জলবায়ু ও এল নিনোর প্রভাবে বিপন্ন শৈশব
শশাঙ্ক সাদী
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১১:২২ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:১১
শহরের বেশির ভাগ মানুষ যেভাবে দিনে বহুবার চোখ রাখেন মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে, সেভাবেই উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে কৃষকরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন অস্থির, উদ্বিগ্ন হয়ে। তারা জানেন যে বর্ষা দেরিতে এলে, দীর্ঘ বৃষ্টিহীন সময় গেলে বা একসঙ্গে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি নামলে মাঠের ফসলের সফলতা বা ব্যর্থতায় ভূমিকা রাখবে। অনিশ্চিত বর্ষার পরিণতি শুধু ক্ষেতেই থেমে থাকে না। তা ছড়িয়ে পড়ে রান্নাঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং শ্রেণিকক্ষে। এর প্রতিক্রিয়ায় নীরবে সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করে শিশুরাই।
এই অনিশ্চয়তার একটি অদেখা কারণ হলো এল নিনো। অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পর্যায়ক্রমিক উষ্ণতা, যা কিছু বছর পরপর বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন পাল্টে দেয়। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে তৈরি হলেও এল নিনো প্রবলভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষাকে প্রভাবিত করে। ফলে বেড়ে যায় বৃষ্টি দেরিতে আসা; দীর্ঘ খরা হওয়া; তীব্র গরম পড়া এবং কখনও কখনও হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতিজুড়ে এর প্রভাব ভিন্ন। তবে একটি বাস্তবতা সব সময় একই থাকে। জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের আঘাত যখন পারিবারিক আয় কমিয়ে দেয়, সবার আগে তার মূল্য দিতে হয় শিশুদের। এই আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আগে এল নিনো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ও পর্যায়ক্রমিক জলবায়ু-ঘটনা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী বিশ্বের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে আসছে। অন্যদিকে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন প্রবণতায় প্রভাবিত জলবায়ুর পরিবর্তন হলো একটি অবস্থা, যা আবহাওয়ার নানা ধরনের চরম অবস্থাকে আরও তীব্র করে তুলছে। একসঙ্গে মিলে এই দুটি বিষয় একটি বিপজ্জনক সমন্বয় তৈরি করছে। ইতোমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে যখন এল নিনো দেখা দেয় তখন খরা আরও কঠোর হয়; তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়; বৃষ্টিপাত হয়ে ওঠে তীব্র কিন্তু আরও অনিয়মিত। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই সমন্বয়ের পরিণতি সুদূরপ্রসারী।
৬৫ ভাগের বেশি গ্রামীণ পরিবারগুলোর কাছে বর্ষা কেবল একটি ঋতু নয়। এটি পারিবারিক আয় ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি। একটি খারাপ ফসল কেবল কৃষি উৎপাদন কমায় না; একটি সুদূরপ্রসারী চলমান প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে। কম ফলন মানে কম আয়। কম আয় মানে পরিবারগুলোর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় ব্যয় কমাতে বাধ্য হওয়া। যা শুরু হয় একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা হিসেবে, তা দ্রুতই পরিণত হয় একটি শিশু-উন্নয়ন সংকটে। এটি কেবল একটি ব্যর্থ ফসলের গল্প নয়। এটি এমন এক গল্প, যেখানে একটি শিশু তার ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই সম্ভাবনা নীরবে হারিয়ে যায়।
এই সংকটের প্রথম লক্ষণ দেখা যায় শিশুর স্কুলে যাওয়ার অনেক আগেই। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনকে, অর্থাৎ গর্ভধারণ থেকে দ্বিতীয় জন্মদিন পর্যন্ত, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সময়ে অপুষ্টি স্থায়ীভাবে মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, শেখার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উপার্জন সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, শৈশবের শুরুতে যেসব শিশু তীব্র বৃষ্টিপাতহীনতা বা বন্যার মুখোমুখি হয়েছে, তুলনামূলক স্থিতিশীল বছরগুলোতে জন্ম নেওয়া শিশুদের চেয়ে তাদের মধ্যে খর্বতা ও ক্ষীণতার ঝুঁকি বেশি।
এই সংকটও সমানভাবে বণ্টিত না। জলবায়ুজনিত আঘাত সাধারণত নতুন দুর্বলতা তৈরি করে না। বরং যে দুর্বলতা আগে থেকেই আছে তাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সীমিত সঞ্চয়ের দরিদ্র পরিবার, ভূমিহীন শ্রমিক, নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার এবং যেসব কমিউনিটি আগে থেকেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তাদের সামনে ফসল নষ্ট হলে বা খাদ্যের দাম বাড়লে বিকল্প সবচেয়ে কম থাকে। এই সংকট মোকাবিলায় তাদের কৌশলের মূল্য প্রায়ই দিতে হয় তাদের সন্তানদেরই।
সেই কৌশলের প্রতিফলনে মা-বাবা না চাইলেও প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুর শিক্ষার অধিকার। গত দুই দশকে স্কুলে শিশু ভর্তির হার বাড়ানোর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবু জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ব্যাপক পরিসরে শিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটিয়েই চলেছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই চরম আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশের তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে এবং কিছু শিশু এক বছরেই প্রায় আট সপ্তাহ পর্যন্ত শিক্ষা পাওয়ার সময় হারিয়েছে। ওই বছরই ঘূর্ণিঝড় রিমাল ও বন্যার কারণে ১১টি জেলাজুড়ে সাত সহস্রাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে প্রায় ১৫ লাখ শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়। জাতীয় পর্যায়ে, ২০২১ সাল নাগাদ ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭ শতাংশেরও বেশি, প্রায় ২০ লাখ শিশু। ইউনিসেফের হিসাবে প্রায় ১৭ লাখ শিশু এখন পড়াশোনার বদলে কাজ করছে। এদের অনেকেই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র তাপপ্রবাহে নিয়মিত স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত; লাখো পরিবার বাস্তুচ্যুত এবং শিশুরা শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পারিবারিক আয় ভেঙে পড়লে বেতন বিনামূল্যে হওয়ার পরও অনেক মা-বাবা স্কুল-সংক্রান্ত খরচ আর বহন করতে পারেন না। কিছু শিশু পারিবারিক আয়ে সাহায্য করতে অপেশাদার শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এদের অনেকেই দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতির পর আর কখনোই স্কুলে ফেরে না।
মেয়েশিশুদের ওপর প্রভাব আরও বেশি
ক্রমবর্ধমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উপাত্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের চাপ বাল্যবিবাহের হার বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সেসব কমিউনিটিতে, যেখানে দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য ও জলবায়ু ঝুঁকি একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘গ্লোবাল গার্লহুড রিপোর্ট ২০২৩’ বাংলাদেশকে বিশ্বের ১০টি ‘বাল্য বিবাহ ও জলবায়ু হটস্পট’ দেশের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার তালিকায় আরও আছে চাদ, নাইজার ও দক্ষিণ সুদান। প্রতিবেদনটি ২০২০ সালের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহের পরবর্তী বছরগুলোতে ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা এল নিনো বছরগুলোর সঙ্গে স্পষ্টভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ এল নিনো নিয়মিতভাবে আঞ্চলিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
২০০৭ সালে দক্ষিণ বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় সিডর নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের বাল্য বিবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। সিডর-পরবর্তী বছরগুলোতে যাদের বিয়ে হয়েছে তাদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সের কম বয়সী কন্যাশিশুর বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়েছিল। এই প্রভাব বেশি পাওয়া গেছে সিডর ঝড়ের প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ যখন সিডর-আক্রান্ত পরিবারগুলোর সঞ্চয় ফুরিয়ে গিয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলবায়ু দুর্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কন্যাশিশুর বাল্য বিবাহ ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের একটি যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫১.৪ শতাংশ মেয়ে, অর্থাৎ প্রতি দুইজনে একজনেরও বেশি, এখন ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহিত হচ্ছে। এই বাল্য বিবাহের হার এশিয়ার মধ্যে এখন সর্বোচ্চ।
দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো বিয়েকে পারিবারিক ব্যয় কমানোর একটি উপায় হিসেবে দেখে বা মেয়েকে একটি সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার প্রত্যাশা করে। এর ফলে এমন এক চক্র তৈরি হচ্ছে, যা থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বিবাহিত কন্যাশিশুদের স্কুলের বাইরে থাকার সম্ভাবনা অবিবাহিত কন্যাশিশুদের তুলনায় চার গুণেরও বেশি। অন্যদিকে একবার বিয়ের কারণে স্কুল ছাড়ার পর কন্যাশিশুদের পড়াশোনায় ফেরার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এর ফলে কর্মসংস্থান, আর্থিক স্বাধীনতা ও জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের সীমিত হয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-ক্ষতি
এই প্রভাবগুলো বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো যে জাতীয় গড় হিসাব প্রায়ই স্থানীয় বাস্তবতা আড়াল করে ফেলে। বাংলাদেশ একটিমাত্র জলবায়ু অঞ্চল নয়। খরাপ্রবণ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, হাওর ও পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বন্যাপ্রবণ এলাকা এবং ঘূর্ণিঝড়প্রবণ উপকূলীয় জেলা; প্রতিটি এলাকাই ভিন্নভাবে জলবায়ু-ঝুঁকির মুখোমুখি হয়। এমনকি একই জেলার মধ্যে প্রতিবেশী কমিউনিটিগুলো জীবিকার সুযোগ, জমির মালিকানা ও মৌলিক সেবাপ্রাপ্তির সুযোগের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া বিপন্নতার মাত্রার কারণে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে।
এই বিপন্নতার মাত্রা অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কার্যকর নীতি কেবল একটি গড় হিসাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা যায় না। সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কমিউনিটিতে বসবাসরত শিশুদের প্রয়োজন সংকট বাড়ার আগেই লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা; ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরের ত্রাণ নয়।
সৌভাগ্যবশত, এল নিনো পূর্বপ্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় দেয়, যা অনেক দুর্যোগ দেয় না। একটি ঘূর্ণিঝড় যেখানে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে, সেখানে এল নিনো সাধারণত কয়েক মাস ধরে গড়ে ওঠে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশে পৌঁছানোর অনেক আগেই নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে এর পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এই পূর্বাভাসযোগ্যতা একটি অসাধারণ সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু তা এখনও যথাযথভাবে দেশে কাজে লাগানো হয়নি।
প্রচলিত মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা তখনই সাড়া দেয় যখন ফসলহানি ঘটে; অপুষ্টির হার বাড়ে বা স্কুল থেকে ঝরে পড়া দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ততক্ষণে বিপদাপন্ন পরিবারগুলো তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলে; উৎপাদনশীল সম্পদ বিক্রি করে দেয় বা সন্তানকে বিশেষ করে কন্যাশিশুকে স্কুল থেকে সরিয়ে নেয়। এর ফলে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর, ব্যয়বহুল এবং অনেক কম কার্যকর হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ বিশ্বকে সফলভাবে দেখিয়েছে, দুর্যোগের আগেই পদক্ষেপ নিলে জীবন বাঁচানো যায়। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি, পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর একটি থেকে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের একটি বৈশ্বিক দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে। জলবায়ু আঘাত থেকে শিশুদের রক্ষা করার নীতিতেও এখন একই নীতি অনুসরণ করা উচিত।
পূর্বাভাসকে কেবল পর্যবেক্ষণের তথ্য হিসেবে না রেখে তাকে শিশুবান্ধব কার্যকরী ব্যবস্থা হয়ে উঠতে দেওয়া হবে পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাসে যখন এল নিনোর উচ্চ আশঙ্কা দেখা যায় তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্প্রসারিত করা জরুরি। জীবিকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আগেই বিপদাপন্ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর মৌলিক চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত নগদ সহায়তা বরাদ্দ করা। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ার আশঙ্কার মাসগুলোতে অন্তঃসত্ত্বা ও শিশুদের জন্য পুষ্টি সহায়তা বাড়ানো। সাময়িকভাবে স্কুল উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, যাতে আর্থিক সংকট কোনো শিশুকে বিশেষ করে কন্যাশিশুকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে না দেয় এবং শিশু সুরক্ষা সেবাগুলো কমিউনিটিভিত্তিক পর্যবেক্ষণ শক্তিশালী করতে পারে, যাতে শিশুশ্রম বা বাল্য বিবাহের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আগেই চিহ্নিত করা যায় এবং ঝুঁকি কমিয়ে আনার জন্য তাদের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
এগুলো বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান একটি প্রবণতা প্রতিফলিত করে, তা হচ্ছে অগ্রিম পদক্ষেপ বা অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন। অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশনের মাধ্যমে দুর্যোগ ঘটার পর মানবিক সাড়া দেওয়ার বদলে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস ব্যবহার করে দুর্যোগ ঘটারও আগে তার মানবিক প্রভাব কমিয়ে আনা হয়। এটি কেবল সহায়তা আগেভাগে পৌঁছে দেওয়ার বিষয় নয়। এটি এমন এক বিষয়, যার লক্ষ্য হচ্ছে জলবায়ুজনিত সাময়িক আঘাতকে সারাজীবনের প্রতিবন্ধকতায় রূপান্তরিত হতে না দেওয়া।
এভাবে শিশুদের রক্ষা করাকে কেবল মানবিক সহায়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে দেখা উচিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সহনশীলতায় একটি বিনিয়োগ হিসেবে। যে শিশু সুপুষ্ট থাকে তার শেখার সম্ভাবনা বেশি। যে শিশু স্কুলে থেকে যায় তার সমাজে উৎপাদনশীল অবদান রাখার সম্ভাবনা বেশি। যে কন্যাশিশু বাল্য বিবাহ এড়িয়ে যেতে পারে তার শিক্ষা সম্পন্ন করা, কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। এই ফলাফল পরিবার, কমিউনিটি ও জাতীয় অর্থনীতিকে একই সঙ্গে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশ প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো গঠনে বাধা দিতে পারবে না। দূরবর্তী সমুদ্রের উষ্ণতা বা ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ তৈরি করা বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করাও তার সাধ্যের বাইরে। কিন্তু এল নিনো ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকির যৌথ শক্তি যখন তার নিজের উপকূলে পৌঁছায় তখন সে কতটা প্রস্তুত থাকবে, তা নির্ধারণ করার সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে।
জলবায়ু সহনশীলতার প্রকৃত মাপকাঠি কেবল একটি দেশ তার অবকাঠামো বা ফসল কতটা ভালোভাবে রক্ষা করতে পারে, তা নয়। এটি নির্ভর করে সে তার শিশুদের কতটা ভালোভাবে রক্ষা করতে পারে, তার ওপর।
এল নিনো এলে কখনও জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত নয় যে, শিশুরা স্কুল ছাড়তে শুরু করা বা অপুষ্টিতে ভুগতে শুরু করার পর বাংলাদেশ কত দ্রুত সাড়া দিতে পারে। বরং জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত– দেশ সেই ক্ষতিগুলো প্রতিরোধ করার জন্য আগেভাগে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছিল কিনা।
পৃথিবীর অর্ধেক পথ দূরে তৈরি হওয়া একটি আবহাওয়ার ধরনকে কখনও এই সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া উচিত নয়– একটি বাংলাদেশি শিশু কতটা লম্বা হবে, সে কতদিন স্কুলে থাকতে পারবে, অথবা তার ভবিষ্যতের কতটা তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হবে। এল নিনোর পূর্বাভাস দেওয়ার বিজ্ঞান ইতোমধ্যে আছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, সেই পূর্বাভাস যেন পৌঁছায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যাদের, সেই শিশুদের কাছে; চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া আর জলবায়ু-অভিযোজনের আপাত পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার আগেই।
শশাঙ্ক সাদী: লেখক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক
- বিষয় :
- গ্রাম
- প্রকৃতি
- পরিবেশ
- এল নিনো
- জলবায়ু পরিবর্তন