সমকালীন প্রসঙ্গ
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় করণীয়
আশফাক আনুপ
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪২
যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিয়ে সম্প্রতি একটি নিবন্ধ লিখতে গিয়ে আমাদের চেনা বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে ভেঙে পড়ছে, তা গভীরভাবে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ‘ওয়েস্টফালিয়া চুক্তি’র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌমত্বের আধুনিক ধারণাটি মূলত একটি মূল্যবোধভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সূচনা ঘটিয়েছিল।
আজ সেই ব্যবস্থা নতুন করে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। একটি উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে এখানে যুক্তরাজ্যে– যদি আমরা কট্টর ডানপন্থি রিফর্ম পার্টির অভূতপূর্ব উত্থানকে বাদও দিই, আমরা দেখেছি সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি, এমপির মতো উদারপন্থি ব্যক্তিত্বদের ‘প্রগ্রেসিভ রিয়ালিজম’ বা ‘প্রগতিশীল বাস্তববাদ’-এর তত্ত্বকে সামনে নিয়ে আসতে। এ কাঠামোটি মানবাধিকার, জলবায়ু পদক্ষেপ এবং সমতার মতো প্রগতিশীল ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করে; তবে একই সঙ্গে তাঁর নিজের ভাষায়, ‘বিশ্বটা যেভাবে চলছে সেভাবে’ই একে মেনে নেয়; ‘আমরা যেভাবে দেখতে চাই, সেভাবে নয়।’
আন্তর্জাতিকভাবে আমরা কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির মতো নেতাদের দেখছি, যিনি সম্প্রতি ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে তাঁর বক্তব্যের জন্য প্রশংসিত। তিনিও এই ক্রমশ খণ্ডিত হতে থাকা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ‘মধ্যম শক্তি’র (মিডল পাওয়ার) দেশগুলোর টিকে থাকার স্বার্থে একটি অনুরূপ, বাস্তবসম্মত ও মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন।
গ্লোবাল নর্থ বা উন্নত বিশ্ব এখন বুঝতে পারছে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে তাদের নিজের দিকে তাকাতে হবে এবং জাতি-রাষ্ট্রের (ন্যাশন-স্টেট) সুনির্দিষ্ট, সুরক্ষিত কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সভ্যতার ফাঁদ
কিন্তু গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্ব, বিশেষভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে তাকালে আমরা ঠিক এর বিপরীত প্রবণতা দেখতে পাই।
দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বিশেষত তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও নাহিদ ইসলামের মুখ থেকে একটি অদ্ভুত বয়ান বা ন্যারেটিভ উঠে আসতে দেখেছিলাম। তারা ঐতিহ্যগত, ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদকে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ বা ‘অপ্রচলিত’ বলে বর্জন করতে শুরু করেন। এর পরিবর্তে তারা ‘সভ্যতা রাষ্ট্র’ (সিভিলাইজেশনাল স্টেট) নামক কিছু একটা গড়ে তুলতে চাচ্ছিলেন। প্রথমে তারা ‘বেঙ্গল বেজড সিভিলাইজেশনাল কনফ্লুয়েন্স’ (বাংলাভিত্তিক সভ্যতার মোহনা)-এর কথা বলেন। এরপর তারা ‘ইন্দো-মুসলিম সভ্যতা’র দাবি তুলতে শুরু করেন। এই কাঠামোটি আদতে কিছুটা বিশ্বায়িত শব্দভান্ডারের আড়ালে পুরোনো ‘দ্বি-জাতিতত্ত্ব’কেই পুনরুজ্জীবিত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সমকালেই আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম।
আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, সভ্যতাগত বয়ান কেবলই কোনো দর্শন নয়; এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার। আমি ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে একটি বিমূর্ত পরিচয়ের সঙ্গে বিনিময় করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলাম। এমনটা করা বাংলাদেশকে সরাসরি স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস’ বা ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর দিকে ঠেলে দেয়। এটি আমাদের মতো একটি অরক্ষিত রাষ্ট্রকে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার ক্ষেত্র হিসেবে প্রস্তুত করে।
আজ আমরা তীব্র অভ্যন্তরীণ মেরূকরণ দেখতে পাচ্ছি। আমাদের সাংবিধানিক ভিত্তি এবং ভৌগোলিক স্বার্থগুলোকে এক পাশে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিমূর্ত ‘সর্ব-জাতীয়’ (প্যান-ন্যাশনাল) এবং ‘সর্ব-ইসলামী’ (প্যান-ইসলামিক) অক্ষের মোহে আমরা আমাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সীমান্তগুলোকে উপেক্ষা করেছি।
আর এটাই আমাদের বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির এক মর্মান্তিক প্যারাডক্স বা বৈপরীত্যকে সামনে নিয়ে আসে: ক্ষমতাশালীরা নিজ রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত করতে অভ্যন্তরমুখী হচ্ছে, আর দুর্বলদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে বা বাধ্য করা হচ্ছে তাদের রাষ্ট্রকে আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে বিলীন করে দিতে।
এই অসমতা অত্যন্ত প্রকট। যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল নর্থ নানা নামে জাতীয়তাবাদকে পুনরুজ্জীবিত করছে। তারা তাদের প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) এবং সীমান্ত রক্ষা করতে চায়। তারা জানে, জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে হলে রাষ্ট্রের একটি সুদৃঢ় গঠন থাকা আবশ্যক। অথচ বাংলাদেশ করছে ঠিক তার উল্টোটা। আমরা আমাদের পরিচয়কে বিমূর্ত, প্যান-ন্যাশনাল ও প্যান-রিলিজিয়াস ছাঁচে বিস্তৃত করছি। এটি আমাদের আইনি ও ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক রক্ষণব্যূহকে কেড়ে নিচ্ছে এবং একটি ছোট রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াইয়ের সামনে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে ফেলছে।
আমরা জানি, কোনো সভ্যতাগত শূন্যতার মধ্যে মানবাধিকার বেঁচে থাকতে পারে না। কোনো সীমান্তহীন আদর্শিক মেঘের মধ্যে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি টিকে থাকতে পারে না। সর্বজনীন অধিকারের জন্য একটি স্থিতিশীল, আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রয়োজন। অন্যদিকে, একটি ‘সভ্যতা রাষ্ট্র’ মূলত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে। সভ্যতায় কোনো ভোটার থাকে না; জাতিতে থাকে। সভ্যতার কোনো সংবিধান থাকে না; জাতির থাকে। সভ্যতা চলে বাগাড়ম্বর বা বয়ানের ওপর ভর করে; আর জাতি চলে নাগরিক ও নাগরিক আইনের ওপর। তাই বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে একটি ইতিহাসসম্মত, ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে– আমাদের ভৌগোলিকতা আমাদের সীমাবদ্ধতা নয়; এটিই আমাদের একমাত্র ঢাল এবং সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
স্মৃতির সংঘাত
বিশ্বের অন্য যে কোনো জাতি-রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমি হয়তো এটুকু বলেই আমার বক্তব্য বেশ স্পষ্টতার সঙ্গে শেষ করতে পারতাম। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, উল্টো এখানে এসেই পরিস্থিতি আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এটি স্পষ্ট, জাতীয়তাবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে এর একটি অদ্ভুত অথচ অনিবার্য সম্পূরক প্রশ্ন আসবে: ‘কোন জাতীয়তাবাদ?’
বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত চিন্তাভাবনা করে, গণতান্ত্রিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিকভাবে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে এই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ও নাগরিক পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আমরা ছিলাম জাতিতে বাঙালি এবং নাগরিকত্বে বাঙালি। আমাদের পরিচয় নির্ধারিত হয়েছিল আমাদের যৌথ ইতিহাস ও ভূগোলের মাধ্যমে। ঠিক যেমন নেদারল্যান্ডসে ডাচ, আয়ারল্যান্ডে আইরিশ, পোল্যান্ডে পোলিশ, ফিনল্যান্ডে ফিনিশ, ডয়েচল্যান্ডে (জার্মানিতে) ডয়েচ (জার্মান) কিংবা থাইল্যান্ডে থাইরা সংজ্ঞায়িত হন।
তবে, ১৯৭৫ সালে তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের সামনে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর এক প্রতিতত্ত্ব নিয়ে আসা হয়: কঠোর সীমান্তনির্ভর ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমরা– এই ভূখণ্ডের নাগরিকরা–হঠাৎ করেই ‘বাঙালি’ থেকে ‘বাংলাদেশি’ হয়ে গেলাম।
একবার ভাবুন, কোনো এক সুন্দর সকালে যদি আইরিশদের ‘আইরল্যান্ডিশ’, থাইদের ‘থাইল্যান্ডিশ’ কিংবা ডাচদের ‘নেদারল্যান্ডিশ’ বানিয়ে দেওয়া হয়, তবে কেমন হবে? এটি কেবল কোনো শব্দগত বিষয় নয়। এটি আসলে পরিচয়ের এক বি-ইতিহাসিকীকরণ (ডিহিস্টোরিসাইজেশন)। এই একটি আঁচড়ে একটি ভূখণ্ডের অধিবাসীদের সম্মিলিত স্মৃতিকে মুছে ফেলা হয়। আর আমরা তো জানিই; মিলান কুন্ডেরা আমাদের সতর্ক করেছিলেন–‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম আসলে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’
চলমান এই উত্তাল ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে, শুনতে অনেকটা ধর্মনিরপেক্ষ মনে হলেও ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়টি বরং শেষমেশ দ্বি-জাতিতত্ত্ব এবং সভ্যতার সংঘাতের মধ্যখানে ভণিতারত এক মেজোভাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও, ভাষাগত কিছু সংশোধন সত্ত্বেও, আমাদের সমস্ত আইনি পরিচয়পত্রে তা রয়ে গিয়েছিল।
আজ ২০২৪-পরবর্তী নানা চড়াই-উতরাই এবং জনগণের সীমাহীন দুর্ভোগের পর বাংলাদেশ মনে হচ্ছে এক ঐতিহাসিক মোড়-এ দাঁড়িয়ে আছে। এখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ বিস্মৃতির বিরুদ্ধে আমাদের স্মৃতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পথে হাঁটতে পারবে?
ড. আশফাক আনুপ: এফিলিয়েট একাডেমিক, কিংস কলেজ লন্ডন; পরিচালক, বাঙালিত্ব গবেষণা উদ্যোগ
- বিষয় :
- সার্বভৌমত্ব