ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

মশা কেন অন্যদের চেয়ে কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়

মশা কেন অন্যদের চেয়ে কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়
×

মশা (ফাইল ফটো)

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৯ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৪৫

প্রায় দেখা যায়- একই ঘরে বা একই জায়গায় বসে থাকলেও একজনকে বারবার মশা কামড়াচ্ছে, অথচ পাশের মানুষটিকে কামড়াচ্ছে না। অনেকেই এর কারণ হিসেবে ‘মিষ্টি রক্ত’ এমন কথা বলে থাকেন। বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। মশা অনেক দূর থেকেই মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া বিভিন্ন জৈবিক সংকেত শনাক্ত করতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাসে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের তাপ, ত্বকের গন্ধ, ত্বকে থাকা অণুজীব, এমনকি জিনগত বৈশিষ্ট্যও নির্ধারণ করে- মশা কাকে বেশি কামড়াবে। গবেষকদের মতে, একই জায়গায় থাকা চারজনের মধ্যে একজনই কখনও কখনও মোট মশার কামড়ের প্রায় ৯০ শতাংশের শিকার হতে পারেন।

কার্বন ডাই-অক্সাইডই প্রথম সংকেত
মানুষকে কামড়ায় শুধু স্ত্রী মশা। ডিমের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করতেই তারা মানুষের রক্ত পান করে। প্রায় ১০ মিটার দূর থেকেই মশা মানুষের নিঃশ্বাস ও ত্বক থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। এই গ্যাসই মশাকে জানিয়ে দেয় কাছাকাছি একটি সম্ভাব্য শিকার রয়েছে। এ কারণেই শিশুদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের মশা বেশি কামড়ায়। কারণ তারা বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন। এমনকি মশা ধরার অনেক ফাঁদেও ড্রাই আইস বা বোতলজাত কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। কারণ এটি মশাকে আকৃষ্ট করতে কার্যকর।

শরীরের তাপ ও ঘাম আকৃষ্ট করে 
কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি শরীরের তাপ ও আর্দ্রতা মশাকে আকৃষ্ট করে। গর্ভবতী নারী এ কারণে অন্যদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি মশার কামড়ের শিকার হতে পারেন। গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যাওয়ায় শরীর থেকে বেশি তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। একই কারণে ব্যায়ামের সময় বা ব্যায়ামের পর শরীর গরম ও ঘর্মাক্ত থাকলে মশা বেশি আকৃষ্ট হয়। তুলনামূলক বড় গড়নের মানুষের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কারণ তাদের শরীর থেকে সাধারণত বেশি তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়।

ত্বকের গন্ধই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে
মশা যখন মানুষের কাছাকাছি চলে আসে, তখন সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে ত্বকের গন্ধের ওপর। গবেষকদের মতে, মশা এক ধরনের ‘রাসায়নিক জগতে’ বাস করে। মানুষের ত্বক থেকে নির্গত বিভিন্ন উদ্বায়ী জৈব যৌগ তাদের কাছে আলাদা আলাদা সংকেত হিসেবে কাজ করে। ত্বকে থাকা অণুজীব বা স্কিন মাইক্রোবায়োম কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাটি অ্যাসিড ও পেপটাইড ভেঙে এসব রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে। মানুষের ত্বকে ৫০০টিরও বেশি ধরনের  উদ্বায়ী জৈব যৌগ পাওয়া যায় এবং এগুলোর সমন্বয়ই একজন মানুষের স্বতন্ত্র গন্ধ তৈরি করে।

মিষ্টি রক্ত’ নয়, আসল কারণ অন্য
অনেকের ধারণা, যাদের রক্ত মিষ্টি, তাদেরই মশা বেশি কামড়ায়। তবে বিজ্ঞানীরা এই ধারণার কোনো প্রমাণ পাননি। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে থাকা অ্যামোনিয়া, ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং বিশেষ করে কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি হলে মশার আকর্ষণও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় ৬৪ জনের ত্বকের গন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যাদের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড বেশি ছিল, মশা তাদেরই সবচেয়ে বেশি বেছে নিয়েছে। একজনের প্রতি মশার আকর্ষণ আরেকজনের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

এই আকর্ষণ অনেকটাই জিনগত
গবেষকদের মতে, মশার কাছে কারও আকর্ষণীয় হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই স্থায়ী এবং জিনগতভাবে নির্ধারিত। যমজদের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন যমজদের প্রতি মশার আকর্ষণ প্রায় একই রকম হলেও ভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে তা আলাদা হতে পারে। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য কম কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বেশি, তারা ম্যালেরিয়াবাহী মশার কাছে তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয়।

সবার শরীরে প্রতিক্রিয়া এক নয়
মশার কামড় খেলেই যে সবার শরীরে একই ধরনের দাগ বা চুলকানি হবে, তা নয়। কারও শরীরে বড় ফোলা দাগ, তীব্র চুলকানি ও অ্যালার্জির মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, আবার কারও ক্ষেত্রে ছোট একটি লাল দাগ হয় বা কোনো লক্ষণই থাকে না। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিন মশার কামড়ের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তাই অনেক সময় মনে হতে পারে একজনকে বেশি মশা কামড়াচ্ছে, অথচ বাস্তবে তার শরীরের প্রতিক্রিয়াই বেশি দৃশ্যমান।

মশার কামড় থেকে বাঁচবেন কীভাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রসুন খাওয়া বা ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে মশা দূরে থাকে—এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং ডিইইটি, পিকারিডিন  বা পিএমডি সমৃদ্ধ রিপেলেন্ট ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর। এর পাশাপাশি লম্বা হাতার পোশাক পরা, শরীরের খোলা অংশ ঢেকে রাখা, মশারি ব্যবহার এবং ঘাম হলে বা কয়েক ঘণ্টা পর রিপেলেন্ট আবার ব্যবহার করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞান বলছে, মশা কাকে বেশি কামড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে আপনি মশার প্রিয় লক্ষ্যবস্তু হন বা না হন, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ মশাবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে সবারই প্রয়োজন সমান সতর্কতা এবং কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। সূত্র-বিবিসি 

আরও পড়ুন

×