প্রতিবেশী
সীমান্তবর্তী রাজ্যে বিজেপি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য সংকট
আসিফ বিন আলী
আসিফ বিন আলী
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৯:৫৭ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ০৯:৫৮
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, বিষয়টি এখন আর শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিচ্ছিন্ন আচরণ নয়। এটা ধীরে ধীরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিকত্ব বিতর্ক, হিন্দুত্ববাদী নির্বাচনী ভাষ্য এবং কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়েছে।
আগে দিল্লির বিজেপি সরকার সীমান্ত, অনুপ্রবেশ, সিএএ, এনআরসি, বিএসএফের ক্ষমতা এবং নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে যে ভাষ্য তৈরি করত; পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার অনেক ক্ষেত্রে সেটির রাজনৈতিক প্রতিরোধ করত। এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সেই প্রতিরোধ অনেকটাই কমে যেতে পারে। এর ফলে দিল্লি, কলকাতা, বিএসএফ, রাজ্য পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুতে আরও সরাসরি সমন্বয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিজেপি শাসিত বা বিজেপি প্রভাবিত রাজ্যগুলোর উত্থান সীমান্তে তিন ধরনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রথমত, পুশইনকে স্থানীয় প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার ঝুঁকি। দ্বিতীয়ত, বাংলাভাষী মুসলমান, শ্রমজীবী মানুষ ও রোহিঙ্গাদের একসঙ্গে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দেখার ঝুঁকি। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দ্বিপক্ষীয় আইনি প্রক্রিয়ার বদলে একতরফা বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থার ঝুঁকি।
পশ্চিমবঙ্গ: বিজেপির জয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত রাজ্য। ভাষা, পরিবার, শ্রমবাজার, নদী, বাণিজ্য, চোরাচালান, গরু, মাদক, সীমান্ত হাট, অনুপ্রবেশ, অভিবাসন– সব প্রশ্ন এখানে একসঙ্গে কাজ করে। এই সীমান্ত শুধু রাষ্ট্রীয় সীমান্ত নয়। এটা ইতিহাসের সীমান্ত, ভাষার সীমান্ত, পরিবারের সীমান্ত, আবার রাজনীতিরও সীমান্ত।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বড় জয় পেয়েছে। বিজেপি নেতারা প্রচারে বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অভিবাসনকে বড় ইস্যু করেছেন। তৃণমূল সরকারের সময় সিএএ, এনআরসি, সীমান্ত বেড়া, বিএসএফের ক্ষমতা এবং অবৈধ অভিবাসী শনাক্তকরণ নিয়ে দিল্লি ও কলকাতার মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল।
এখানে বাংলাদেশের জন্য আসল উদ্বেগটা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিএসএফ, রাজ্য প্রশাসন এবং স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের মধ্যে সীমান্ত ও নাগরিকত্ব প্রশ্নে দূরত্ব কমে যাবে। ফলে ‘অনুপ্রবেশকারী শনাক্তকরণ’ অভিযান রাজনৈতিকভাবে আরও উৎসাহ পেতে পারে।
আসাম: পুশব্যাকের মডেল
আসাম বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্ক সংকেত। কারণ আসামে পুশব্যাক নিয়ে ভাষা সবচেয়ে সরাসরি। সেখানে এনআরসির দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বাংলাভাষী মুসলমানকে ‘মিয়া’, ‘বহিরাগত’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দেখার রাজনৈতিক প্রবণতাও পুরোনো। এখন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা নিজেই প্রকাশ্যে পুশব্যাক নিয়ে কথা বলছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মে মাসে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের পরিচয় ৩০ দিনের মধ্যে যাচাই করতে বলে। যাচাইয়ের পর তাদের বহিষ্কারের কথা বলা হয়। রাজ্যগুলোকে জেলা পর্যায়ে বিশেষ টাস্কফোর্স ও হোল্ডিং সেন্টার গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পুশব্যাক আনুষ্ঠানিক বহিষ্কার প্রক্রিয়া থেকে আলাদা। অর্থাৎ আদালত, দূতাবাস, নাগরিকত্ব যাচাই, ট্রাভেল পারমিট, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের গ্রহণ– এসব প্রক্রিয়া না মেনেই মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য আরও স্পষ্টভাবে এসেছে। তিনি বলেছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া কঠিন। তাই রাতের বেলায় সুবিধাজনক জায়গা দিয়ে মানুষকে ‘প্রাকটিক্যালি পুশ’ করা হয়। তিনি নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছিলেন, ‘২০ জন অবৈধ বাংলাদেশিকে গতরাতে পুশব্যাক করা হয়েছে।’ এ বক্তব্যের পর বাংলাদেশ ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে প্রতিবাদ জানায়।
এখানে সমস্যা শুধু একটা বক্তব্য না। সমস্যা হলো, আসামে পুশব্যাক এখন এক ধরনের রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হচ্ছে। একজন মুখ্যমন্ত্রী নিজে যখন বলেন, ‘আমরা মানুষকে পুশব্যাক করছি’, তখন মাঠ প্রশাসনও সেই ভাষা থেকে রাজনৈতিক অনুমতি পেয়ে যায়। ফলে আইনি যাচাই আর সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার মধ্যে ব্যবধান কমে যায়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ২০২৫ সালের মে থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বহু জাতিগত বাঙালি মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে, যাদের অনেকেই ভারতীয় নাগরিক হতে পারেন। তাদের মতে, এতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মানা হচ্ছে না। এই আসাম মডেল যদি পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরায় বিস্তৃত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা হবে। কারণ তখন পুশইন বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকবে না। এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনার এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত হবে।
ত্রিপুরা: সীমান্ত, রোহিঙ্গা ও জনমিতি
ত্রিপুরা বাংলাদেশের সঙ্গে ৮৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত ব্যবহার করে। এই রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায়। ত্রিপুরার রাজনৈতিক বাস্তবতা আবার আলাদা। এখানে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়; আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জনমিতিগত উদ্বেগও বড় বিষয়। ত্রিপুরার ইতিহাসে বহিরাগত বসতি, অভিবাসন, ভাষা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আছে। সেই জায়গা থেকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ভাষ্য খুব সহজে রাজনৈতিক শক্তি পায়। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা বলেছেন, বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা কেউ অবৈধভাবে ত্রিপুরায় ঢুকলে তাদের আইন অনুযায়ী পুশব্যাক করা হবে। ইন্ডিয়া টুডে নর্থইস্ট এবং ইকোনমিক টাইমস এ বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি দ্বিমুখী। একদিকে ত্রিপুরা সীমান্তে বাস্তব নিরাপত্তা সমস্যা আছে। মাদক, মানব পাচার, চোরাচালান, রোহিঙ্গা চলাচল– এসব প্রশ্ন পুরোপুরি অস্বীকার করা যাবে না। অন্যদিকে ‘বাংলাদেশি’ এবং ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ দুটো একসঙ্গে ব্যবহার করলে প্রশাসনিক শর্টকাট তৈরি হয়। রোহিঙ্গা যদি ভারতের ভেতরে থাকে, তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশের অবস্থানও এখানে পরিষ্কার হওয়া দরকার। যাচাই করা বাংলাদেশি নাগরিককে বাংলাদেশ নিতে পারে। কিন্তু রোহিঙ্গা, ভারতীয় নাগরিক বা অনির্ধারিত পরিচয়ের কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া যাবে না। দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে বলেছে, বাংলাদেশ শুধু যথাযথ যাচাইয়ের পর বাংলাদেশি নাগরিকদের গ্রহণ করবে; রোহিঙ্গা বা অন্য দেশের নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
মেঘালয়: কম নাটক, বাড়তি চাপ
মেঘালয় সরাসরি বিজেপি শাসিত নয়। সেখানে বিজেপি ক্ষমতাসীন জোটের অংশ, কিন্তু সরকার আঞ্চলিক নেতৃত্বাধীন। তবে মেঘালয়েও অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত নিরাপত্তার ভাষ্য শক্তিশালী হচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মেঘালয়ের উপমুখ্যমন্ত্রী প্রেস্টন টিনসং বিধানসভায় বলেছেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬৫৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক শনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৪ জনকে সাজা শেষ হওয়ার পর এবং বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ট্রাভেল পারমিট পাওয়ার পর বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি জেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্স, চেকপোস্ট এবং বিশেষ দল গঠনের কথাও বলেছেন। এই মডেল যদি সত্যিই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে, তাহলে সমস্যা তুলনামূলক কম। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাপ, স্থানীয় অনুপ্রবেশ-ভীতি এবং বিজেপির সীমান্ত রাজনীতি যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে মেঘালয়েও দ্রুত শনাক্তকরণ অভিযান বাড়তে পারে। তখন আবার একই ঝুঁকি তৈরি হবে। দরিদ্র, নথিহীন, শ্রমজীবী বা বাংলাভাষী মানুষ সহজে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন। 
পুশইন এখন শুধু আশঙ্কা নয়
বাংলাদেশের উদ্বেগ কল্পিত না। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে বিজিবি মহাপরিচালক বলেছেন, ২০২৫ সালের ৭ ও ৮ মে রাতে ২০২ জনকে বিভিন্ন নির্জন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কারও কারও আধার কার্ড ছিল, কিন্তু ভারতীয় পুলিশ ও সীমান্ত বাহিনী তা নিয়ে নেয় বলে বিজিবি অভিযোগ করেছে। একই ঘটনার মধ্যে রোহিঙ্গাও ছিল। প্রথম আলো পত্রিকা আরও বড় ছবি দিয়েছে। তাদের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ৩২ জেলার সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে দুই হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিজিবি তাদের মধ্যে ১২০ জনকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছে। এমনকি উড়িষ্যার একটি হিন্দিভাষী পরিবারকেও ‘বাংলাদেশি’ বলে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ এসেছে, যাদের আধার ও রেশন কার্ড ছিল বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে।
এই তথ্যগুলো দেখায়, সমস্যা শুধু ‘ভারত অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাচ্ছে’– এত সরল নয়। আসল সমস্যা হলো, নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ছে। যখন রাজনৈতিকভাবে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বানানো সহজ হয়ে যায়, তখন ভারতীয় নাগরিক, দীর্ঘদিনের অভিবাসী, রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি শ্রমিক, নারী, শিশু– সবাই এক প্রশাসনিক বাক্সে ঢুকে যায়। তখন সীমান্ত নিরাপত্তা মানবিক সংকটে পরিণত হয়।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমস্যা বাড়বে
প্রথম সমস্যা হবে তাৎক্ষণিক মানবিক ও প্রশাসনিক চাপ। রাতের অন্ধকারে, নদী বা চর এলাকা, বনাঞ্চল বা নির্জন পয়েন্টে মানুষ ঢুকিয়ে দিলে বিজিবি, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা ও জনপ্রতিনিধিদের ওপর একসঙ্গে চাপ পড়ে। কে বাংলাদেশি, কে ভারতীয়, কে রোহিঙ্গা, কে শিশু, কে অসুস্থ, কে নির্যাতনের শিকার– এগুলো যাচাই করতে সময় লাগে। কিন্তু সীমান্তে সেই সময় থাকে না।
দ্বিতীয় সমস্যা হবে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের সংকট। বাংলাদেশি নাগরিক হলে বাংলাদেশ তাকে নেবে– এই জায়গায় দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাকে বাংলাদেশি বলা হবে? ভাষা দিয়ে? ধর্ম দিয়ে? দারিদ্র্য দিয়ে? বাংলায় কথা বললেই কি সে বাংলাদেশি? মুসলমান হলেই কি সে বাংলাদেশি? এই প্রশ্নগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যদি একতরফা মানুষ পাঠায়, তাহলে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলক গ্রহণকারী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়।
তৃতীয় সমস্যা হবে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বহু বছর ধরে নানা ধরনের সমঝোতা, পতাকা বৈঠক, ডিজি পর্যায়ের বৈঠক, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা আছে। কিন্তু পুশইন এই কাঠামোগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায়। এটা বলে, আমরা আমাদের দিক থেকে যাকে অবৈধ মনে করছি, তাকে তোমাদের দিকে ঠেলে দিলাম। এখন তোমরা সামলাও। এই মানসিকতা কোনোভাবেই প্রতিবেশীসুলভ আচরণ নয়।
চতুর্থ সমস্যা হবে সীমান্তে উত্তেজনা। বিজিবি যদি কাউকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে ফেরত পাঠাতে চায়; পক্ষান্তরে বিএসএফ তাকে নিতে অস্বীকার করে, তাহলে সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের সংখ্যা বাড়বে। এরা কোনো রাষ্ট্রেরই পূর্ণ সুরক্ষা পাবে না। একই সঙ্গে দুই বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা, পতাকা বৈঠক, স্থানীয় ক্ষোভ এবং মিডিয়া-চালিত জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে।
পঞ্চম সমস্যা হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ভারতে বিজেপির ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ভাষ্য যেমন নির্বাচনী; বাংলাদেশেও পুশইন-বিরোধী জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে।
বিরোধী দল, ইসলামপন্থি দল, ভারতবিরোধী গোষ্ঠী এবং সামাজিক মাধ্যমের অ্যাক্টিভিস্টরা এটিকে সার্বভৌমত্বের সংকট হিসেবে ব্যবহার করবে। কিছু ক্ষেত্রে তা যথার্থও হবে। কিন্তু অতিরিক্ত আবেগি প্রতিক্রিয়া সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর উত্থান মানেই আগামীকাল সীমান্তে বড় যুদ্ধ বা শরণার্থীর ঢল নামবে– এমন সরল কথা বলা ঠিক হবে না। রাজনীতি এত সোজা না। কিন্তু এটাও সত্য, এই পরিবর্তন সীমান্ত রাজনীতির চরিত্র বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্ন– শুধু ‘কতজন ঢুকল’ না। প্রশ্নটা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নিয়ম কে ঠিক করবে? দুই দেশের আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, নাকি ভারতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী রাজনীতি?
আসিফ বিন আলী: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
[email protected]
- বিষয় :
- বাংলাদেশ
