ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সমাজ

গালাগালের লৈঙ্গিক রাজনীতি

গালাগালের লৈঙ্গিক রাজনীতি
×

মনজুর রশীদ

মনজুর রশীদ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:২৭

সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি গালাগাল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশ। বাংলা সংস্কৃতি ও ভাষার ঐতিহ্যে গালি বা অশিষ্ট শব্দভান্ডার দীর্ঘকাল ধরে মৌখিক ও সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে এক মিশ্র অবস্থান ধরে রাখতে পারলেও সেখানে নিম্নমানের কুৎসিত ও বীভৎস শব্দভান্ডারের পুনঃপুন প্রয়োগ আমাদের জাতিসত্তার নেতিবাচক দিকগুলো যেন সামনে টেনে এনেছে।

বাংলা সংস্কৃতি ও ভাষায় গালাগাল শুধু অশালীন শব্দ নয়। বরং এটি ক্ষোভ প্রকাশ, রসিকতা এবং সামাজিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি দীর্ঘকালীন মাধ্যম। এটি ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তন, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিষয় হিসেবে সব সময় রয়ে গেছে। ঐতিহাসিকভাবে গালিকে অবমাননার হাতিয়ার হিসেবে দেখা হলেও আমাদের বাংলা ভাষায় গালির মূল বৈশিষ্ট্য ও আধিপত্য মূলত মাতৃতান্ত্রিক আক্রমণ ও পিতৃতন্ত্রের আধিপত্যবাদী চিন্তার প্রতিফলন হিসেবেই বারবার প্রমাণ করেছে। সে কারণেই বাংলা ভাষার বেশির ভাগ প্রচলিত গালি মূলত মা, বোন বা পরিবারের নারী সদস্যকে কেন্দ্র করে তৈরি।

সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে নারীদের সম্মানহানি করার মানসিকতা থেকেই এই গালিগুলোর জন্ম। বিবাহবহির্ভূত বা সামাজিক স্বীকৃতিহীন যৌন সম্পর্ককে ইঙ্গিত করে হেয় প্রতিপন্ন করা বাংলা গালির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। তবে এর বাইরে শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্যমূলক অনেক গালিও আমরা দেখে আসছি নির্দিষ্ট নিম্নবিত্ত পেশাজীবী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাচ্ছিল্য করতে। উদাহরণস্বরূপ, বর্ণবাদী শব্দ বা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে কটূক্তি করার প্রবণতা সামাজিক আধিপত্য ও অহমিকা প্রকাশ করার এক ধরনের বিকৃত মানসিকতার অভিরুচিও সমাজে দৃশ্যমান।

তবে আমাদের দেশে গালাগাল একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও এখানে অশ্লীলতার প্রয়োগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। অশ্লীলতার সংজ্ঞা এবং মাত্রা নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকলেও গালি ব্যবহারের পেছনে শত্রুপক্ষকে বাক্যবাণে জর্জরিত করার বিষয়ে কারোরই দ্বিমত নেই। গালির আরেকটি প্রয়োগও রয়েছে। আদর, আশকারা কিংবা ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতেও আমাদের দেশে অনেক সময় গালি দেওয়া হয়। গালির তীব্রতা কিংবা মিষ্টতা পরিস্থিতি ও প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল। তার পরও বলতে দ্বিধা নেই, অধিকাংশ গালির অর্থ এবং প্রয়োগের সঙ্গে নারীর অধস্তন সামাজিক অবস্থানের রাজনীতি জড়িত।

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব এবং স্ট্যান্ডআপ কমেডিতে সেন্সরবিহীন গালির ব্যবহার বেড়েছে, যা অনেক সময় অনলাইন বুলিং বা ঘৃণাত্মক বক্তব্য হিসেবেও চিহ্নিত। এ ক্ষেত্রেও যেসব শব্দের ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়, হোক তা কোনো পুরুষ ও নারীর মধ্যে, পুরুষে পুরুষে, এমনকি দুই নারীর মধ্যে; সেখানেও শব্দবিন্যাসে নারীর স্পর্শকাতর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ইঙ্গিত করে গালিগুলোর প্রয়োগ লক্ষণীয়। ফলে ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগের বহুমাত্রিকতার সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের প্রতিফলনও ভাষার একটি অনানুষ্ঠানিক অংশ হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে এটি কীভাবে এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহার হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।

দেশের রাজনীতিতে গালাগাল ও অশ্লীল ভাষার ব্যবহার এখন একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত। একসময় রাজনৈতিক স্লোগান ও সমালোচনা যেখানে শিষ্টাচার, সৃজনশীলতা ও কবিতার ছন্দে সীমাবদ্ধ ছিল; বর্তমানে তা ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ ও নোংরা ভাষার চর্চায় রূপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, সেখানেও ভয়ংকর রকমের শিষ্টাচার লঙ্ঘিত, যা মূলত নারীকে কটাক্ষ করে বলা শব্দ সংযোজনে বিস্তৃত। এখানে যে বিষয়টি বড় শঙ্কার কারণ, তা হলো, আগে সবচেয়ে অশ্লীল শব্দগুলোর সৃষ্টি ও প্রয়োগ অশিক্ষিত ও নিম্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের থেকে উৎসারিত হলেও এখন এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া বা উত্তীর্ণ তরুণ শিক্ষিত সমাজ থেকেই অনেকটা প্রতিযোগিতামূলক নতুন নতুন অশ্লীল শব্দসম্ভার বাংলা শব্দভান্ডারে যুক্ত হচ্ছে। সে কারণেই রাজনৈতিক স্লোগানগুলো শিষ্টাচারের সব সীমা অতিক্রম করে সৃজনশীল, অর্থবহ ও শ্রুতিমধুর শব্দের বিপরীতে দুর্ধর্ষ, তির্যক ও কুরুচিপূর্ণ শব্দমালায় পরিবর্তিত আকার ধারণ করেছে। 

অথচ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ ধরনের ভাষার ব্যবহার শুধু প্রতিপক্ষের প্রতি তাচ্ছিল্যই প্রকাশ করে না, বরং সামগ্রিক সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কেও নির্দেশ করে। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিচর্চার জন্য গালি বা কুরুচিপূর্ণ ভাষার ব্যবহার পরিহার করে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য একসময় যে তরুণদের ভুমিকা ছিল সবার আগে; অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারাও যেন গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছে।

নানা ধরনের মানুষ নিয়েই আমাদের এই দেশ, এই সমাজ। সংকর জাতিভুক্ত হওয়ায় আমাদের মধ্যে নানারকম ভিন্নতা ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। প্রত্যেকের মাঝে ক্ষুব্ধতা, রাগ-বিরাগ ইত্যাদি থাকবে। এটাও অস্বাভাবিক নয়। শারীরিক সহিংসতার পরিবর্তে গালি দিয়ে যদি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো যায়, তাহলে গালিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু গালির ভাষা কীভাবে সৃজনশীল ও মাধুর্যপূর্ণ করা যায়, খুঁজতে হবে সেই পন্থা, যা নারীসহ অন্যান্য ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, এমনকি শ্রেণি-পেশার মানুষকে যেন কোনোভাবেই অসম্মানিত না করে।

মনজুর রশীদ: সমাজ বিশ্লেষক ও গবেষক 

আরও পড়ুন

×