নারী কৃষক বর্ষ
জলবায়ু লড়াইয়ে নারী
সুস্মিতা দাস
সুস্মিতা দাস
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১০:৫২
লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস, গ্রামীণ জীবিকা সুরক্ষা এবং কৃষিতে নারীর অপরিহার্য ভূমিকাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৬ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি কর্মশক্তির ৫০ শতাংশের বেশি নারী। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট দেশের কৃষি খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়ন, সম্পদের সমবণ্টন এবং টেকসই কৃষিতে নারী কৃষকদের অবদানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
এই বৈশ্বিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে গত ৫ এপ্রিল। কৃষি মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ ২০২৬-এর জাতীয় কার্যক্রমের শুভ সূচনা করেছে। এটি দেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতিগত প্রতিশ্রুতিরই বহিঃপ্রকাশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আয়োজিত এই বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), ইউএন উইমেনসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজন একসঙ্গে কাজ করছে। এই যৌথ প্রয়াস বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং কৃষি রূপান্তরে নারী কৃষকদের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
নীতিগত এই তৎপরতা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন চলমান বর্ষা মৌসুমে একদিকে দক্ষিণাঞ্চলের নোনাজল, অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যাকবলিত হাওরাঞ্চলে নীরব অথচ যুগান্তকারী রূপান্তর ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে নারীরা এখন কেবলই ‘অসহায় শিকার’ নন; বরং দেশের জলবায়ু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মূল কারিগর হিসেবে নিজেদের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় যখন মাঠ পর্যায়ে এই রূপান্তরের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই সহনশীলতার প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই মন্ত্রণালয় তাদের হালনাগাদকৃত ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান’ (সিসিজিএপি) বাস্তবায়নের গতি দ্বিগুণ করেছে। এই নতুন কর্মপরিকল্পনায় প্রাকৃতিক সম্পদ, নারীর নেতৃত্ব এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল অবকাঠামোসহ ছয়টি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায় ‘জেন্ডার-রেসপন্সিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন’ (জিসিএ) প্রকল্পটি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ইউএনডিপি এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের যৌথ সহযোগিতায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় খুলনা ও সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জেলায় এক হাজারেরও বেশি ‘উইমেন লাইভলিহুড গ্রুপ’ বা নারী জীবিকা দল গঠন করেছে। এসব দলগ এখন জলবায়ু-সহনশীল সুপেয় পানি ব্যবস্থাপনা এবং লবণাক্ততা-সহনশীল মৎস্য চাষ পরিচালনা করছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সরাসরি ৩০ সহস্রাধিক পরিবারকে সুরক্ষা দিচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় বন সংরক্ষণের লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ আইনিভাবে নারী অংশীজনের জন্য বরাদ্দ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে, যা তাদের অগ্রভাগের ‘বনরক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার এই লড়াই এখন বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বর্তমানে ‘ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করছে, যার মূল লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায়ের নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকে স্থানীয় জলবায়ু বাজেট পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখার জন্য দক্ষ করে তোলা। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ পরিবারের কাছে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা পৌঁছানো নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের বিশেষ লক্ষ্য হিসেবে বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারীদের জন্য নিরাপদ জোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা দুর্যোগকালে তাদের গতিশীলতা ও নিরাপত্তা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে সামনের চ্যালেঞ্জগুলোর চিত্রও বেশ আশঙ্কাজনক। ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জেন্ডার-সমতাভিত্তিক নীতি ব্যর্থ হলে বিশ্বব্যাপী আরও ১৫৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন নারী ও শিশু চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে। চলতি বছরেই স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে। তাই ২০২৬ সালে দেশের মূল লক্ষ্য হলো ‘ফোর বেটারস’ বা চার উন্নয়ন সূচক: উন্নত উৎপাদন, উন্নত পুষ্টি, উন্নত পরিবেশ ও উন্নত জীবন নিশ্চিত করা।
সম্পদ ও সেবার ক্ষেত্রে জেন্ডার বৈষম্য দূর করা কেবল সামাজিক লক্ষ্য নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক তাগিদ। ‘উইমেন-লেড গ্রিন মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ ইনকিউবেটর’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি এবং জলবায়ু-সহনশীল বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে সরকার এবং এফএও কৃষি খাতের কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
মাঠ পর্যায়ের এই নীতিগত রূপান্তরকে আরও বেগবান করতে প্রান্তিক নারী কৃষকদের টেকসই চাষাবাদ পদ্ধতি যেমন ভাসমান সবজি চাষ বা ‘ধাপ চাষ’ এবং খাঁচায় মাছ চাষের মতো পরিবেশবান্ধব কৌশলগুলোতে দক্ষ করতে বিশেষ ভিজুয়াল মিডিয়া ও মোশন পিকচার্স-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন কৃষি খাতের এই নারীমুখী বিবর্তনকে গতিশীল করতে জামানতবিহীন ও স্বল্প সুদে বিশেষ ‘সবুজ ঋণ’ (গ্রিন ক্রেডিট) চালু করেছে। এই অর্থায়নের মাধ্যমে নারী স্বনির্ভর দলগুলো সৌরচালিত সেচ পাম্প এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সক্ষম হচ্ছে। পারিবারিক শ্রমের অদৃশ্য বৃত্ত ভেঙে নারীরা এখন সরাসরি বাজার সংযোগ তৈরি করছেন এবং ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ ২০২৬-কে কেন্দ্র করে বর্তমানের এই তৎপরতা আসলে আগামী কয়েক দশকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেরই অংশ। সম্প্রতি যে উদ্যোগগুলোর সূচনা হয়েছে, তা আগামী দিনের একটি উন্নত ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার মূল ভিত্তি।
সামনের দিনগুলোতে সাময়িক অভিযোজনের গণ্ডি পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে নারী নেতৃত্বাধীন প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বেল্টের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ সরবরাহ চেইনের ডিজিটালাইজেশন, যেখানে নারীরা প্রযুক্তি-দক্ষ ‘কৃষি উদ্যোক্তা’ হিসেবে ভূমিকা পালন করবেন।
আগামী দিনে উপকূলের লবণাক্ত মাটিতে লাঙল ধরা নারী যেন জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি হয়ে কেবল টিকে থাকার লড়াই না করেন। বরং টেকসই ও উচ্চ প্রযুক্তির অর্থনীতিতে সগৌরবে নিজের বিকাশ ঘটাতে পারেন। জলবায়ুর এই যুদ্ধ জয় বা পরাজয় নির্ধারিত হয় ফসলের মাঠে। অদূর ভবিষ্যতের সেই মাঠগুলো পরিচালিত হবে বাঙালি নারীর নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও অদম্য সহনশীলতার হাত ধরেই।
ড. সুস্মিতা দাস: পরিচালক, কৃষি তথ্যকেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল
[email protected]
- বিষয় :
- কৃষক
