প্রেতনীর রূপকথা
শিল্পকর্ম :: মনিরুল ইসলাম
জীবনানন্দ দাশ
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্টিমারে উঠে দেখলাম শ্রাবণের মেঘের সঙ্গে রাতের অন্ধকার এসে হাহাকার করে মিশছে। মাথা হেঁট করে ভাবলাম; আবার ভোর হবে-হবে নাকি?
থার্ড ক্লাস ডেকের একটু ছোট্ট জায়গা রয়েছে দেখলাম– সেকেন্ড ক্লাস কেবিনের দরজাটার বাইরেই একটু উত্তর মুখ ঘেঁষে। স্টিমারের চোঙা থেকে বিস্তর কয়লার গুঁড়ো এসে পড়ে সেখানে– কে যেন একটু জলও ঢেলে রেখেছে।
কিন্তু জায়গাটা ডেকের একেবারে এক প্রান্তে– নদীর জলের গন্ধ ও অন্ধকারের বুকের উপর যেন। ঝিরঝির করে বাতাস দিচ্ছে, এই গুমোটের ভিতর এ জায়গাটা একটা নিস্তারের মতো। অবাক হয়ে ভাবছিলাম কেউ এই জায়গায় বিছানা পাতেনি কেন– কয়লার গুঁড়ি নামে বলে?
কিন্তু কয়লার গুঁড়ি চোখে না এলেই তো হল!
বিছানাটা আস্তে আস্তে পাতলাম, শতরঞ্চিটা মেঝের জলে ভিজে গেল– কিন্তু তোশকটা তত ভিজবে না। এগুলো জল না মানুষের পেচ্ছাপ? যাই হোক, বিছানার চাদরে লাগবে না তো, বালিশেও না; কাল কলকাতায় গিয়ে শতরঞ্চিটা ধুয়ে নেব, তোশকটা রোদে শুকিয়ে নেওয়া যাবে।
প্যাসেঞ্জারদের ভিতর অনেকে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে– পেচ্ছাপের উপরেই বিছানা পেতেছি তা হলে? মনটা থতমত খায়, উঠে যেতে ইচ্ছা করে, মুখ আরক্ত হয়ে ওঠে।
কিন্তু পশ্চিমে আকাশটা মাইলের পর মাইল নবীন মেঘের পাহাড় বুকে করে দাঁড়িয়ে আছে, পাহাড়ের একধার যেন আকাশের থেকে জন্ম নিয়েছে, তারই নিচে শহরের কিনার ধরে এক শৃঙ্গ চলে গেছে খ্রিষ্টানদের গোরস্তান ছাড়িয়ে গির্জা ছাড়িয়ে–
এ আল্পস– নাশমুলি[?], কারকোরাম– না খণ্ডগিরি?
বিকেলের শেষে প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েক মুহূর্তের বিহ্বল জল মাইলের পর মাইল– আকাশে আকাশে হাত বাড়িয়ে–
হৃদয় যেন কিমোনো-অঙ্কে জাপানি বালিকার মত মুগ্ধ হয়ে সন্ধ্যার বিরাট প্রান্তরের মতো নিস্তব্ধ সীমাহীন সমুদ্রের...
মনে যেন কোনো চমরী কোনো নীল গাই, হিমালয়ের পথ ভেঙে-ভেঙে কোনো দিন আনন্দের এত গতি, ও স্থিরতার এত পরিতৃপ্তি বোধ করেনি।
মাইলের পর মাইল এই নীলাভ মেঘের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে ভারতবর্ষের পর্বতগুলোর কথা মনে হয় না আমার। আজকের জীবনের কথাও, পৃথিবীর জীবনের কথাও পিছে সরে যায়– মনে হয় এগুলো যেন গ্রিক রোম্যান ভূমধ্যসাগরের ওপারের জিনিস, মৃত স্মৃতি ও ছবির দেশ-নীল নরম বাল্টিকের ওপারে একদিন যা রয়ে গেছে-কিংবা ম্যুরিলোর [?] দেশ, ভিঞ্চির মনের ভিতর, র্যাফেলের মনে─
দীর্ঘ নগ্ন দুধের মত শাদা শরীর, ঝাউয়ের শাখাপ্রশাখার ফাঁকে জ্যোৎস্নাহীন নক্ষত্রহীন নিস্তব্ধ বনের মতো অজস্র কারো চুল একজন মানুষী পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধূপের গভীর ধবল ধোঁয়ার মতো দাঁড়ায় একা-মিলিয়ে যায়─তাদের প্রেমিকেরা দেবতা না মানুষ? কী রকম মানুষ? থিসিউস-এর মত না মাইকেল এঞ্জেলোর মত? থিসিউস-এর মতই; রক্তমাংসকে আক্রমণ করে কিশোর-যুবক; মাংসরক্তহীন রূপকে আস্বাদ করে এঞ্জেলো; স্বপ্ন ও বেদনা তার একটা বিরাট আকাশের মত ওঠে।
খাকির সুট পরা একজন সাহেব চেকার এসে হাত বাড়াল─আমার টিকিট দেখতে চাচ্ছে।
স্টিমারে সাহেব চেকার এই প্রথম দেখলাম; হয়তো চেকার নয়, কোম্পানির বড় অফিসার─ইনস্পেকশনে বেরিয়েছে।
এক টুকরা চুরুট ছিল পকেটের ভিতর; ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে নিলাম। পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যার ছবি মিলিয়ে গেছে, সেই মেঘের পাহাড় নেই আর, চারদিকে শাদাসিধে বাংলার পাড়াগাঁ।
স্টিমার ছেড়ে দিয়েছে।
মাঠ জঙ্গল খোড়ো ঘর সলতের প্রদীপ একে-একে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে দেখা দিয়ে চলে যায়, মনের ভিতর বিক্ষোভ জমে ওঠে কেমনতর যেন এক, মনে হয় যেন স্পেন ও গ্রিস, রেনেসাঁস, এঞ্জেলো, মুরিলো, সমস্তই সরে গেল, বাদলভেজা মাঠ অশ্বত্থ ও জঙ্গল যেখানে ময়নামতীর গান ও রূপচাঁদ পক্ষীর জন্ম হয়েছিল একদিন। বৃষ্টির ঘনঘটার ভিতর পথের সঙ্গিনী এই নদী। খোড়ো বনের ভিতর থেকে পাড়াগাঁর দুঃখিনী রূপমতীর উনুনের ধোঁয়া─পাশেই তার-বেল ও বাঁশের জঙ্গলের ভিতর থেকে ধু-ধু মাঠের আনাচে-কানাচে যুগান্তের প্রেতনীদের নিরবচ্ছিন্ন রূপকথা, কোথাও একটা চিতা, খানিকটা কাঠমল্লির গন্ধ– আশশ্যাওড়ার জঙ্গলে জোনাকি, সজনে গাছের ডালে জোনাকি, লক্ষ্মী প্যাঁচার ডাক; বাংলার মাঠঘাটের পথ দিয়ে অনেক শতাব্দী ঘুরিয়ে আনে আমাকে, প্রান্তর ও নিশুতির ফাঁক থেকে অসংখ্য মুখ উঁকি দেয়, কিশোরী ও পুরলক্ষ্মীদের নিরপরাধ নরম ডৌলের নিবিড় মুখ সব কাছে এসে বলে─‘চিনতে পার তো?’
‘হ্যাঁ চিনি বইকি─তোমরা আজ মৃত বুঝি সব?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু তোমার এ বেশ কেন ভাই?’
‘এই বেশই কি আমার চিরকাল ছিল না!’
‘না না তোমার নাম যে সুলক্ষণ ছিল─নয়নপুরের মাঠে তিনশ বছর ধরে তুমি যে একটা ঝাঁকড়া ঝুড়িওয়ালা বটগাছ হয়ে ছিলে!’
চুরুটটা নিভে গিয়েছিল, জ্বালিয়ে নিলাম আবার।
খানিকক্ষণ টেনে কেমন পিপাসা বোধ হল। ধীরে ধীরে...ফার্স্ট ক্লাস কেবিনের দিকে গেলাম। পাগড়ি চাপকান পরে বাটলার দাঁড়িয়ে ছিল– মুখ বসন্তের দাগে বিকৃত, শাদা দাড়ি শাদা চুল।
─‘এক গ্লাস জল দিতে পারো।’
আপাদমস্তক আমার দিকে তাকিয়ে দেখল একবার-বাঁ হাঁটুর পাশে ধূতির ফুটোর উপর চোখ বুলিয়ে নিল একবার, বোতাম ছেঁড়া শার্টের হাতাটা, অপরিচ্ছন্ন জুড়োজোড়া আধময়লা কাপড়-চোপড় সবই দেখতে হয় তাকে─
বললে─‘দরজার কাছে এসে দাঁড়াবেন না’।
খানিক, ঝাড়ুদারকে ধমকার পাঁচ মিনিট বসে, জনমানবহীন অন্ধকার সেলুনের দিকে বার দুই গেল, ফিরে এল, একটা বিড়ি জ্বালাল, মিনিট দুই টেনে আড়মোড়া ভেঙে একটা খানশামা ছোকরাকে বললে এক গ্লাস জল ঢেলে দিতে। জল কাচের গ্লাস পেলাম অবিশ্যি।
পরিতৃপ্তি মন্দ নয়।
মা সঙ্গে খাবার দিতে ভুলে গেছেন; কী খাওয়া যায়? চুরুটই কিনে নেয়া যাক গোটা চারেক।
বিছানায় শুয়ে ধীরে-ধীরে ঘুম আসে; সমস্ত আকাশ মেঘে ভরে আছে; বৃষ্টি নেই তবু বাতাস আসছে, বড় আরাম, প্রথম রাতেই শীত করতে লাগল─ইচ্ছে করল গায়ে কম্বল টেনে নেই একটা─কিন্তু কম্বল তো আনিনি; জড়সড়ো হয়ে শুয়ে রইলাম।
মাঝে মাঝে বড় অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি─সৃষ্টির ক্ষমাহীন বিরল মুখ চারদিকে ভাসতে থাকে বিছানার উপর উঠে বসে থাকি। চুরুট টানতেও ইচ্ছে করে না।
নদীর মুখের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আকাশে ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ, নিরবচ্ছিন্ন গভীর বাতাস, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, শরীরের ভিতরে রক্ত। হেমন্তের গভীর রাত...স্টিমারের সার্চলাইটের দিকে চীনা রেশমের মতো নরম ডানাওয়ালা অসংখ্যা ধূসর পোকা উড়ে আসছে; এগুলোকে কী পোকা বলে! দু’-একটা আমার হাতের উপরে মুখের উপর এসে পড়ছে─ডানার ভিতর থেকে নরম শাদা-শাদা গুঁড়ি-গুঁড়ি ঝরে পড়ছে─আলোর জন্য এরা পাগল─কচি শিশুর বুকের মতন পাখনা ধড়ফড় করছে, ডেকের চারপাশে এই সব মৃত পোকার দল মুহূর্তে-মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে, এক-একটা পাগলা ঢেউয়ের লেলিহান ঝর্ণায় সেই সব মৃত শরীর অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। আবার একটা মৃত পোকা তুলে নেই; মাখনের মতো শাদা পালক পাখনা, ছোট্ট শরীর অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। আবার একটা মৃত পোকা তুলে নেই; মাখনের মতো শাদা পালক পাখনা, ছোট্ট শরীরের মধ্যে চোখ মুখ গলা বুক পা ডানা দেহের কারুকার্যে তাজমহলের শিল্পগুলোর চেয়ে একটুও কম সহিষ্ণুতা কৌশল ও যত্ন দেখায়নি তো! লক্ষ লক্ষ বার এই রকম গভীর সাধনার পরিচয় দিয়েছে এই কীটনির্মাতা।
কিন্তু তবুও মৃত্যু ও অন্ধকারের মধ্যে এই অবর্ণনীয় প্রয়াস মুহূর্তে-মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তবুও বিরাম নেই তো শিল্পীর!
উপরে ফিরে এসে দেখি আমার বিছানার উপর দিয়ে জুতো মাড়িয়ে চলতে ভ্রুক্ষেপ করেনি কেউ; যেখানে সেখানে কাদা ও সুরকির ছাপ।
আস্তে-আস্তে ধুলোগুলো ঝেড়ে নিয়ে বসলাম।
তাকিয়ে দেখলাম একজন বুড়ো মানুষ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
─‘মশাই শুনছেন?’
─‘আমাকে বলছেন?’
─‘আপনাকেই?’
─‘বলুন।’
─‘এটা কি আপনার বিছানা?’
─‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
─‘এখানে আমি একটু শুতে চাই।’
একটু হেসে─‘সে আপনার অনুগ্রহ।’
─‘না, ঠাট্টা নয়।’
─‘আমিও ঠাট্টা করছি না।’
─‘দেখছেন তো কী রকম ভিজে বিড়ালের মতো চেহারা আমার; আজ কম করে সাত ক্রোশ পথ হেঁটেছি─সেই হতচ্ছাড়া মিনসে জনার্দনটার পাল্লায় পড়ে’, চোখ কপালে তুলে হাঁসের মতো ফোঁসফোঁস করে বুড়ো, ‘মিনসে আবার হয় আমার সম্বন্ধী─মগের ভাই─কাজেই...’
─‘বুড়ো বয়সে অনেক হাঁটিয়ে ছাড়লে দেখছি!’
─‘আমার ব্যাপারটা কী শুনুন।’
─‘বলুন।’
আমার বিছানায় হাত বুলিয়ে জায়গা খুঁজে নিয়ে বসল। কাঁধে একটা চাদর শুধু─পরনের কাপড় কোমরে জড়ানো আছে বেট, কিন্তু হাঁটু পর্যন্তও নামেনি। শনের মতন সাদা চুল, গালে মাসখানেকের সাদা দাড়ি গজিয়েছে, যেন অনেক দুঃখকষ্ট, শূন্যতা ও ধূসরতার ভিতর দিয়ে; কথা বলতে-বলতে বুড়োর মুখ যখন একটু প্রসন্ন হয়ে ওঠে, মনে হয়, হাঁড়ির থেকে এক থাবা দই নিয়ে মানুষটির গালে খুব বেমালুম ভাবে ঘসে দিয়েছে কে যেন। চোখ দুটো থ্যাঁতলানো বেত-ফলের মত– জায়গায় জায়গায় মরিচের রং রয়েছে।
─‘ঝাঁ ঝাঁ রোদের ভিতর দুপুরবেলা আমাকে আকড়াপুরের মাঠে নিয়ে গেল।’
─‘কেন?’
─‘বললে সেখানে একটা তেঁতুল গাছে রোজ দুপুরবেলা নাকি আমার লক্ষ্মীর আবির্ভাব হয়।’
─‘কী রকম?”
─‘মশাই, আমারও মাথা খারাপ, নইলে ঐ ছাগলের কথা কেউ শোনে? আমার স্ত্রী মরল বীরেন মুখুজ্যেদের পোড়ো বৈঠকখানার কড়িকাঠে ঝুলে, আকড়াপুরের তেঁতুল গাছের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?’
─‘তাই তো?’
─‘তাতে শুনেছি পেত্নীরা নাকি এক-একটা গাছ আশ্রয় করে থাকে।’ চুরুটটা জ্বালিয়ে নিয়ে
─‘তাই শুনেছেন বুঝ?’
─‘আজ্ঞে ধর্মে এই কতাই বলে।’
─‘আপনার স্ত্রী পেত্নী হয়েছেন মনে আপনার?’
─‘ভর সন্ধ্যার ডাকিনী সে; ইহলোকের মানবীর সঙ্গে তার কি আজ আর কোনো সম্বন্ধ আছে?’
─‘নেই?’
─‘নারায়ণ-নারায়ণ।’
বুড়োকে বড় কাতর দেখলাম।
─‘কেনই-বা গলায় দড়ি দিলেন?’
─‘এ সব আর জিজ্ঞেস করবেন না।’
─‘একটা চুরুট খাবেন?’
─‘বিড়ি নেই আপনার কাছে?’
─‘না।’
─‘চুরুটগুলো বড্ড কড়া।’
─‘দেখুন একটা খেয়ে।’
─‘দিন।’
একটা টিনের বাক্সের মধ্যে চুরুটটা রেখে দিয়ে বুড়ো─‘তা সেই আকড়াপুরের তেঁতুল গাছে সে থাকবে কেন? তাকে তো সেখানে দেখলাম না।’
নীরব ছিলাম।
─‘মিছিমিছি হেঁটে-হেঁটে আমার কোমর টনটন করছে।’
─‘শুয়ে পড়ুন।’
─‘আমরা কিন্তু জেতে দ্বাদশ তিলি।’
─‘বেশ।’
─‘আপনাকে দেখে তো বামুন-বামুন মনে হয়।’
─‘আজ্ঞে সে যে নই!’
─‘আপনি কায়েত?’
─‘বদ্যি।’
খানিকক্ষণ নিস্তবদ্ধ থেকে বুড়ো─‘সেও তো আপনার ঘুরেফিরে বামুনই হল।’
─‘আমি নিজেকে চাঁড়াল মনে করি।’
─‘পৈতে নিয়েছেন?’
─‘আজ্ঞে না।’
─‘এক বিছানায় শোব; পায়ে-পায়ে ঠেকে যায় যদি?’
─‘তবে না হয় নাই-বা শুলেন?’
─‘রাধাবল্লভের নাম করে শুয়েই পড়া যাক। আপনিও শোবেন তো?’
─‘একটু দেরি আছে আমার।’
টিনের বাক্স থেকে একটা বিড়ি বের করে শুয়ে পড়ে।
─‘বুড়োর গলায় যে কণ্ঠীর মালা আছে আমার সেদিকে বুঝি নজর পড়েনি আপনার? দেশলাই আছে?’
─‘আছে।’
─‘দিন-বিড়িটা জ্বালিয়ে নেই।’
দিলাম।
─‘নামাবলীর বদলে চাদর পিঠে ফেলে বেরিয়েছি আজ ফোটা-তিলকও কাটিনি─কিন্তু বৈষ্ণব হয়েছি আমি আজ প্রায় ৪-৫ বছর হল।’ লোকটা বলে, ‘আমাকে দীক্ষিত করেছিলেন কানুপ্রিয় গোঁসাই বাবাজী─নাম শুনে থাকবেন─এ অঞ্চলে কালা গোঁসাই বললে গরু-বাঘ সকলেই চেনে। সে কি আজকের কথা গোঁসাই?’
বিড়িটা জ্বালিয়ে নিয়ে বুড়ো─‘আমার নাম হর্ষনাথ, খুব ভালো খোল বাজাতে পারি। শুনেছেন?’
─‘আজ্ঞে না।’
ঈষৎ আহত হয়ে ওঠে─‘বাস্তবিকই শোনেননি? দল করেছিলাম, কত কীর্তনের দলে আমি গেয়ে বেড়াই।’
─‘সেটাও পারেন?’
পারি একটু-আধটু, খোলমৃদঙ্গেই আমার হাত বেশি। বাজাতে-বাজাতে দাঁড়িয়ে উঠে নাচতে থাকি কার মাথা কার লেজ মাড়িয়ে যাই খেয়ালও থাকে না। খেয়ালের দরকারই-বা কী? দ্বাদশ তিলির সন্তান বলে বৃন্দাবনে আমি পরিত্যাজ্য নই তো?’
─‘না, তা নন।’
─‘আপনিও যেন বৃন্দাবনের অধিকারী আমিও তেমনি।’ আমি সমর্থন করে মাথা নাড়লাম।
─‘কার পা কার গায়ে লেগে যায়, কানুর পাই তো রাধার গায়ে লাগছে–এই তো অবশেষে বিচার; কী বলেন?’
─‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
খানিকক্ষণ নিস্তব্ধভাবে বিড়ি টেনে─‘তা হলে আমাদের দুজনের মধ্যে বৃন্দাবনের সম্বন্ধ হল!’
─‘হলে তো ভালই।’
─‘রাতের বেলা আমার পা যদি আপনার গায়ে লেগে যায় বৃন্দাবনের ধুলো বলে মনে করে নেবেন তা দাদা?’
─‘খুব।’
বিড়ি ফুঁকতে-ফুঁকতে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে─‘আপনার ঘুম পায়নি?’
─‘না!’
─‘বসেই থাকবেন?’
─‘কিছুক্ষণ তো─’
─‘আমি তা হলে ঘুমিয়ে পড়ি?’
─‘নির্বিঘ্নে।’
─‘কোথায় নামব জানেন?’
─‘কোথায়?’
─‘সেই ট্রেন ধরব গিয়ে; আপনি?’
─‘আমাকেও ট্রেন ধরতে হবে।’
─‘কলকাতায় যাবেন?’
─‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
─‘আমিও কলকাতায়ই চলেছি।’
─‘বেশ তো; কোন আখড়ায়?’
─‘এই স্টিমারটা ধরবে কখন খুলনায়?’
─‘আজ্ঞে হ্যাঁ ভোরবেলায়।’
─‘তা হলে সারারাত ইস্টিমারেই ঘুমোতে পারা যাবে?’
─‘আজ্ঞে।’
─‘একটা অনুরোধ আপনার কাছে।’
─‘বলুন।’
─‘আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি–’
─‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
─‘তা হলে আমাকে আর জাগাতে যাবেন না।’
─‘একটা হাতপাখা থাকলে আমি বরং আপনাকে হাওয়া করেই রাত কাটিয়ে দিতাম, গোঁসাই!’
─‘ঘুমালে পরে গা-গতরও ঠেলবেন না। রাতটা একটু ঘুমিয়ে নিতে চাই। কাল তো আবার কলকাতায় গিয়ে আখড়ার গোলমাল সব!’
অতি সহজেই ঘুমিয়ে পড়ল।
[উপন্যাসের অংশবিশেষ]
- বিষয় :
- গল্প