সাংবাদিকতা
বিষাদময় বাস্তবতায় সত্য তুলে ধরার লড়াই
গৌতম মণ্ডল
গৌতম মণ্ডল
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৬ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৫২
ইউক্রেন-রাশিয়ার মতো ভূখণ্ড দখলের কোনো যুদ্ধ নয়। সমুদ্রে জাহাজ আটকে দেওয়ার মতো সামরিক মহড়াও নয়। এ লড়াই শব্দের, সত্যের এবং প্রাচীন একটি পেশার মর্যাদা টিকিয়ে রাখার। বিলিয়ন ডলার করপোরেট লগ্নির বিপরীতে গিয়ে লড়াইটা আসলে সাংবাদিকতার মৌলিক ভিত্তি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার। এটি কোনো নৈরাশ্যবাদ বা হতাশায় ভেঙে পড়ার গল্প নয়। দেশ কিংবা মহাদেশ– যে কোনো দূরত্ব বিবেচনায় সংকটটি সবার। প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের বলে একে আলাদা করার সুযোগ নেই।
আমার এই উপলব্ধি নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে; যুক্তি-তর্কে খারিজ করাও যেতে পারে। কিন্তু যে সত্য ধ্রুবতারার মতো স্বমহিমায় উজ্জ্বল, তাকে অস্বীকার করা কঠিন।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। গত ২৪ জুন যুক্তরাজ্য সরকারের ‘ডিপার্টমেন্ট ফর কালচার, মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্ট’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বলা হচ্ছে, দেশটির ইতিহাসে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে এটি বড় মূল্যায়ন। ৫৮৬ জন সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে লন্ডনের গবেষণা সংস্থা ‘আলমা ইকোনমিকস’ প্রতিবেদনটি তৈরি করে। ‘ইউকে জার্নালিস্ট সেফটি রিসার্চ ২০২৬’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় ডানপন্থিদের বিক্ষোভ, ট্রাম্প প্রশাসন ও ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে সংবাদ প্রকাশে সেল্ফ সেন্সরশিপের আশ্রয় নিচ্ছেন সাংবাদিকরা। তারা অনেক কিছু এড়িয়ে চলছেন, সংবাদ পরিবেশনেও পরিবর্তন আনছেন।
এ গবেষণা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, সংশয়ও নেই। তবে উপলব্ধি রয়েছে। গোটা বিশ্বে লিগ্যাসি মিডিয়া বা ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা যখন কমছে, তখন জনপরিসরে মুক্ত আলোচনার পথও সংকুচিত হয়ে আসছে। গলা চড়িয়ে যতই ‘ফ্রি প্রেস’ বলি; হালের সাংবাদিকতায় এটি বাস্তবতা; অপ্রিয় তো বটেই।
পেশাগত অভিজ্ঞতা বলে, বার্তাকক্ষে কোনো লাল নোটিশ ঝোলে না। সব সংবাদ প্রকাশে বিধিনিষেধের কড়াকড়ি বা আইনি নিষেধাজ্ঞাও থাকে না। তবু কিছু সংবাদ প্রকাশে বাধা অনুভূত হয়। অদৃশ্য বাধা। ভাবনাকে প্রভাবিত করার মতো বাধা। বিষয়বস্তু বদলে দেওয়ার মতো বাধা। ইচ্ছাকে তখন কেটেছেঁটে উপস্থাপন করতে হয়। ভেতর থেকে দমিয়ে রাখতে হয় নিজেকে। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, ব্রিটেনের মতো দেশের সাংবাদিকরা এখন এমন সেল্ফ সেন্সরশিপের কথা বলছেন, যেখানে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস ৪০০ বছরের বেশি পুরোনো। শুধু কি তাই! এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নির্লিপ্ত ভূমিকা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। স্বীকার করি বা না করি, বার্তাকক্ষে সেই সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, হয়েছে।
গেল জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহের ঘটনা। উত্তর আয়ারল্যান্ডে অভিবাসনবিরোধী কর্মসূচি ঘিরে বেশ বড়সড় একটি দাঙ্গা হয়। ওই ঘটনার খবর সংগ্রহের সময় মুখোশধারীদের হাতে হেনস্তার শিকার হন কয়েক সাংবাদিক। এমনকি এক সাংবাদিকের ভিডিও ফুটেজ একটি ফেসবুক গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাকে খুঁজে বের করতে লোকজন দল বেঁধে মাঠে নামে।
এই বাস্তবতা শুধু উত্তর আয়ারল্যান্ডে নয়; পশ্চিমা অনেক দেশেই ডানপন্থিদের অভিবাসনবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে এখন ‘অনীহা’। কারণ তারা নিশানায় পড়তে চান না। অভিবাসনবিরোধী মিছিলে সশরীরে থাকার ঝুঁকি এবং খবর প্রকাশের পর যে ধরনের প্রতিক্রিয়া আসছে, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। একই ঘটনা ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিবিরোধী কর্মসূচির ক্ষেত্রে।

আজকের সাংবাদিকতায় সংকটের আরেকটি চিত্রও রয়েছে। ছোট-বড় নানা মাপের সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ঘিরে ওই সংকট, যেগুলোকে সাংবাদিকতার বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ভাবা হচ্ছে। অথচ ভুল তথ্য, মিথ্যা তথ্য বা অপতথ্য উৎপাদনের অন্যতম ‘ল্যাবরেটরি’ হলো সোশ্যাল মিডিয়া। একটি পোস্টের মাধ্যমে যে মিথ্যার শুরু, তা হৃষ্টপুষ্ট হয় রিপোস্ট, এনগেজমেন্ট, অ্যালগরিদমিক বুস্ট কিংবা কখনও মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ‘রিপোর্টিং অন দ্য রিপোর্ট’-এর মধ্য দিয়ে। তবে এর বাইরে কোথাও যে মিথ্যা উৎপাদন হয় না, তা কিন্তু নয়।
বাস্তবতা হলো, এসব নিয়ে মেটা প্ল্যাটফর্মস, এক্স করপোরেশন বা টেনসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানের ‘মাথাব্যথা’ কমই মনে হয়। বরং তারা ‘ফ্যাক্ট চেকিং সার্ভিস’ চালু করে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে উৎসাহী। তাতে বাণিজ্য আছে। অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের শৈশবের দুরন্তপনা ফেরাতে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের আইন করতে হয়। যেমনটি করেছে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রিয়া।
মূলধারার সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ বুঝতে আরেকটি ঘটনা তুলে ধরতে চাই। গত ২৩ জুলাই মার্কিন ট্রিলিয়নেয়ার ইলন মাস্কের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে ব্রিটেনের ১৮২ বছরের লিগ্যাসি মিডিয়া ‘দি ইকোনমিস্ট’। সাক্ষাৎকার নেন প্রধান সম্পাদক জ্যানি মিন্টন বেডোজ, যিনি অর্থনৈতিক উদারবাদে বিশ্বাস করেন; বাক্স্বাধীনতার কথা বলেন। দুর্দান্ত তাদের কথোপকথন, প্রাণবন্ত আলোচনা। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে এক্স করপোরেশনের (সাবেক টুইটার) মালিক ইলন মাস্ক যা করেন, তা একেবারে ব্যতিক্রম (অনেকে বলেছেন, ‘আপত্তিকর দাম্ভিকতা’)।
সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন ছিল এমন– মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডির বাজেট ছাঁটাই কি উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর কারণ হয়েছে? আপনি কি বর্ণবাদী অথবা মুসলিমবিদ্বেষী? এমন প্রশ্নে উত্তরদাতা বিব্রত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তাই ‘অন ক্যামেরা’ জ্যানির সঙ্গে মাস্কের বিতর্ক ছিল অবধারিত। অনুষ্ঠানের পরিবেশ আরও বদলে যায় যখন ইকোনমিস্ট সম্পাদক জানতে চান– ‘মানুষ যে আপনাকে ঘৃণা করে, সেটি বুঝতে পারেন কিনা?’ উত্তরে মাস্কের যুক্তি ছিল, ‘যেহেতু এক্সে কোটি কোটি ফলোয়ার রয়েছে, আমি অবশ্যই জনপ্রিয়।’ বরং ইকোনমিস্টের মতো সংবাদমাধ্যমকে মানুষ বেশি ঘৃণা করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট জেন মার্টিনসন মনে করেন, এই কথোপকথন কেবল দুজন মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং তথ্যপ্রবাহ ব্যবস্থার নাজুক অবস্থাকেও উন্মোচন করে। রূপক উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাক্ষাৎকারটি যদি হতো কোনো গ্রিক মহাকাব্যের অভিযান, তবে ইকোনমিস্ট সম্পাদক চেষ্টা করছিলেন সত্য ও সুরক্ষার ঠিকানায় ফিরে যেতে। ইলন মাস্ক ছিলেন ক্রুদ্ধ সমুদ্রদেবতার মতো, যিনি বিতর্ক শেষ হওয়ার পরও চারদিকে ভয়ংকর ঝড় ও দানবদের উন্মুক্ত করে দিচ্ছিলেন।’ (দ্য গার্ডিয়ান, ১ আগস্ট ২০২৬)।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ইকোনমিস্ট সম্পাদক অনুষ্ঠানটির লিংক এক্সে শেয়ার করলে মাস্ক সেটি রিপোস্ট করেন। ক্যাপশনে লিখেন– ‘জ্যানির সঙ্গে উদ্ভট সাক্ষাৎকার’। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নামে বিষোদ্গার শুরু। মাস্ক তাতে ‘ঘি ঢেলে’ লিগ্যাসি মিডিয়াকে ‘বাস্তবতা বিবর্জিত দুঃস্বপ্নের আয়না’ বলে আক্রমণ করেন। জেন মার্টিনসন মনে করেন, ইলন মাস্কের মধ্যে সত্যকে অস্বীকার করার যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিই তাঁর সাক্ষাৎকারকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু ক্ষমতাধরকে কঠিন প্রশ্ন করা এবং সত্যের অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাংবাদিকতা; এমনকি খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখালেও।
এমন নয় যে, সাংবাদিকতা সবসময় নীতি-নৈতিকতা মেনে হয়েছে বা হচ্ছে। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে অনেক সংবাদমাধ্যম। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন জিতবেন ধরে নিয়ে ‘ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট’ শিরোনামে বিশেষ প্রচ্ছদ ছেপে বসেছিল ‘নিউজউইক’। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর তড়িঘড়ি বাজার থেকে সব কপি তুলে নিতে হয়। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটি বিষাদময় ভুল; নৈতিক স্খলনের উদাহরণ।
তবে আমার বক্তব্যের বিষয় সাংবাদিকতার বিচ্যুতি নয়, বরং পেশাটি যে কঠিন প্রতিকূলতার মুখোমুখি, সেটি উপলব্ধির চেষ্টা করা। কোটি কোটি অনুসারীর সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য যখন বানের জলের মতো ভাসে আর নানা বিভ্রান্তি ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ পায়, তখন সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ওপরেই বর্তায়। কিন্তু ভয় বা সুবিধাবাদ– যে কারণেই হোক, সেল্ফ সেন্সরশিপ যদি অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে সাধারণ মানুষের সত্য জানার অধিকার হারিয়ে যাবে চিরতরে। তখন অনুসন্ধান থাকবে না; সাংবাদিকতা কেবল কিছু ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ শব্দচয়নের অনুশীলনে রূপ নেবে! তাই যত কঠিন দিনই আসুক, সত্য যেন হেরে না যায়।
গৌতম মণ্ডল: ইনচার্জ অব অনলাইন, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- সাংবাদিকতা
- গৌতম মণ্ডল