ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সীমান্তসুরক্ষা

রায়মঙ্গলের স্রোতে ভাসমান শূন্যরেখা

রায়মঙ্গলের স্রোতে ভাসমান শূন্যরেখা
×

সাঈফ ইবনে রফিক

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৯

সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল। স্রোতে ভাসমান শূন্যরেখা। ঘন জঙ্গল আর বিস্তীর্ণ জলরাশি।

নদীর ঠিক কোথায় বাংলাদেশ শেষ; কোথা থেকে ভারত শুরু– খালি চোখে বোঝার উপায় নেই। কাঁটাতার নেই; বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝখানে সীমান্ত পিলার বসানোরও সুযোগ নেই। আছে শুধু মানচিত্রে টানা অদৃশ্য রেখা। এক পাশে বাংলাদেশের সুন্দরবন, অন্য পাশে ভারত।

রায়মঙ্গল সীমান্ত নদী হওয়ার অনেক আগে থেকেই সাহিত্যের নদী, লোকবিশ্বাসের নদী, মানুষের জীবিকার নদী। 

মধ্যযুগীয় বাংলা আখ্যানকাব্য কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল’ রচিত হয়েছে বাঘের অধিপতি, অরণ্যের প্রতাপ ও অনিশ্চিত শক্তির লোকায়ত প্রতিরূপ দক্ষিণ রায় ঘিরে। এর পেছনে আছে এমন এক জনপদের স্মৃতি, যেখানে মানুষের জীবন প্রকৃতির করুণার ওপর নির্ভরশীল। সেই মানুষের উত্তরসূরি সুন্দরবনের মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে, যাদের কাছে বন একই সঙ্গে জীবিকা ও বিপদ। বনে ঢোকা মানেই ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছিল না।

এই অনিশ্চয়তা থেকেই জন্ম বনবিবির আখ্যান– শাহ জঙ্গলি, দক্ষিণ রায়, ধোনা আর অসহায় বালক দুখে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকঐতিহ্য, যেখানে মানুষের লোভের বিপরীতে বনবিবি হয়ে ওঠেন আশ্রয়ের প্রতীক। বনে প্রবেশের আগে তাঁর কাছে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের প্রার্থনা শুধু ধর্মীয় আচার নয়; প্রতিকূল প্রকৃতির সামনে মানুষের অসহায়তারও স্বীকৃতি। সম্ভবত এখানেই সুন্দরবনের সবচেয়ে পুরোনো দর্শন লুকিয়ে: এই বন মানুষ কখনও জয় করেনি, তার সঙ্গে বোঝাপড়া করে টিকে থেকেছে।

তারপর সময় বদলেছে। রায়মঙ্গলের বুক দিয়ে এসেছে স্টিমার। ব্রিটিশ আমলে এই নদীপথে কলকাতা থেকে বরিশাল হয়ে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন বন্দরে স্টিমার চলত। ১৯৪৬ সালে কবি জীবনানন্দ দাশ শেষবারের মতো বরিশাল থেকে কলকাতা গিয়েছিলেন রায়মঙ্গল নদীপথেই।

একসময় যে জলপথ দুই বাংলার মানুষকে যুক্ত করত; ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের পর তারই একটি অংশ হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক সীমান্ত। কিন্তু নদী র‍্যাডক্লিফ বোঝে না– জোয়ার-ভাটা আসে দুই পারে; বাঘ সীমান্ত চেনে না; পাখি ওড়ে পাসপোর্ট ছাড়াই। কেবল মানুষ জানে, মাঝনদীর কোথাও একটি অদৃশ্য রেখা আছে।

স্থলসীমান্তে পিলার-কাঁটাতার দেখা যায়। এখানে সামনে শুধু পানি, পেছনে গহিন অরণ্যের পর অরণ্য। জোয়ারে যে জায়গা পানি, ভাটায় সেখানে কাদা। প্রকৃতি প্রতিদিন নিজের মানচিত্র বদলায়; রাষ্ট্রের মানচিত্র বদলায় না। তাই এই ভূগোলে সীমান্ত পাহারার ধরনও আলাদা হতে হয়েছে।

রায়মঙ্গল ও বয়েসিং খালের মোহনায় ভাসছে বয়েসিং ভাসমান বিওপি। যাত্রা শুরু ২০২৫ সালের ১৭ মে। সুন্দরবনে এটি বিজিবির তৃতীয় ভাসমান বিওপি। বাংলাদেশের প্রায় ১৮০ কিলোমিটার নদী সীমান্তের মধ্যে ৭৯ কিলোমিটার সুন্দরবন এলাকায়। সেই দুর্গম সীমান্তে বয়েসিং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম, যেখান থেকে চলে জলপথে টহল ও নজরদারি– চোরাচালান, মানব পাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ, ডাকাতি ও বনজ সম্পদ লুট প্রতিরোধ এর দায়িত্বের অংশ।

কাগজে এটুকুই বয়েসিংয়ের পরিচয়। কিন্তু একটি ভাসমান বিওপিকে শুধু অপারেশনাল সক্ষমতা দিয়ে বোঝা যায় না। পরিবার থেকে দূরে। লোকালয় থেকে দূরে। গহিন অরণ্যে কিছু মানুষ সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে অটল। এই বিচ্ছিন্ন যাপনে প্রত্যেক সৈনিক কি একা?

বয়েসিংয়ের ডেকে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় সৈনিক আকাশের গল্পে। আকাশের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। জীবনের যে সময়ে একজন স্বামীর সবচেয়ে বেশি করে স্ত্রীর পাশে থাকার কথা, সেই সময় আকাশ বহু দূরে, রায়মঙ্গলের মোহনায় দায়িত্বে। ফোনের ওপাশে একটি পরিবার অপেক্ষা করছে; এ পাশে সীমান্ত।

দক্ষিণ রায়ের অরণ্যে একদিন মৌয়াল, বাওয়ালিরাও ঘর ছেড়ে আসতেন জীবিকার প্রয়োজনে। পেছনে অপেক্ষা করত পরিবার। কয়েক শতাব্দী পর একই অরণ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আকাশ। একদিন মৌয়াল, বাওয়ালিরা আসতেন পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে; আজ আকাশ এসেছেন অসংখ্য পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে। প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে থাকা তাঁর পেশার অলিখিত মূল্য।
আকাশ একা নন। বয়েসিংয়ে কারও সন্তান অপেক্ষা করছে; কারও বৃদ্ধ মা-বাবা; কারও স্ত্রী। দিনের পর দিন একই ডেকে থাকা; একই নৌকায় টহলে যাওয়া; একই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া এবং প্রয়োজনে একজনের ওপর আরেকজনের জীবন নির্ভর করা সম্পর্কের ভিন্ন সংজ্ঞা তৈরি করে।

পেশাদারিত্ব, পারস্পরিক বোঝাপড়া আর নির্ভরতায় সহযোদ্ধারাই হয়ে ওঠেন আরেকটি পরিবার। অনেকটা সেই পুরোনো মৌয়াল, বাওয়ালিদের মতো, যারা বিপৎসংকুল অরণ্যে একা প্রবেশ করতেন না, শুধু তফাত সময় আর উদ্দেশ্যের। আজকের সীমান্তরক্ষীর নিরাপত্তা মিথ থেকে আসে না। আসে প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি ও সুসংগঠিত কমান্ড কাঠামো থেকে। তবু সুন্দরবনের প্রাচীন সত্য অপরিবর্তিত: এখানে মানুষ একা টিকে থাকে না।

আর এখানেই দক্ষিণ রায়ের পুরোনো প্রতীক নতুন অর্থ পায়। লোককথার দক্ষিণ রায় ছিলেন অরণ্যের প্রতাপ ও কর্তৃত্বের প্রতিরূপ। আজ রায়মঙ্গলের এই প্রান্তে বয়েসিংয়ের প্রত্যেক সৈনিকের কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের দেওয়া; দায়িত্ব সীমান্তের। এই দুর্গম জল-জঙ্গলে তাদের উপস্থিতিই ঘোষণা করে– বাংলাদেশের শেষ প্রান্তটুকুও অরক্ষিত নয়।

একসময় এই অরণ্যে ছিল দক্ষিণ রায়ের প্রতাপ, বনবিবির আশ্রয়, মৌয়াল, বাওয়ালির জীবনসংগ্রাম। তারপর এসেছে ঔপনিবেশিক স্টিমার, দেশভাগ, র‍্যাডক্লিফের রেখা। এখন সেই স্রোতে ভাসমান শূন্যরেখা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন আকাশরা।

জোয়ার আসে। ভাটা যায়। স্রোত বদলায়। সময় বদলায়। চরিত্র বদলায়। দায়িত্ব বদলায় না। বয়েসিং ভাসমান বিওপি। গহিন সুন্দরবনের বুকে ভেসে থাকা এক টুকরো বাংলাদেশ।

সাঈফ ইবনে রফিক: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×