প্রাথমিক শিক্ষা
শুধু হাজিরায় গুরুত্ব দিলে হবে?
মোশতাক আহমেদ
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৯:৩০
স্কুলে হাজিরা দিতে নেটওয়ার্কের খোঁজে আমগাছে শিক্ষক! প্রথম পাঠে কৌতুককর মনে হলেও বাস্তবে এমনটিই ঘটেছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এক স্কুলে। ১৬ জুন প্রকাশিত বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্কুল বা সংলগ্ন এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ না পাওয়ায় উপজেলার পাকুজ্জোছড়ি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের স্কুলের কাছের এক পাহাড়ের চূড়ায় আমগাছে উঠেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৫ জুন। ওই দিন থেকেই সারাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের অনলাইনে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
নির্দেশনা অনুযায়ী, সকাল ৯টার মধ্যে স্কুলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষকদের হাজিরা খাতার ছবি অনলাইনে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন। এভাবে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাবে। সরকারের এ নির্দেশ প্রতিপালন করতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় গাছের ডালে অবস্থান নিতে বাধ্য হন ওই শিক্ষক।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সামাজিক মাধ্যমে খবরটি প্রচারিত হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে অনেকেই অনেক রকম মন্তব্য করছেন। তবে অনলাইন হাজিরা নিয়ে বিতর্ক বা সমালোচনার তেমন কিছু আছে বলে মনে করি না আমি। সারা পৃথিবীতেই এমন ব্যবস্থা চালু আছে। সমস্যা হলো বাংলাদেশের ইন্টারনেট পরিস্থিতি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গ্রামে গেলে অনেক সময় ফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। অনেক এলাকায় একটি বা দুটি অপারেটর সচল থাকলেও অন্য অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। এ কারণে অনেকেই গ্রাম এলাকায় একাধিক সিম ব্যবহার করেন। এরপর বিদ্যুতের সমস্যা তো আছেই, যার সঙ্গে ইন্টারনেটের সম্পর্ক রয়েছে। বাঘাইছড়ির ঘটনা এই বিব্রতকর পরিস্থিতিরই সাক্ষ্য বহন করে।
ঘটনাটির একটা মানবিক দিকও রয়েছে, যা কোনো বিবেচনাতেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় যারা চাকরি করেন, তারা চাকরি নিয়ে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বর্তমানে নানা কারণে ওই নিরাপত্তাহীনতাবোধ বেড়েছে। তাদের প্রায় সবাই সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। চাকরিটাই তাদের সংসার চালানোর ক্ষেত্রে মূল সম্বল। এ কারণে যখনই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো আদেশ বা নির্দেশনা পান, সেটিকে বেদবাক্য মনে করে তা প্রতিপালনে তারা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এই যে বাঘাইছড়ির আবু তাহের নেটওয়ার্কের খোঁজে পাহাড় ডিঙিয়ে আমগাছে গিয়ে চড়েছেন, সেটাও ওই নিরাপত্তাহীনতাবোধ থেকেই।
তবে কি শিক্ষকদের স্কুলে হাজিরার বিধানে কড়াকড়ি ঠিক নয়? অবশ্যই ঠিক। কিন্তু এর আগে তো সেই নির্দেশ পালনের উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। দূরবর্তী পার্বত্য বা চর এলাকায় ইন্টারনেট বহুদিন ধরেই ঠিকমতো কাজ করছে না। এটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো করেই জানে। তার পরও সেসব এলাকার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি কেন? 
গত ৫৫ বছরে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, আর কোনো সেক্টর বা খাত নিয়ে এমন হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর এই পরীক্ষার কাঁচামাল আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। কখনও পাঠ্যক্রম, কখনও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, কখনও পরীক্ষা পদ্ধতি– এসব নিয়ে কয়েক বছর পরপর নানা ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়।
এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে শিক্ষার, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার প্রধানতম উপাদান যে আনন্দ; প্রতিনিয়ত সেই আনন্দকেই খুন করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আনন্দের কিছু নেই। না ছাত্র-ছাত্রীরা আনন্দ পায়; না শিক্ষকরা। শিক্ষকরা কোনো রকমে নির্ধারিত সময় স্কুলে কাটিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রীব থাকেন। ছাত্র-ছাত্রীরাও দিন পার করতে পারলেই যেন বাঁচে। এতে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নগামীই হচ্ছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা শুধু একটি স্তর নয়, এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি। এই ভিত্তি যত মজবুত হবে, তার ওপর দাঁড়িয়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা তত বেশি শক্তিশালী হবে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ জাতি গঠনে সহায়ক। সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। সরকারি অর্গানোগ্রামে প্রাথমিক শিক্ষকের অবস্থান এখনও নিচের দিকে। ফলে উপযুক্ত বেতন-ভাতা দূরের কথা, আগের মতো সামাজিক সম্মানও মেলে না।
এর কারণও আছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সরকারি আমলা, রাজনীতিবিদ, এমনকি সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা পর্যন্ত তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়ান না। তাদের অধিকাংশের সন্তান অভিজাত প্রাইভেট স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। এর ফলে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলো হয়ে পড়েছে নিতান্তই গ্রামীণ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বিচরণক্ষেত্র। শুধু তাই নয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকট আর্থিক সমস্যার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনছেন। তুলনামূলক কম খরচ বলে কেউ কেউ ওই সন্তানদের মাদ্রাসায় দিচ্ছেন; কেউ কৃষি বা গৃহকর্মে লাগাচ্ছেন।
গত বছর ১৩ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী রাশেদা কে চৌধুরীর এক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ছিল ২ কোটি ১৫ লাখ। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ২ কোটির নিচে। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজারে। এই সামান্য বৃদ্ধিও কোনো আশাবাদী বার্তা দেয় না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ঝরে পড়ার হার। ২০২৪ সালে তা ছিল ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। ছেলেদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি; ১৯ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন ছেলের একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারছে না। ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি; বিশেষ করে নেত্রকোনায়। সেখানে এই হার ৪৪ শতাংশ! রাশেদা কে চৌধুরীর ভাষায়, ‘এটি কোনো সংখ্যার খেলা নয়। এটি হাজারো শিশুর এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হওয়ার গল্প।’
সরকার শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে হাজিরার ব্যাপারে খুবই কঠোর অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ভালো কথা। কিন্তু উদ্বেগজনক ঝরে পড়ার হার বহাল রেখে ওই হাজিরার সাফল্য দিন শেষে কী উপহার দেবে? প্রান্তবর্তী বা গ্রামের স্কুলগুলো ধুঁকতে থাকায় বিষয়টা কিন্তু ঘুরেফিরে ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিকই হয়ে দাঁড়াবে। সারাদেহে রক্তস্বল্পতা রেখে শুধু মুখে রক্ত সঞ্চালন স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়, বরং গুরুতর এক রোগেরই উপসর্গ।
মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
- বিষয় :
- প্রাথমিক বিদ্যালয়
