ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র 

চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা

চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
×

ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। ছবি: সংগৃহীত

বিবিসি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১২:৩৩

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কাঠামোগত শান্তিচুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের পর দুই দেশ একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছালেও কৌশলগত এই জলপথ পুরোপুরি নিরাপদ ও স্বাভাবিকভাবে খুলে যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে বাস্তবায়নের সময়সূচি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক পক্ষগুলোর অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়, যা পুরো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা বলা হলেও এটি কীভাবে এবং কত দ্রুত কার্যকর হবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চুক্তি সইয়ের পরই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ঘোষণা দিলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে না, বরং নিরাপত্তা ঝুঁকি, অবরোধ-পরবর্তী জট এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, শুক্রবার চুক্তি সইয়ের পর বিশ্ববাণিজ্যের জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে। যদিও আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘অবিলম্বে’ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করেছিলেন, চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষের সমঝোতার ঘোষণার পরপরই জলপথটি খুলে দেওয়া হতে পারে।

ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ববাজারে স্বস্তির হাওয়া বইছে, তেলের দাম কমেছে এবং শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। তিনি তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, 'তেল চলাচল শুরু হোক!' এবং এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘোষণার বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কারণ চুক্তির পূর্ণ বিস্তারিত এখনো প্রকাশ হয়নি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়নের সময়সূচি ও শর্তাবলি।

ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি জুর্চারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছালেও হরমুজ প্রণালি কখন পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে খুলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের কারণে আটকে থাকা জাহাজের জট, মাইন অপসারণ এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের মতো বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানযোগ্য নয়। এতে বোঝা যায়, কাগজে সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরতে আরও সময় লাগবে।

চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৬০ দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পর্ব শুরু হবে, যেখানে সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের ধাপ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা কাঠামো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না এবং এটি চুক্তির অংশ হিসেবে যাচাইযোগ্য হবে। তবে কীভাবে এই যাচাই হবে এবং ইরানের বর্তমান পারমাণবিক মজুত কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, চূড়ান্ত আলোচনা তখনই শুরু হবে যখন অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। এতে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি খুললেও তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণ স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরবে না। জাহাজ চলাচলের জট, বীমা সংক্রান্ত ঝুঁকি এবং সামরিক নিরাপত্তা যাচাইয়ের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।

সব মিলিয়ে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও বাস্তব প্রশ্ন এখন একটাই-হরমুজ প্রণালি কাগজে খুললেও বাস্তবে তা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে এবং সেই পথে কোন কোন শর্ত এখনো বাধা হয়ে থাকবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও পাল্টা জবাব দেয়। ফলে অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইরানের বন্দরগুলোতে জাহাজের আসা-যাওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

×