ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

প্রথম নারী মহাসচিবের অপেক্ষায় জাতিসংঘ

প্রথম নারী মহাসচিবের অপেক্ষায় জাতিসংঘ
×

বদরুল হাসান

বদরুল হাসান

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৪৩

জাতিসংঘের আট দশকের ইতিহাসে ৯ জন মহাসচিব পাওয়া গেছে, যাদের প্রত্যেকেই পুরুষ। এবার কি ৮০০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী জাতিসংঘ একজন নারী মহাসচিব পেতে যাচ্ছে? আগামী ৩১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হচ্ছে। উত্তরসূরি বাছাইয়ের দৌড়ে এবার আটজন আনুষ্ঠানিক প্রার্থীর পাঁচজনই নারী এবং নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ ভোটে শীর্ষ তিনের দুজনই নারী। গত ৩০ জুলাই ও ২১ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে পরপর দুই দফা অনানুষ্ঠানিক গোপন ভোট (স্ট্র পোল) হয়ে গেছে। 

ওপরের প্রশ্নের উত্তরটি নির্ভর করছে এমন এক প্রক্রিয়ার ওপর, যার আসল অংশটুকু বিশ্ববাসী কখনও দেখতে পায় না। জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ মহাসচিব নিয়োগ দেবে। এর বাইরে আর কোনো ব্যাখ্যা সেখানে নেই। এই অস্পষ্টতার সুযোগে পাঁচ স্থায়ী সদস্য চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এদের যে কোনো একটি দেশ প্রকাশ্য কারণ না দেখিয়েই এক ভেটোতে যে কোনো নাম বাতিল করে দিতে পারে।

স্বচ্ছতার চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। ২০১৫ সালের সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এবারের প্রক্রিয়া চলছে সাধারণ পরিষদের ৭৯/৩২৭ নম্বর প্রস্তাবের আলোকে। প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত, রূপকল্প, এমনকি প্রচারণার অর্থায়নের তথ্যও প্রকাশ করতে হয়েছে। গত ২৩ জুলাই সাধারণ পরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত টাউন হলে প্রার্থীরা সদস্য রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ জাতিসংঘের আর্থিক সংকট এবং নেতৃত্বে লিঙ্গসমতা নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু এসব সংস্কার বাহ্যিক স্বচ্ছতা এনেছে মাত্র; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জায়গাটি অক্ষতই রয়ে গেছে।

আসল লড়াই চলে পর্দার আড়ালে; অনানুষ্ঠানিক গোপন ভোটে। পরিষদের ১৫ সদস্য প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য আলাদা ব্যালটে তাঁকে ‘উৎসাহিত’, ‘নিরুৎসাহিত’ বা ‘কোনো মতামত নেই’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। মজার বিষয় হলো, অধিবেশনের সভাপতি আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশ করেন না, তবু তা ফাঁস হয়ে যায়!

প্রথম দফায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার মহাসচিব কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান ১০টি উৎসাহিত ও মাত্র একটি নিরুৎসাহিত ভোট নিয়ে স্পষ্ট এগিয়ে ছিলেন। তিন সপ্তাহেই ছবিটা বদলে যায়। ২১ আগস্টের ভোটে গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি কারোলিন রদ্রিগেজ-বার্কেট ৮টি উৎসাহিত ভোট নিয়ে শীর্ষে ওঠেন। গ্রিনস্প্যান নেমে আসেন ৭-এ এবং তাঁর বিপক্ষে নিরুৎসাহিত ভোট এক থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪-এ। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসিও ৭টি উৎসাহিত ভোট পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর বিপক্ষে নিরুৎসাহিত ভোট ছয়টি, যা যে কোনো প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল ছয়, উগান্ডার ওলারা ওতুনু পাঁচ, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা চার, চিলির মিশেল ব্যাচেলেট দুই এবং ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকি একটিও উৎসাহিত ভোট পাননি।

সংখ্যাগুলোর পাঠোদ্ধার জরুরি। সুপারিশ পেতে হলে দরকার অন্তত ৯টি সমর্থন, সঙ্গে কোনো স্থায়ী সদস্যের ভেটো না থাকা। এখনও কেউই ৯-এর ঘরে পৌঁছাননি। এখানে ‘উৎসাহিত’ ভোটের চেয়ে ‘নিরুৎসাহিত’ ভোটই বেশি অর্থবহ। কারণ সেগুলোর একটিও যদি ভেটো ক্ষমতাধর কারও হয়, প্রার্থিতা সেখানেই শেষ। পরের ধাপে পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে ভিন্ন রঙের ব্যালট দেওয়া হবে; তখনই ভেটোর ছায়া দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। নিরাপত্তা পরিষদ ১ অক্টোবরের মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও কয়েকটি অলিখিত নিয়ম প্রতিযোগিতাকে আকার দিচ্ছে। আঞ্চলিক আবর্তনের হিসাবে এ পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপ থেকে চারজন, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে দুজন করে এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মাত্র একজন মহাসচিব এসেছেন। সেই যুক্তিতেই ম্যাকি সাল আফ্রিকার দাবি জোরালো করছেন। দ্বিতীয় নিয়মটি জাতীয়তার। পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের কোনো নাগরিক কখনও মহাসচিব হন না। কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অলিখিত নিয়মটি লিঙ্গের। আট দশক ধরে জাতিসংঘ বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে এসেছে। অথচ নিজের শীর্ষ পদে কখনও কোনো নারীকে বসায়নি। 

২০১৬ সালেও বেশ কজন নারী লড়েছিলেন। এবার তো তালিকার সংখ্যাগরিষ্ঠই নারী।

এদের পেছনে রয়েছে নাগরিক সমাজের সংগঠিত চাপ। ‘১ ফর ৮ বিলিয়ন’ নামের বৈশ্বিক প্রচারাভিযানটি বছরের পর বছর দাবি জানিয়ে আসছে, প্রথম নারী মহাসচিব নিয়োগ যেন একটি ন্যায্য, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় হয়– পর্দার আড়ালের সমঝোতায় নয়। স্ট্র পোলের ফল ফাঁস হয়ে প্রকাশ্যে চলে আসা এবং প্রতিটি ধাপ নিয়ে খোলা আলোচনা, দুটোই এই চাপের ফল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোকে তিনি পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে দেখতে চান। অথচ ইনফান্তিনোকে কোনো সদস্য রাষ্ট্র মনোনয়ন দেয়নি; আনুষ্ঠানিক তালিকায় তাঁর নাম নেই। কোনো পরাশক্তি কারও নাম বললেই তিনি মহাসচিব হয়ে যাবেন না। কিন্তু পরাশক্তির আপত্তি কাউকে সেই চেয়ার থেকে সরিয়ে দিতে পারে। বুট্রোস বুট্রোস  ঘালি নিরাপত্তা পরিষদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের একক বিরোধিতায় দ্বিতীয় মেয়াদ পাননি। দ্বিতীয় মেয়াদ না পাওয়ার বঞ্চনার শিকার একমাত্র মহাসচিব তিনিই। রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাউকে শীর্ষে না বসানোর ব্যাপারে পাঁচ পরাশক্তি বরাবরই একমত। এই দৈবচয়নে ইসরায়েলের প্রভাবও উপেক্ষণীয় নয়। 

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যতম প্রধান শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে শান্তিরক্ষা মিশনের নীতি ও কাঠামোগত স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঢাকার স্বার্থ সরাসরি যুক্ত। ফিলিস্তিন সংকট ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো জটিল প্রশ্নে পরাশক্তির ভেটো আর জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকার অভাবও ঢাকার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই ঢাকার প্রত্যাশা কেবল একজন নারী মহাসচিব হতে পারে না, বরং এমন একজন যিনি জলবায়ু তহবিল, শরণার্থী সংকট ও বাণিজ্য বৈষম্য নিয়ে সাহসের সঙ্গে কথা বলবেন।

দুই দফার ভোট শেষে দৌড় এখনও অমীমাংসিত। টাউন হলের বক্তৃতা, রূপকল্পের দলিল কিংবা কোনো পরাশক্তির নেতার প্রশংসা, কোনোটিই সেখানে শেষ কথা নয়; এমনকি স্ট্র পোলের শীর্ষস্থানও নয়। শেষ কথা বলবে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের নীরব সমঝোতা। দেখার বিষয় কেবল দুটি। প্রথমত, ৮১ বছরের পুরোনো কাচের দেয়ালটি ভেঙে কোনো নারী এবার শীর্ষ পদে আসতে পারেন কিনা। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তিনের দুজনই নারী। দ্বিতীয়ত, যিনিই আসুন, তিনি পরাশক্তির আস্থাভাজন হয়েও উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেন কিনা। সমালোচনা, সংকট ও জটিল বিশ্বরাজনীতির নিরিখে জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিকতার পরবর্তী পরীক্ষাটি সেখানেই।

বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতি বিশেষজ্ঞ
 [email protected] 

আরও পড়ুন

×