ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

প্রবীণের সম্মান ও নিরাপত্তা

প্রবীণের সম্মান ও নিরাপত্তা
×

গোলাম শওকত হোসেন

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১০:৫৭

আজ বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস। ২০০৬ সালের ১৫ জুন ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১১ সাল থেকে জাতিসংঘের অনুমোদনক্রমে বিশ্বব্যাপী প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস পালন শুরু হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মৌলিক স্তম্ভগুলো– গার্হস্থ্য সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০, যেখানে পারিবারিক পরিবেশে প্রবীণদের ওপর হিংসাত্মক শারীরিক, মানসিক, আর্থিক বা যৌন নিগ্রহ জাতীয় যে কোনো কাজ দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। তা ছাড়া পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সন্তানরা তাদের সাধ্যানুযায়ী পিতা-মাতার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার বাবস্থা করবে, নতুবা তা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। 

দিবসটি পালন উপলক্ষে ষাটের অধিক বয়সী প্রবীণরা কোনো কোনো দেশে বেগুনি রঙের পোশাক পরবেন বা ব্যাচ ধারণ করবেন। যে কোনো প্রকার বয়স বৈষম্য দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই এ বছরের প্রতিপাদ্য– ‘সাহসী হোন, সহজ অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে বার্ধক্যকে বরণ করুন’। 

১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে এক দল নিবেদিতপ্রাণ প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে সোচ্চার হয়ে একটি নেটওয়ার্ক গঠন করেন। পরবর্তী আট বছরে তা পাঁচটি বৈশ্বিক অঞ্চলজুড়ে ৬০০ সদস্য এবং ১৩২ জন আঞ্চলিক ও জাতীয় প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করেন। ২০০২ সালে মাদ্রিদ, ২০০৩ সালে নিউইয়র্ক, ২০০৭ সালে জেনেভা, ২০০৮ সালে অটোয়া, ২০০৯ সালে প্যারিস ও ২০১০ সালে টরন্টোতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নানা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, পাবলিকেশন ইত্যাদির পর প্রতিবছর ১৫ জুন বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস পালন শুরু হয়। এর লক্ষ্য ছিল ছয়টি– আইন প্রণয়ন, নীতিগত পদক্ষেপ, জনসচেতনতা, প্রবীণ শিক্ষা, বয়স বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সম্পদ সম্প্রসারণে শিক্ষা।  

যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক অপরাধী ডারন কেনালফরড এন্ডারসন ওকলাহোমাতে একজন প্রবীণ মহিলাকে ডাকাতি, অপহরণ ও ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তাকে ১১ হাজার ২৫০ বছরের কারাদণ্ড দেন। পরে তা সমন্বয় করা হয়, কিন্তু কারাগারেই তার অন্তিম শয্যা হয়। ঠিক তেমনিভাবে ববি জো লংকে ৪০১ বছরের কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেন।

প্রতিবছর প্রতি ছয়জনে একজন প্রবীণ কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত হন। তাদের ওপর সাধারণত পাঁচ ধরনের নির্যাতন হয়– মানসিক, আর্থিক, অবহেলা, শারীরিক ও যৌন। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে নির্যাতনের শিকার হন অনেক প্রবীণ। সেখানকার অপরাধ স্বীকার করে ৬৪%। কারণ প্রবীণদের মধ্যে আছে ডিমেনশিয়া। প্রবীণ নারী জনগোষ্ঠী ৮০ শতাংশের বেশি নির্যাতনের শিকার হন। নির্ভরশীল প্রবীণরাও নির্যাতিত হন। 

প্রবীণ নির্যাতন বর্তমান সমাজে একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। যে বাবা-মা বা গুরুজন তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে শ্রম ও সম্পদ উজাড় করে সন্তান তথা সমাজকে গড়ে তোলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারাই অনেক সময় চরম অবহেলা, নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের শিকার হন। আজকের তরুণ বা মধ্যবয়সী নাগরিকই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের প্রতি আজকের অবহেলা বা নির্যাতন আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে। প্রবীণদের শেষ জীবন যেন অবহেলা ও কান্নায় না কেটে সম্মান ও শান্তিতে কাটে, তা নিশ্চিত করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব।

সুতরাং ‘সাহসী হোন– সহজ অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে বার্ধক্যকে বরণ করুন’ এবং বিচ্ছিন্নতাকে ভেঙে ব্যক্তিগত ছোট ছোট ইগো বা অহংকার গুটিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে, যাতে সবাই জানে। বিটলসের সংগীতশিল্পী জন লেনন বলেছিলেন– ‘তোমার বয়স মাপো বয়স দিয়ে নয়, বন্ধুর সংখ্যা দিয়ে; তোমার জীবন মাপো কান্না দিয়ে নয়, হাসি দিয়ে।’

গোলাম শওকত হোসেন: চিকিৎসক, গবেষক ও লেখক

আরও পড়ুন

×