আলজাজিরার বিশ্লেষণ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: আশাবাদ বনাম সংশয়
আন্তর্জাতিক
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১১:০২
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির প্রথম ধাপ রোববার স্বাক্ষরিত হবে। তবে তেহরান এই সময়সীমা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে। ইরান বলেছে, চুক্তি স্বাক্ষর ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে’ হতে পারে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়তে পারে। এই যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান : বৃহস্পতিবার ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনা দখলের হুমকি দেওয়ার পর ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলা স্থগিত করেছেন। কারণ, তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি এবং তা সপ্তাহান্তেই স্বাক্ষরিত হতে পারে। পরদিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ‘এর চেয়ে বেশি কাছাকাছি আর কখনও ছিল না’। পরে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যমে আরাঘচির পোস্ট শেয়ার করেন।
এরপর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচ্য নথিতে লেবানন সংক্রান্ত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে ইসরায়েল বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালাচ্ছে। শনিবার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে জানান, চুক্তিটি রোববার স্বাক্ষরিত হবে এবং হরমুজ প্রণালি ‘সবার জন্য উন্মুক্ত’ করা হবে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগে বলেন, সমঝোতা স্মারক রোববার স্বাক্ষরিত হবে না, যদিও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদ স্মারক আলোচনাধীন, যার মূল বিষয় যুদ্ধের অবসান। এখানে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে না।’
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার এক্সের পোস্টে জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে এবং এর পরই ইলেকট্রনিকভাবে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। পরবর্তী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এই ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।’
সম্ভাব্য চুক্তিতে কী আছে? : ট্রাম্প চুক্তি বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না। চুক্তির প্রথম ধাপ স্বাক্ষরিত হলে হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়া হবে বলে তিনি দাবি করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ ধ্বংস করবে বলেও উল্লেখ করেন।
আরাঘচির মতে, চুক্তির খসড়ায় ১৪টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার; সব ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধ, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত; বলপ্রয়োগ বা যুদ্ধ শুরু না করার প্রতিশ্রুতি। সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা। তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় ধাপে পারমাণবিক ইস্যু এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা হবে।
চুক্তির বিরোধপূর্ণ বিষয় : দশকের পর দশক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র না রাখে, না তৈরি করে এবং সে সক্ষমতাও অর্জন না করে। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে তারা প্রস্তুত থাকতে পারে।
ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোর একটি। এ চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও তেল রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ইরান চায় নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হোক, আর যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ও শর্ত সাপেক্ষে তা শিথিল করতে আগ্রহী।
তা ছাড়া বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদও বড় বিতর্কিত বিষয়। ইরান বলছে, যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য এ অর্থ প্রয়োজন। তবে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক ছাড় না পেলে সম্পদ মুক্ত করতে অনাগ্রহী।
চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয় রয়েছে। ইসরায়েলের লেবাননে বোমা বর্ষণ ও দখলদারিত্বও আলোচনার বড় বিষয়। ইরান চায়, শুধু নিজেদের নয়, মিত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও হামলা বন্ধ হোক।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে কী হবে: হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির প্রধান পথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে চলাচল করত। ইরান এই জলপথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং একে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আলোচনায় তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
চুক্তি বিষয়ে বিশ্বের প্রতিক্রিয়া: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির বিষয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট– উভয় দলের অনেক রাজনীতিকই চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আদাম স্কিফ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বলছেন– যুদ্ধ শেষ। আশা করি, এমনটাই হবে। কিন্তু এর আগেও আমরা এমন প্রতিশ্রুতি শুনেছি।’ অন্যদিকে সেথ মল্টন সম্ভাব্য চুক্তিকে ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ বলে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বলেছেন, যে কোনো চুক্তি যেন স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই চুক্তি ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে চলমান সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
