ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

নারীনির্যাতন

আইন থাকলেই সমাধান হয় না

আইন থাকলেই সমাধান হয় না
×

মুক্তা শেরপা

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩৯

বাংলাদেশ উন্নয়ন, নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ক্ষমতায়নের নানা সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমরা গর্বের সঙ্গে নারী উদ্যোক্তা, নারী প্রশাসক, নারী ক্রীড়াবিদ কিংবা নারী নেতৃত্বের সাফল্যের গল্প বলি। কিন্তু এই অর্জনের আড়ালে একটি কঠিন বাস্তবতা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়– নিজের ঘরের ভেতরেই অসংখ্য নারী প্রতিদিন সহিংসতা, অপমান ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

পারিবারিক সহিংসতা শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন, সামাজিক ন্যায়বিচারের সংকট এবং টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা। যে সমাজে একজন নারী নিজের ঘরেই নিরাপদ নন, সেই সমাজের উন্নয়নকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-ইউএনএফপিএর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এর তথ্য আমাদের গভীর উদ্বেগের কারণ।

সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭০ থেকে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্বামী বা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১১তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়।

পরিসংখ্যানের ভাষায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার। ৪৭ শতাংশ নারী শারীরিক এবং ২৯ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো নীরবতার সংস্কৃতি। নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রায় ৬৪ শতাংশই সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ বা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করেন না। ফলে পরিসংখ্যানের বাইরেও অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা অন্ধকারে থাকে। 

পারিবারিক সহিংসতার শিকড় আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত। প্রথমত, পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো এখনও নারীকে পুরুষের অধীন হিসেবে দেখার মানসিকতাকে টিকিয়ে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নারীদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পথকে কঠিন করে। একজন গৃহিণী ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করলেও সেই শ্রমকে অর্থনৈতিক মূল্য দেওয়া হয় না। ফলে তিনি পরিবারের জন্য অপরিহার্য হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় পিছিয়ে থাকেন।

তৃতীয়ত, সামাজিক অপবাদ, সংসার ভেঙে যাওয়ার ভয় এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ অনেক নারীকে নীরবে সহ্য করতে বাধ্য করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনি অধিকার ও সহায়তা সম্পর্কে নারীর সীমিত জ্ঞান। পারিবারিক সহিংসতার ক্ষতি শুধু একজন নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পুরো পরিবার ও সমাজকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি শিশুদের মানসিক বিকাশও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ সহিংসতা একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সৌভাগ্যবশত, বাংলাদেশে নারীদের সুরক্ষার জন্য আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। ‘ডমেস্টিক ভায়োলেন্স (প্রিভেনশন অ্যান্ড প্রটেকশন) অ্যাক্ট, ২০১০’ নারীদের শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করে।

কিন্তু আইন থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন সেই আইন সম্পর্কে সচেতনতা ও সহজলভ্য সেবা। বর্তমানে ১০৯ নম্বরে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের টোল-ফ্রি হেল্পলাইন, ৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা, ৩৩৩ তথ্যসেবা, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, সরকারি লিগ্যাল এইড অফিস এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নির্যাতিত নারীদের সহায়তা প্রদান করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সেবাগুলোর তথ্য কি সত্যিই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রত্যেক নারীর কাছে পৌঁছেছে?

আমার মতে, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। পরিবারে ছেলে ও মেয়ের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার সমতা ও মানবাধিকার শিক্ষা জোরদার করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে দ্রুত বিচার, আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং গণসচেতনতামূলক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমাদের সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। সহিংসতাকে পারিবারিক বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। 

আজ যখন আমরা টেকসই উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতার কথা বলছি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে– একজন নারী যদি নিজের ঘরেই নিরাপদ না হন, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। পরিসংখ্যান বলছে, ৫১.৫ শতাংশ নারী এখনও জানেন না– নির্যাতনের শিকার হলে কোথায় সাহায্য চাইতে হবে। নারীর নিরাপত্তা দয়া বা বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তার মৌলিক মানবাধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং আমাদের সবার।

মুক্তা শেরপা, গবেষক ও লেখক

আরও পড়ুন

×