ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বাজেট

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে
×

আনু মুহাম্মদ

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১২:১০

সরকার বদলালেও আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বরাবরই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। এবারের বাজেটেও সেই ধারাবাহিকতা রয়েছে। শুধু আকার-আকৃতি নয়; দর্শন ও অগ্রাধিকারের দিক থেকেও ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। তবে বাজেট অতীতের চেয়ে বড় হওয়ায় অনেকে প্রশংসা করছেন; অনেকে প্রশ্নও করছেন। কিন্তু বাজেট তো ক্রমাগত বড় হওয়ারই কথা।কেননা, অর্থনীতির আকার বাড়ে, জিডিপি বাড়ে, জনসংখ্যা বাড়ে এবং বিভিন্ন চাহিদাও বাড়তে থাকে। সুতরাং বাজেটের আকার বড় হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজেটের আয়-ব্যয়ের খাতগুলো যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে কিনা। তার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা, তাও বিবেচনাযোগ্য। 

আমাদের বাজেটে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে জনপ্রশাসন– সরকারের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের বেতন-ভাতাই বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ খেয়ে ফেলে। এই খাতের ব্যয় এ সরকারও কমাতে পারেনি। তারপর আছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের খাত। সুদ খাত অন্য যে কোনো উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে বড় হওয়া আরেকটা উদ্বেগের বিষয়। উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সরকার বিস্তারিত জানায়নি। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত জনগণকে সবিস্তারে জানানো। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

আমরা শুনে থাকি, এসব খাতে অনেক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি অনুৎপাদনশীল, অপচয়মূলক, অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ ইত্যাদি চলে বিশেষ কিছু মানুষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। এসবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য জনগণের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরা দরকার। বিগত সরকারগুলো এটি কখনও করেনি। এ সরকারের কাছে থেকেও আমরা এ উদ্যোগ এখনও দেখিনি। আমরা বারবার এ দাবি জানিয়েছি। প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের অনুপাত আগের চেয়েও বেশি। 

সরকার কিছু পণ্য-দ্রব্যের দাম কমিয়েছে, যেটা ইতিবাচক। আমাদের এখানে কর বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে। পক্ষান্তরে কর কমলে দাম কমে না। এটা এখানকার নিয়ম। এবার বেশ কিছু জায়গায় কর কমানো হয়েছে। সেই জিনিসগুলোর দাম বাড়েনি, কমেওনি। একটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এই কর কমানোর উদ্যোগটা ভালো। অন্যদিকে করজাল এতই সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর বোঝাটা বাড়বে। পরোক্ষ করের অনুপাত বেশি হওয়ায় সীমিত কিংবা কম আয়ের মানুষের ওপর চাপটা এখনও বেশি। এখন পর্যন্ত যারা সম্পদশালী বা বিত্তশালী; যাদের ওপর করের ভার বেশি হওয়ার কথা, তাদের ওপর বরং করের পরিমাণ কমিয়েছে। ফলে করের বিন্যাসের মধ্য দিয়ে বৈষম্য চিহ্নিত করার পথটা তৈরি হয়নি। যাই হোক, বাজেটে অনেক সদিচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিটা এখনও অভিন্ন থাকার কারণে সদিচ্ছাগুলোর নিছক প্রতীকী মূল্য আছে; সেটাকে বাস্তবায়ন করতে গেলে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। 

অর্থনীতির নির্ধারক আমলা, ব্যবসায় গোষ্ঠী, বিশ্বব্যাংক, এডিপি– এরা অভিন্ন থাকার কারণে আমাদের জনস্বার্থে পরিবর্তনটা আনা যায় না। সরকার যতক্ষণ স্বাধীনভাবে চিন্তা না করতে পারবে; স্বাধীনভাবে সক্ষমতা অর্জন না করবে, ততক্ষণ সদিচ্ছা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। 

বাজেট বক্তৃতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম এতদিন পরে শুল্কমুক্ত করা হয়েছে। এগুলো ভালো। কিন্তু নীতি, চুক্তি ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বড় আকারে পুরোনো মডেলই পুষ্ট করা হচ্ছে। গত সরকারের সময় জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানিমুখী, বিদেশি ঋণনির্ভর, প্রাণবিনাশী, বিদেশি কোম্পানি নির্দেশিত নীতিমালা দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পঙ্গু করা হয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকার সেই ধারাতেই চলছে। জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের পথে না গিয়ে বিদেশি কোম্পানি নির্দেশিত উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি মডেল অনুসরণ করছে। এলএনজি আমদানিতে চুক্তি করে যাচ্ছে। বাজেটের আগেই জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করেছে কোনো তথ্য বা যুক্তি না মেনে। 

মুদ্রাস্ফীতি ও প্রয়োজন বিবেচনায় তা সামান্য হলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কিছু বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ধাপে ধাপে তা আরও বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশ করা হবে। এটা ভালো।

প্রাথমিক স্কুলে সংগীত, ছবি আঁকা ইত্যাদি যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটাও ভালো উদ্যোগ। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের টাকায় কেনাকাটা এবং প্রদর্শনমুখী প্রবণতা এখনও দেখা যাচ্ছে। অগ্রাধিকার বিবেচনায় আরও জরুরি কাজ ছিল। যেমন শিক্ষকদের সবাইকে ট্যাব দেওয়ার কর্মসূচিতে ভালো কেনাকাটা হবে ঠিকই; তার আগে দরকার ছিল বহু ভাঙাচোরা স্কুল মেরামত; অসংখ্য শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ; বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা; বিজ্ঞান গবেষণাগার, পাঠাগার, খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক পুনর্গঠন অপরিহার্য, যার কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে প্রাথমিক থেকে সব পর্যায়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্প্রসারণ করে উচ্চমানে সর্বজন (বা পাবলিক) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ ঘটানো। এর কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। 

বাজেট বক্তৃতায় সৃজনশীল খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, জ্ঞান বিস্তার বিষয়ে বেশ গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য রাখা হয়েছে। এটা ভালো। কিন্তু যদি ছাত্রলীগ বা গত কিছুদিনের ‘মব’-এর মতোই সরকারি দলের বাহুবল দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে থাকে; পাঠাগারে কী বই থাকবে তা ঠিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব যদি সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল নেয়; যদি সাংস্কৃতিক জগৎ দলীয় আধিপত্য দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে কী পরিবর্তন হবে?

আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ

আরও পড়ুন

×