ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

উন্নয়ন

সরকার আরও যে ৯টি কাজ করতে পারে

সরকার আরও যে ৯টি কাজ করতে পারে
×

জাকারিয়া স্বপন

জাকারিয়া স্বপন

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩০ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩১

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ ধন্যবাদ পেতে পারেন, তিনি আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। যে কোনো খাতেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা সরকারের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করে ফেলে। বিভিন্ন চাপ উপেক্ষা করে এই সাহসটুকু রাষ্ট্রকে নিয়ে গেছে ভিন্ন মাত্রায়। 

বর্তমানে বাংলাদেশ ভিন্ন মেজাজের একজন প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে শুরু করেছে। সেখানে ভদ্রতা আছে, সৌজন্য আছে, নারীর প্রতি সম্মান আছে। সেই ভরসায় একজন সামান্য নাগরিকের ৯টি দাবি তুলে ধরছি, যা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে।

১. ব্রেইন ড্রেইন কমান

গত কয়েক বছরে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে পৃথিবী। এটা ২০২৬ সাল; ১৯২৬ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য খুবই দ্রুততার সঙ্গে সামনের দিনগুলো আরও পাল্টে যাবে। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন হবে বুদ্ধিমান মানুষ। সুপার বুদ্ধিমান মানুষ! বাংলাদেশে যারা টপ-টায়ারের তরুণ বুদ্ধিমান, তাদের সঙ্গে কথা বললে দেখা যাবে, কীভাবে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অথচ দেশের যে সমস্যাই সমাধান করতে যান না কেন, বুদ্ধিমান মানুষ লাগবে। তরুণদের লাগবে। ফ্রেশ ব্রেইন লাগবে। নতুন এনার্জি লাগবে। যদি বুদ্ধিমান তরুণদের ধরে রাখতে না পারা যায়, তাহলে দেশকে সামনে নেওয়া যাবে না। পিরিয়ড!

২. তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান

বাংলাদেশে তরুণ জনসংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু দেশ যেদিকে ধাবমান, এই তরুণ গোষ্ঠী সম্পদ না হয়ে দায়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। বিএনপি ঘোষণা দিয়েছিল– সরকার গঠন করলে প্রথম দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করবে। এই কর্মসংস্থান কেবল সরকারি চাকরি নয়; বড় অংশ জুড়ে থাকবে তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ফ্রিল্যান্সিং, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা।

এভাবে বিশাল সংখ‍্যাগুলো বলে গত শতাব্দীতে পার পাওয়া যেত। এখন মানুষ বুঝতে পারে, বড় সংখ্যা প্র্যাগমেটিক নয়। বলার জন্য বলা। আর অবস্থা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ। সারাদেশে পুরোনো স্টাইলে ফ্রিল্যান্সার ট্রেনিং শুরু হয়েছে। কিন্তু বিশ্ব এর ভেতর অনেক বদলে গেছে। আগের মডেল চলবে না।

৩. সিস্টেম তৈরি করুন

সঠিক সেবা নিশ্চিতে দ্রুত সিস্টেম তৈরি, সিস্টেম অটোমেশন করুন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য, মন্ত্রীদের জন্য দ্রুত ড্যাশ-বোর্ড তৈরি করুন। কিছু বিষয় হাই-প্রায়োরিটি দিয়ে হলেও সিস্টেম তৈরি করুন। হাতে খুব বেশি সময় নেই। ছয় মাস তো দেখতে দেখতেই চলে যাচ্ছে। আগামী ছয় মাসও ঢাকার জ্যাম দেখতে দেখতে চলে যাবে।

সিস্টেম তৈরিতে দেশে পর্যাপ্ত লোকবল নেই, যারা এগুলো বুঝতে পারে। প্রবাসে অনেক বাংলাদেশি আছেন। তাদের কিছু ধরে নিয়ে আসুন। মালয়েশিয়ায় মাহাথির এটা করেছিলেন। দিন-তারিখ ঠিক করে ম্যাসিভ অটোমেশন করুন। সেখানে ১০ হাজারের বেশি ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিন। তাদের ভালো কর্মসংস্থান হবে। ক্যাপাসিটি তৈরি হবে।

সঠিক সিস্টেম তৈরি করতে না পারলে সার্ভিস ডেলিভারি করা যাবে না। তখন দেখবেন, আগামী বছরও বলতে থাকবেন– এক কোটি কর্মসংস্থান করা হবে। সেই আগামী কোনোদিন আর বর্তমান হবে না!

৪. কৃষিতে বিনিয়োগ করুন

এই দেশের মাটি উর্বর। যদিও আমাদের জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে; এই মাটিতে সঠিক পরিকল্পনায় আরও বেশি ফলন করা সম্ভব। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দারুণ ফল পাওয়া যেতে পারে। মাছ, গবাদি পশু, দুধ ইত্যাদিতে সুফল আসবে দ্রুত। সেমি-কন্ডাক্টর নিয়ে উৎসাহ ভালো, কিন্তু আমরা নিজেদের তার জন্য তৈরি করিনি। আমরা অনেক অনেক দূরে; ফল পেতে অনেক সময় লাগবে। আগে বরং কৃষিতে রপ্তানি বাড়ানো দরকার। 

৫. বি-টু-বি ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স বাড়ান

সম্প্রতি অ্যামাজন এবং অন্যান্য অনলাইন মার্কেটপ্লেসে পণ্য বিক্রির জন্য নী‌তিমালা কিছুটা সহজ করা হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে কিছুটা উপকার হবে। কিন্তু আরও ম্যাসিভ ফোর্স লাগবে। চায়নার আলিবাবা যেভাবে কাজ করেছে, সেভাবে নামুন। যারা এ ক্ষেত্রে কাজ করবে, তাদের সহায়তা দিন। রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজতর করুন। কাস্টসম সহজ করুন। কুটির শিল্পকে সহায়তা দিন। যেই পণ্যটা ভালো, তাকে আরও ভালো করার সহায়তা দিন। তাহলেই রপ্তানি বাড়বে। গ্লোবাল ই-কমার্স বাড়বে।  

৬. বিশ্বমানের শিক্ষা

বাংলাদেশের তরুণ গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গিয়ে হিমশিম খায়। কারণ আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে মোটামুটি ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশে যে কোনো বছরের টপ এক হাজার গ্র্যাজুয়েটকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের টপ এক হাজারের সঙ্গে তুলনা করেন। তাহলেই বুঝতে পারবেন, ওরা কতটা যোগ্যতাসম্পন্ন, আর আমরা কোথায়! ভয়ের বিষয় হলো, এর কোনো শর্টকাট নেই। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক থেকে এই যাত্রা শুরু হয়। ওখানে না আছে ভালো শিক্ষক আর শিক্ষা উপকরণ; না আছে ভালো পরিবেশ।

৭. সমাজে ন্যায্যতা

বাংলাদেশ থেকে ‘ন্যায্যতা’ বিষয়টিই যেন প্রায় উঠে গেছে। এখানে জন্মের পর থেকেই শিশুরা দেখতে থাকে যাবতীয় অন্যায্য কর্মকাণ্ড। অন্যায্য সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে উঠে ব্রেইন তাকে পরিচালিত করে অন্যায্য হতে। বড় হয়ে সে যখন সমাজ কিংবা সরকারের কোনো দায়িত্বে বসে; ন্যায্য বিষয়টাই আর বুঝতেই পারে না। 

রাজনীতিবিদরা বুঝতেই পারেন, আপনাদের কাছে দিনরাত মানুষের লাইন লেগে থাকে একটু বাড়তি সুবিধার জন্য, যা মূলত অন্যায্য। কারণ সে তার ন্যায্য অধিকারটুকু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাচ্ছে না। সমাজে ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন। বড় বড় নেতাও এখানে ফেল করেছেন। আপনি যদি লেজার ফোকাস থাকেন, তাহলে পেরেও যেতে পারেন।

৮. নেতৃত্বে স্মার্ট টিম গড়ুন

যে কোনো খেলায় টিমের দুটো যোগ্যতা থাকতে হয়। প্রথমটি হলো, শার্প প্লেয়ার। দ্বিতীয়টি, ট্রেনিং নেওয়ার ক্যাপাসিটি। সবাইকে ট্রেনিং দিলেই ভালো ফুটবলার হয়ে যাবে না। আপনি চারপাশে যা পেয়েছেন, তাদের নিয়েই দল গঠন করে খেলতে নেমেছেন। কিন্তু তাদেরকেই রাখুন, যারা বর্তমান পৃথিবীতে ট্রেনিং নিয়ে সামনে যেতে পারে। যাদের এই যোগ্যতা আছে। আপনি যত চেষ্টাই করুন, কাঠের ভেতর দিয়ে কিন্তু বিদ্যুৎ পাঠাতে পারবেন না। বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য লাগবে লোহা।

৯. সাংস্কৃতিক আন্দোলন

বাংলাদেশের রুচি গত কয়েক দশকে নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের ভাষা নষ্ট হয়ে গেছে, সাহিত্য নষ্ট হয়ে গেছে, সৌজন্য নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত নোংরা কাদা নিয়ে আমরা ঘাঁটাঘাঁটি করি এবং প্রতিনিয়ত সবাইকে সেই কাদার ভেতর নামিয়ে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছি। যারা এই কাদার ভেতর থাকতে চান না, তারা চুপ করে থাকেন; নয়তো এই দেশ ছেড়ে চলে যান। আধুনিক তরুণরাও বুঝে ফেলে– এই কর্দমাক্ত মাঠে তার জায়গা নেই। তার রুচি সেখানে থাকতে দেবে না। তাই কোনো রকমে বিশ্ববিদ্যালয়টা শেষ করেই ভিসার জন্য লাইন দিতে থাকে।

এই দেশকে, এই দেশের মানুষকে এই কর্দমাক্ত অবস্থা থেকে বের করতে হলে প্রয়োজন একটি সামাজিক আন্দোলন– সাংস্কৃতিক আলোর ছটা। একটি ভালো টিম তৈরি করে দিন, যারা এটা নিয়ে কাজ করবে। পুরো দেশে একটি ভালো কালচার তৈরির চেষ্টা করবে। মাননীয় প্রধামন্ত্রী, দেশের কান্ডারি হিসেবে একটু চেষ্টা করুন– সিনসিয়ারলি, প্লিজ! গুড লাক!

জাকারিয়া স্বপন: তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ 
[email protected]

আরও পড়ুন

×