সমাজ
ধর্ষণে ভুক্তভোগীর নাম ও মর্যাদার প্রশ্ন
আইরিন সুলতানা
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৯:২৭
এক যুগেরও বেশি আগে দিল্লিতে বাসে ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল গোটা ভারত। বাংলাদেশেও এই নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ছিল আলোচিত। আসল নাম আড়াল করে ওই তরুণীর নাম দেওয়া হয় ‘নির্ভয়া’। খবরের শিরোনাম, আদালত, সাধারণ মানুষের সহমর্মিতায় ওই নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে মেয়েটি। ২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার আরজি কর সরকারি হাসপাতালে ধর্ষণ ঘটনায় আবারও ফুঁসে উঠেছিল ভারত। বিচার চেয়ে রাজপথে নামা আন্দোলনকারীরা ভুক্তভোগীর নাম দিয়েছিল ‘অভয়া’।
মেটা-গুগলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল এক তরুণী। মামলায় তার জয় হয়। এই মামলা চলাকালে এবং রায়ের পরও আন্তর্জাতিক খবরে তার পুরো নাম আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের জুরিদের নথিতে লেখা হতো শুধু তার নামের আদ্যাক্ষর– কেজিএম। বাইরে যারা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাও পুরো নামটি নেননি। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল– ‘উই আর কেজিএম’।
বাংলাদেশে ‘ভাশুরের নাম মুখে না নেওয়া’র পারিবারিক-সামাজিক শিক্ষা আছে। আছে ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষণকারীর নাম মুখে না বলা, কাগজে না লেখার চর্চা। ধর্ষণে অভিযুক্তের নাম-চেহারা মনে করাও দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধে আমাদের স্মৃতিতে অম্লান শুধু ধর্ষণের শিকার মেয়েটির নাম-ছবি।
নাগরিক সাংবাদিকতার ব্যর্থতা হলো সবাই নিজেকে আস্ত টেলিভিশন ভেবে বসে। বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম বহুলাংশে ও বিলম্বে হলেও যদিও সামলে নিয়েছে বা নিচ্ছে; সামলানো যাচ্ছে না সোশ্যাল মিডিয়াতে বারোয়ারি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের। ভুক্তভোগীর নাম নেওয়া ছাড়া ‘ভিউ’ বাড়বে না– শঙ্কা থেকেই কি এমন? শুধু ধর্ষণকারীর নাম নিয়ে বিচার চাইলে কি কোথাও হেলদোল হবে না! প্রতিবাদ সভার ব্যানারে ধর্ষকের নাম থাকবে বিস্মৃত!
ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার নারী-শিশুর ছবি, নাম, পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না মর্মে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নির্দেশনা দেওয়া আছে। ২০২১ সালের ৮ মার্চ হাইকোর্ট সতর্ক করে বলেছিলেন– ভুক্তভোগীর পূর্ণ নাম, ঠিকানা, ছবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থলের নামসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এর পরও ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ থেমে ছিল না। ২০২৫ সালে মাগুরায় একটি শিশুর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বুম, ফোন নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা দেদার ভুক্তভোগীর পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যদের স্পষ্ট চেহারাসহ ভিডিও প্রচার করেছিল। তাদের ফেসবুক পেজের ফটোকার্ডে ভুক্তভোগীরও নাম-ছবি বসিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ ওই ফটোকার্ড শেয়ার করে; বিক্ষুব্ধ মনে প্রতিবাদী স্ট্যাটাস দিতে থাকে। আইনে বলা আছে বটে; কিন্তু আইনের নির্দেশনা মেনে চলার বিষয়টি ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দিলে ফেসবুক যুগে বারবার বিশৃঙ্খলার উদাহরণই সামনে আসবে।
ফুয়াদ-অর্ণব জুটির পুরোনো একটি গান আছে– ‘তুমি তাদের নাম দিলে না/ মনের ভুলে কেউ দিল না/ তোমার দেওয়া আমার কোনো/ নাম ছিল না নাম ছিল না’। আফসোস! আমাদের দেশে কোনো একটি ধর্ষণ মামলায় আইনজীবী-আদালত সহমর্মিতা থেকে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে ভুক্তভোগীকে একটি নাম দিতে এগিয়ে এলেন না। আফসোস! ধর্ষণের খবর ছাপাতে গিয়ে ভুক্তভোগী মেয়ে বা ছেলেটির (ছেলে ধর্ষণের কথাও মনে রাখতে হবে) একটি বিশেষ নাম দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি হলো না আজও এ দেশে। ধর্ষণ অপরাধের খবরগুলো টিভি ও পত্রিকায় কী ভাষা কাঠামোতে প্রকাশ হবে? এই উত্তর নির্ধারণ করতে ৯টি প্রস্তাবনা কাজে লাগাতে হবে। এক: আদালত, তথ্য মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়, গবেষক-সাহিত্যিক, রাজনীতিক এবং সংবাদমাধ্যম মিলে মানবিক, নাগরিক অধিকার ও পেশাগত ভারসাম্যের সমন্বয়ে নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। দুই: ধর্ষণ অপরাধের খবরগুলোর শিরোনাম, বিবরণ, ছবি, বক্তব্য কেমন হবে– সেসব নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করতে পারে পিআইবি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। তিন: এনজিওগুলো নারী ও শিশু বিষয়ে সময়োপযোগী অনেক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। ধর্ষণ অপরাধবিষয়ক সাংবাদিকতা নিয়েও বিশেষ ক্যাম্পেইন চালু করতে পারে। চার: মানবাধিকার সংস্থাগুলো পত্রিকার খবরের তথ্যের ভিত্তিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে নারী ও শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। দেশের কোনো পত্রিকা ধর্ষণ অপরাধের খবরে ভুক্তভোগীর নাম-ছবি ছেপে দিচ্ছে, এমন জরিপ গুরুত্ব সহকারে করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। পাঁচ: সেসব সংবাদমাধ্যম ধর্ষণ ঘটনার খবর দিতে গিয়ে ভুক্তভোগী মেয়ে বা ছেলের নাম-ছবি প্রকাশ করছে না, তাদের উচিত এই কথাটি গোলটেবিল করে, ফটোকার্ড পোস্ট করে সবাইকে জানানো, যেন অন্যেরাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে এগিয়ে আসে এরপর। ছয়: বিশেষত প্রচুর ফলোয়ার থাকা কনটেন্ট ক্রিয়েটররা বা সংবাদমাধ্যম যদি আবেগে ভেসে বিবেকের কাজ ভুলে গিয়ে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর নাম-ছবি প্রকাশ করে; তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণও বাধ্যতামূলক করতে হবে। সাত: মিরপুরের ধর্ষণ ঘটনায় এখন পর্যন্ত টকশোতে ভুক্তভোগীর নাম কানে যাচ্ছে। তাদের সচেতন ও সতর্ক করবে কে? উপস্থাপক বা মডারেটর অনুষ্ঠান শুরুর আগে এ বিষয়ে বক্তাদের অবহিত করতে পারেন। আট: সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদমাধ্যম, রেডিও-টিভি চ্যানেল, এমনকি রাজপথে বিচার চাওয়ার স্লোগান-ব্যানারে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তার প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখা হচ্ছে কিনা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।
তবে এই আলোচনার একটি বিপরীত ও শক্তিশালী দৃষ্টিকোণ আছে। দিল্লির ধর্ষণ ঘটনার তিন বছর পর এক সভায় এনডিটিভির সাংবাদিক বারখা দত্ত সমাজের হীনম্মন্যতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘নির্ভয়া নামটি সবার কাছে সাহসের প্রতীক হয়ে উঠলেও ধর্ষণ নিয়ে সমাজের সংকীর্ণ মনোভাবের কারণে আজও নির্ভয়ার প্রকৃত নামে তাঁকে ডাকা যায় না।’ ওই সভাতেই ছলছল চোখে নির্ভয়ার মা প্রথমবার বলেছিলেন, তাঁর মেয়ের নাম জ্যোতি সিং; আর তিনি মেয়ের নাম প্রকাশে সংকোচ বোধ করেন না। তিনি বলেছিলেন, যারা অপরাধের শিকার তাদের নাম লুকানোর কিছু নেই। যে অপরাধী তারই বরং লজ্জিত হতে হবে।
নির্ভয়া ওরফে জ্যোতি সিংয়ের মায়ের এই মনোবলকে স্যালুট করতেই হবে। নিশ্চয় সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা সমাজের কূপমণ্ডূকতাকে চোখ রাঙিয়ে বলতে পারেন নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের কথা, আর তারা নিজ নামেই তা বলবেন। রাষ্ট্র, সংবাদমাধ্যম ও আইনের দায়িত্ব সেই সাহসী উচ্চারণের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে ভুক্তভোগী ও পরিবারের সুস্পষ্ট অনুমতি না থাকলে তাদের গোপনীয়তা বজায় রাখার দায়িত্ব ও দায় সবার ওপরেই বর্তায়।
আইরিন সুলতানা: জ্যেষ্ঠ সহসম্পদাক, সমকাল
- বিষয় :
- সমাজ
