ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

রঞ্জন কর্মকার আমাদের স্বপ্নের সারথি ছিলেন

রঞ্জন কর্মকার আমাদের স্বপ্নের সারথি ছিলেন
×

রঞ্জন কর্মকার (১৯৫৮–২০২৬)

ফারহানা হাফিজ ও শশাঙ্ক সাদী

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩২

রঞ্জন কর্মকার; আমাদের কাছে ১৯৯৯ সাল থেকে যিনি রঞ্জন দা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এনজিও স্টেপস টুওয়ার্ড ডেভেলপমেন্ট আয়োজিত জেন্ডার-বিষয়ক এক ইন্টার্নশিপে অংশগ্রহণসূত্রে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তারপর পেশাগতভাবেই যুক্ত হয়ে যাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে।

বাংলাদেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জেন্ডার ভাবনার অন্তর্ভুক্তি বা উন্নয়নে নারী ভাবনাকে ভেঙে জেন্ডার ও উন্নয়ন ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অন্যতম রূপকার ছিলেন দাদা। গত শতাব্দীর শেষ থেকে স্টেপস নিয়মিত যে ‘উন্নয়ন পদক্ষেপ’ বের করত তা ছিল বাংলাদেশে অগ্রসর উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে অন্যতম সংকলন। স্টেপসের একটি পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরি ছিল, যেখানে পাওয়া যেত উন্নয়ন ভাবনা, রাজনৈতিক ইতিহাস, সমাজ দর্শন, প্রকল্প পরিকল্পনার সবচেয়ে নতুন প্রকাশনাগুলো। রঞ্জন দা তখনই আমাদের বুঝিয়েছিলেন– নতুন কিছু না পড়লে নতুন ভাবনা মাথায় আসবে কীভাবে। অডিও-ভিজুয়াল মাধ্যম ছাড়া যে ক্যাম্পেইন বা অ্যাডভোকেসি সফল হয় না, সেটা বুঝেই স্টেপস তৈরি করেছিল একটি পূর্ণাঙ্গ অডিও-ভিজুয়াল বিভাগ। এই বিভাগ থেকেই তৈরি হয়েছে বেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামালের আন্দোলন-সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকাসহ অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র। কন্যাশিশুর অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বা জেন্ডার সমতার ভাবনা শুধু শহুরে সমাজে সীমাবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশে পরিবর্তন আসবে না। সেটা বুঝে রঞ্জন দা আমাদের পাঠাতেন চর থেকে শুরু করে দূর-দুর্গমতম জায়গাগুলোতে। 

সংঘবদ্ধ না হলে সমতার লড়াই করা যাবে না। তাই রঞ্জন দা ও তাঁর আরেক সারথি রাকিব ভাই এবং পরবর্তী সময়ে রেখাদির নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশকে কাভার করার জন্য তৈরি হয়েছে স্থানীয় এনজিওগুলোর নেটওয়ার্ক। শুধু নেটওয়ার্ক তৈরি করা নয়; নেটওয়ার্কের সদস্য সংস্থাগুলোর সক্ষমতা তৈরি না হলে যে তারা ভালোভাবে কাজ করতে পারবে না, সেটাও স্পষ্ট করা হয়েছিল। তাই স্থানীয় এনজিওগুলোর শুধু জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ে ট্রেনিং নয়, তাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয় ফিন্যান্সিয়াল প্রশিক্ষণ, কর্মকৌশল তৈরির প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। যে লোকালাইজেশনের কথা এখন আমরা বারবার বলি, যা রঞ্জন দার মাথা থেকে অন্য শব্দে এসেছিল, সেটা আজ মেলাতে পারি। আর প্রশিক্ষণ ইউনিট ছিল দাদার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। কীভাবে সহজবোধ্য মডিউল তৈরি করতে হবে বা নব নব পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে, তা নিয়ে লুৎফর ভাইয়ের সঙ্গে চলত তার তুমুল আলোচনা ও যুক্তিতর্ক। নিজে তো খুব ভালো প্রশিক্ষণ সেশন নিতে পারতেনই! 

আমরা হয়তো কাজ করছি, প্রায় সাড়ে ৩ বা ৪টা বাজে, সে সময় দাদা এসে হাজির হতেন কখনও প্রশিক্ষণ বিভাগের রুমে, আবার কখনও প্রোগ্রামের রুমে। কথা শুরু করতেন একটা নতুন বিষয় নিয়ে বা মতামত জানতে চাইতেন কোনো ভাবনার ওপর। নিজে আগে কিছু বলতেন। তারপর শুধু শুনতেন, আমরা কে কী বলি, কীভাবে বিষয়টা নিই বা কীভাবে বুঝতে পারি। এভাবে প্রায়ই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত। আমরা উশখুশ করতাম বাড়ি যাওয়ার তাড়নায়। দাদা মৃদু হেসে বলতেন– আরে, যাবে তো বাসায়। আজকে একটু পরে যাও। আলোচনাটা শেষ করো। দাদা যেন রাজহাঁসের মতো অপরিপক্ব ঘোলা আলোচনার মধ্যে থেকে ছেঁকে নিতেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বা বিষয়! আর অবচেতন মনে গেঁথে দিতেন ভাবনাকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। 
প্রফেশনাল অগ্রগতি করতে গিয়ে স্টেপস ছেড়ে দিলেও দাদার সঙ্গে যোগাযোগ খুব একটা কমেনি। পরে কবিতা বউদির সঙ্গে সখ্য ও ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে অনেক। তবুও দাদার আদর কমেনি একফোঁটা। বউদির ডাকে বাসায় খেতে গেলে দাদা থাকলে নানা বিষয়ে কথা বলতেন; মতামত ও যুক্তি জানতে চাইতেন। 

রঞ্জন দা শুধু স্বপ্ন দেখাতেন না। সেই স্বপ্নের পেছনে কীভাবে কাজ করতে হয় এবং বিরুদ্ধ স্রোতে কীভাবে সাহস ধরে রাখতে হয়, সেটা তাঁর চাইতে বেশি ভালো করে আর কেউ কমই বুঝিয়েছেন আমাদের। পেছন থেকে শুধু সাহস জোগানো নয়; সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ছিল বলেই তিনি আমাদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী একজন মানুষ। কিছুদিন আগে কথা হচ্ছিল তাঁর অফিসে। দ্রুত কীভাবে আবার দেশব্যাপী জেন্ডার সমতা নিয়ে নব উদ্যোগে, জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে কাজ করা যায়; কীভাবে বর্তমানে বেড়ে যাওয়া নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া যায়– এসবই ছিল আলোচনার বিষয়। রঞ্জন দা আবার তৈরি হচ্ছিলেন আরেকটি অধ্যায় শুরু করার জন্য, আরেকটি লড়াইয়ের! কিন্তু হঠাৎ আমাদের বেসামাল করে চলে গেলেন! 

চোখের কোনা বারবার ভিজে আসে; গলায় কষ্টের দলা কথা আটকে যায়। তবু একটা প্রত্যয় জাগে যখনই রঞ্জন দার মুখ মনে পড়ে। তাঁর স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে পারলে, স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারলে এবং সাহস নিয়ে বিরুদ্ধ স্রোতে দাঁড়িয়ে গেলেই তাঁকে প্রকৃত অর্থে সম্মান জানানো হবে। এ স্বপ্নের শেষ নেই।

ফারহানা হাফিজ: জেন্ডার বিশ্লেষক;  শশাঙ্ক সাদী: লেখক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক 

আরও পড়ুন

×