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে (১৯৪৯) চৈত্র সংখ্যায় ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটির সঙ্গে কবির মন্তব্যও মুদ্রিত হয়েছিল: ‘অন্ধকার’ কবিতাটি প্রায় সতেরো বছর আগে লেখা হয়েছিল। খুব সম্ভব ১৩৪২-এ কবিতায় দিয়েছিলাম। তখন ছাপানো হয়নি, পরে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছিল। আমার কাছে কোনো কপি নেই ভেবেছিলাম। পুরোনো খাতা খুঁজতে খুঁজতে সেদিন বেরিয়ে পড়ল। সতেরো বছর আগের সেই মনোস্বভাব এখন নেই আর আমার। এ রকম কবিতা আজ আমার পক্ষে লেখা সম্ভব নয়।
৩.
আধুনিক কবিতার পরিসরেও ফরাসি কবি শার্ল বোদল্যার বজায় রেখেছিলেন অভিজাত দূরত্ব। প্যারি নগরীর প্রশস্ত বুলেভার্ডে এক বিচ্ছিন্ন ফ্লান্যর হয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি নাগরিক অবক্ষয়ের ‘পুষ্পকোরক’ সংগ্রহ করেছেন এক ধরনের তীব্র নান্দনিক নিষ্ঠুরতায়– যেন শহরের পচনই তার শিল্পের সুপ্ত বাগিচা। বোদল্যার আধুনিক বাঙালি কবিদেরও প্রভাবান্বিত করেছিলেন। কবি সমর সেন তাদের একজন। বুদ্ধদেব বসু মন্তব্য করেছিলেন, সমর সেন সাম্প্রতিক সময়ের জীবনের সমস্ত বিকার, বিক্ষোভ ও ক্লান্তির কবি। অশ্রকুমার সিকদার বলেছেন সমর সেন বর্তমান সভ্যতার বিষণ্ন বন্ধ্যত্বের কবি। – সন্দেহ নেই, ইয়োরোপীয় সাহিত্য বাঙালি কবি ও সমালোচকদের ব্যাপকভাবে আচ্ছন্ন করেছিল।
আধুনিক মানুষের মনোভূমিতে অস্তিত্বের যে সংকট জন্ম নিয়েছে, ইতিহাস বারবার তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে তিনটি প্রশ্নের মধ্য দিয়ে: জীবনের অন্তর্নিহিত যন্ত্রণা কীভাবে চিহ্নিত করা যায়, কীভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাকে চালিত করা যায় পরিত্রাণের পথে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ইয়োরোপীয় চিন্তায় এই বৌদ্ধিক আকাঙ্ক্ষা কঠোর, প্রায় অনুশাসনমূলক নির্দেশনার রূপ নিয়েছিল: দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার মানবচেতনাকে আহ্বান করেছিলেন ইচ্ছাশক্তির অদম্য, অন্ধ, ক্ষুধার্ত ঘর্ষণকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একেবারে পালিয়ে যেতে। আর তদীয় ভাবশিষ্য ফ্রিডরিখ নিৎশে বিধিলিপির অনিবার্যতা অস্বীকার করে বীরোচিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন মানুষকে: ভাগ্যতাড়িত জীবনের অন্তর্গত।
৪.
ট্র্যাজেডিগুলোর প্রতিশোধ নিতে বলেছিলেন তিনি অস্তিত্বের প্রতিটি ক্ষতকে শক্তির উৎসস্থলে রূপান্তরের মাধ্যমে।
তবু আমরা প্রত্যক্ষ করি এই মারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি– জীবনের অতল গহ্বরকে হয় জয় করতে হবে, নয়তো সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে– বাংলা সাহিত্যের পটভূমিতে এসে এক গভীর ও নীরব– প্রায় ধ্যানমগ্ন বিকল্প খুঁজে পেয়েছে। শোপেনহাওয়ার ও নিৎশের একান্ত অনুশাসনমূলক মতবাদী কাঠামো কিংবা বোদল্যারের বিচ্ছিন্ন নান্দনিকতার বিপরীতে জীবনানন্দ দাশ তাঁর কাব্যের অবয়বে উপস্থাপন করেছেন এক মৃদুমন্দ ও সমন্বয়ধর্মী আধুনিকতা। সেখানে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা নেই; নেই সহিংস উদ্যোগ ও আচরণের মধ্য দিয়ে জয় লাভের উৎকাঙ্ক্ষা। বরং তাঁর কাছে কাব্য এক মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক সংশ্লেষণের ক্ষেত্র– যেখানে ইতিহাস, প্রকৃতি ও কল্পনা মিলেমিশে এক অসহনীয় পৃথিবীর সঙ্গে নীরব, গভীর, মানবিক সন্ধি গড়ে তোলে।
তাঁর কবিতায় না জীবনকে অস্বীকার করা হয়েছে, না আছে হাতকড়া পরিয়ে জীবনকে অনুশাসনের বিজ্ঞাপন। বরং হৃদয়সঞ্জাত গভীর উপলব্ধির ভিত্তিতে জগৎ ও সংসারকে আলিঙ্গন করেন জীবনানন্দ দাশ। একরূপ অনির্ণেয় অন্তর্মুখীন আলোয় তাঁর বিশ্ববীক্ষা ক্রমান্বয়ে পুনর্গঠিত হতে দেখি আমরা।
৫.
জীবনসংগ্রাম বলতে যা বোঝায়, কবি জীবনানন্দ দাশকে সে রকম একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বটে; দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা, অস্বীকৃতি এবং অসম্মান, নিষ্প্রেম ও যৌন-অচরিতার্থতা তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করেছে আমৃত্যু, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানবজীবন তাঁর কাছে দুঃসাধ্য কিংবা অগ্রহণযোগ্য কোনো প্রস্তাবনা নয়– জীবনকে তাঁর কাছে আদালতের কাঠগড়া মনে হয়নি কখনও। জীবনকে মনে হয়নি এমন একটি নাট্যমঞ্চ, যেখানে মানুষকে অভিনয় করে যেতে হয় অন্তর্গত বিবমিষা চেপে রেখে– ব্যত্যয়হীনভাবে নিয়তিনির্দিষ্ট পাণ্ডুলিপি অনুসরণ করে। এ কথা অবশ্যমান্য যে বিংশ শতাব্দীর সময়প্রবাহে জীবনযাপন নিরঙ্কুশ কিংবা নিষ্কলঙ্ক কোনো অভিযাত্রা নয়। কিন্তু জীবনানন্দের কাছে মনে হয়নি মানুষের জীবন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত পাথরের সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে কোনো দুর্জ্ঞেয় গন্তব্যে পৌঁছানোর ধারণাতীত রূপকল্প। জীবন সমস্যাবহুল বটে, কিন্তু এমনভাবে কণ্টকাদীর্ণ নয় যার থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য কবিতার আশ্রয় নিতে হবে, কিংবা গল্প-উপন্যাসের। সাহিত্য তাঁর কাছে অন্তর্গত প্রেরণার স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি।
৬.
মানুষের অস্তিত্বেও তাৎপর্য নিয়ে যে প্রশ্ন শোপেনহাওয়ার উত্থাপন করেছিলেন, অত্যন্ত সচেতন মানুষ জীবনানন্দ দাশের দার্শনিক সত্তায় সেই একইরকম প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই তরঙ্গ তুলেছিল। ‘বোধ’ কবিতায় সেসব প্রশ্নের প্রচ্ছন্ন এবং ‘আট বছর আগের এক দিন’ কবিতায় প্রত্যক্ষ প্রতিচ্ছবি চিত্রায়িত হয়েছে। কিন্তু তাঁর অনর্গল সৃষ্টিশীলতার পথে এসব প্রশ্ন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে কাব্যরচনা জীবননামীয় কোনো দুরারোগ্য ব্যাধির একমাত্র পরিচর্যা– এ রকমও মনে হয়নি তাঁর কাছে। তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘জীবনের ধার্য বেদনার থেকে এ নিয়মে নির্মুক্তি কোথায়?’ আবার তাঁর কবিতাতেই আমরা পাঠ করি, ‘মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,/ না এলেই ভালো হত অনুভব করে;/ এসে যে গভীরতর লাভ হল সে-সব বুঝেছি’।
পরিলক্ষিত হয় জীবন যতই পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে জীবনানন্দের জীবনবোধেও ক্রমশ পরিবর্তন এসেছে। ১৯৩৬-এ তিনি ‘রূপসী বাংলার’ সনেটগুলো লিখেছেন গভীর আবেগ এবং পরম দক্ষতার সঙ্গে; কিন্তু দশ বছর পর ১৯৪৬ সালে সেগুলো তাঁর কাছে আর প্রকাশযোগ্য মনে হয়নি। যৌবনে ‘অন্ধকার’-এর মতো কবিতা রচনার তাগিদ তাঁর প্রশ্রয় লাভ করেছিল। কিন্তু পরিণত কালে মনে হয়েছে ওরকম কবিতা তাঁর পক্ষে আর লেখা সম্ভবপর নয়। কেন নয়? কীভাবে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির মনস্তত্বে পরিবর্তন ঘটেছিল তার ব্যাখ্যা আমরা পাই না। তাঁর কবিতার তন্নিষ্ঠ পাঠককেই শত শত কবিতার পরম্পরা অনুসরণ করে তা বুঝে নিতে হবে।
কবিতার মুখোশে লুকিয়ে থাকবার মানুষ নন জীবনানন্দ দাশ। অথচ তাঁর জীবনসংগ্রাম ও কাব্যভাবনার মধ্যে যে কোনো পারস্পারিকতা নেই তা একসময় আর অস্পষ্ট থাকে না। তাঁর কাব্য নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সমন্বয়ে, এবং তৎসঙ্গে আবেগোত্থিত কল্পনার মিশ্রণে নির্মিত একটি অনবদ্য ভাষিকশিল্প। পূর্বসূরি সাহিত্যের অভিভাবকত্ব অস্বীকার না করেই তিনি নতুন কবিতার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। চিন্তাশীল মানুষ কখনও কখনও স্বীয় উপলব্ধি অথবা মতবাদের বশংবদ হয়ে পড়েন,– এই দুর্বলতা থেকে জীবনানন্দ দাশ মুক্ত। জীবনের পথে অগ্রসর হওয়া মানেই নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন অভিধানের উদ্বোধন– নতুনভাবে প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক ঘটনার পর্যবেক্ষণ ও অর্থ নিরূপণ। কিন্তু জীবনানন্দ প্রধানত একজন কবি এবং শব্দের কারবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কবিতা তাঁর কাছে একই সঙ্গে অন্তর্জাত উদ্দীপনা ও পরিচর্যাপুষ্ট সৃজন প্রক্রিয়া। তাঁর কবিতার মধ্যে দার্শনিকতা আছে ঢের কিন্তু বিধাতার চরিত্র আহরণ করে তিনি মানুষকে বিশেষ কোনো পথে নিয়ে যেতে চাননি। তিনি হয়ে ওঠেননি সমাজসংস্কারক বা তত্ত্ববিদ। তিনি কেবল এই বলে শেষ করেন:
৭.
“তোমার শরীর,–
তাই নিয়ে এসেছিলে একবার;–
তারপর,– মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন
তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন্ দিকে জানিনি তা,– হয়েছে মলিন
চক্ষু এই;– ছিঁড়ে গেছি– ফেড়ে গেছি,– পৃথিবীর পথ হেঁটে হেঁটে কত দিন রাত্রি গেছে কেটে!”
৮.
জীবনানন্দের কবিতায় আমরা লক্ষ্য করি সময়ের সুনির্দিষ্টতা। ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় লিখেছেন: বসন্তের নির্ঘুম রাতে বনের ভিতরে শিকারিরা এসেছে। লিখেছেন: চারপাশে বনের বিস্ময়, চৈত্রের বাতাসে ঘাইমৃগী সারারাত ডেকে যায়:– ‘কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার।’
অন্যত্র লিখেছেন, ‘পটভূমির ভিতরে গিয়ে কবে তোমায় দেখেছিলাম আমি/ দশ-পনের বছর আগে’। আরেকটি বিখ্যাত কবিতায় আমরা পড়ি, ‘আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি/ আবার বছর কুড়ি পরে– / হয়তো ধানের ছড়ার পাশে/ কার্তিকের মাসে– / তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে– তখন হলুদ নদী/ নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়– মাঠের ভিতর!’
‘অনেক আকাশ’ কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘গোধূলির আলো লয়ে দুপুরে সে করিয়াছে খেলা/ স্বপ্ন দিয়ে দুই চোখ একা– একা রেখেছে সে ঢাকি/ আকাশে আঁধারে কেটে গিয়েছে যখন ভোর বেলা/ সবাই এসেছে পথে,– আসে নাই তবু সেই পাখি!’ অন্যত্র আমরা পাঠ করি: ‘এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে/ বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা/ কিংবা পেঁচার গান।’
কখনও বৎসর, কখনও ঋতু, কখনও মাস, কখনও দিনের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করেছেন কবি। শত শত কবিতায় অজস্র প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়েছে এইভাবে, সময়ের সুনির্দিষ্ট অনুষঙ্গে। সময় সুনির্দিষ্ট করার উপর্যুক্তরূপ জীবনানন্দীয় প্রবণতা নিয়ে আমরা অন্যত্র আলোচনা করেছি, বিশদভাবে। ‘জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার’ নিয়ে আলোচনা করার সময় এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেওয়া যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘অন্ধকার’ উল্লিখিত হয়েছে দিনের একটি বিশেষ সময় হিসেবে যখন সূর্য ডুবে যায়, নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে।
৯.
আকাশের অন্তহীন পটভূমিতে। পৃথিবীর মৃত্যু নেই: এ পৃথিবী জেগে থাকে অন্ধকারের ভিতর।
জীবনানন্দ লিখেছেন:
আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছে:
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।
যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি,
সেই নারীর মতো
ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠছে।
জীবনানন্দ অন্ধকারকে বলেছেন আলোর রহস্যময়ী সহোদরা। এই অপূর্ব বাকপ্রতিমা কেবল মনোমুগ্ধকর নয়, তা অন্ধকার সম্বন্ধে জীবনানন্দীয় ধারণা সুস্পষ্ট করে তোলে। ‘বোধ’ কবিতার শুরুতেও আমরা পাঠ করেছি: ‘আলো-অন্ধকারে যাই– মাথার ভিতরে/ স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে।’ পরবর্তী স্তবকেই পুনর্বার পাঠ করি: ‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে/ কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে?’ আলো ও অন্ধকারের এই যুগল বন্দেশ বহুবার এসেছে জীবনানন্দের কবিতায়। – জীবনানন্দ দাশ হতাশা ও বিচ্ছিন্নতাবোধের কবি আদৌ নন। তাঁর অন্ধকার কেবল আলোর বিপরীত– মহাজাগতিক ব্যাকরণের প্রতিফলন মাত্র। আলো আর অন্ধকার সমন্বয়ে এই জগৎ। জীবনানন্দের পৃথিবী বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তাই মৃত্যুর কথা ভাবতে গিয়ে লিখেছেন: ‘আমি যদি কোনোদিন চলে যাই এই আলো অন্ধকার ছেড়ে’। জীবনানন্দ অন্ধকারের কবি নন। তিনি পরিষ্কার লিখে গেছেন:
আমরা কি তিমিরবিলাসী?
আমরা তো তিমিরবিনাশী
হতে চাই।
আমরা তো তিমিরবিনাশী।
- বিষয় :
- গল্প