মধ্যবিত্তের পাশে দাঁড়াবে কে
মুহিবুল হাসান রাফি
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যবিত্তের জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থের অভাব নয়, বরং অর্থ থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে না পারা। মাসের শুরুতে বেতন আসে, কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই অর্থ ভাগ হয়ে যায় বাড়ি ভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে। হিসাবের খাতায় আয় থাকে, কিন্তু স্বস্তির জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়। মাস শেষে সঞ্চয়ের ঘরটি প্রায়ই শূন্য পড়ে থাকে। কোনো আকস্মিক অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বিপর্যয় মুহূর্তে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই মধ্যবিত্তের বর্তমান জীবনসংগ্রামকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক মর্যাদা রক্ষা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং নিরাপদ জীবনের ক্রমশ অধরা হয়ে ওঠা।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট বেতন, ছোট ব্যবসা কিংবা সীমিত পেশাগত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আয় নিয়মিত হলেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের হাতে সীমিত। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও যাতায়াত–প্রতিটি খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এসব প্রয়োজনের অধিকাংশ এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। দোকানে পণ্য আছে, কিন্তু তা কেনার পর পরিবারের অন্য প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য কতটা থাকবে, সেই হিসাব মধ্যবিত্তকে প্রতিদিন তাড়া করে।
মধ্যবিত্তের সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসামঞ্জস্য। বেতন বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। কাগজে আয় বাড়লেও বাস্তবে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না। বরং আগের মতো চলতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী, নিম্ন ও মধ্যম বেতনের সরকারি কর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই চাপের ভিন্ন ভিন্ন রূপ অনুভব করেন। কারও আয় নির্দিষ্ট, কারও আয় অনিয়মিত; কিন্তু ব্যয়ের চাপ প্রায় সবার ক্ষেত্রেই অব্যাহত।
মধ্যবিত্তের সমস্যাকে কেবল ব্যক্তিগত বাজেট ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেউ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সাময়িক স্বস্তি পেতে পারেন, কিন্তু খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো অপরিহার্য খরচ অনির্দিষ্টকাল কমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যখন প্রয়োজনীয় ব্যয়ই আয়ের বড় অংশ গ্রাস করে, তখন ব্যক্তিগত সাশ্রয় দিয়ে কাঠামোগত সংকটের সমাধান করা যায় না। প্রয়োজন এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ, যেখানে পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে এবং নিয়মিত আয়ের মানুষও ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করতে পারবেন।
মুহিবুল হাসান রাফি: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ
[email protected]
- বিষয় :
- মধ্যবিত্ত