বন্যথেরিয়াম: প্রাণ প্রকৃতি ভাবনার অনন্য উপস্থাপন
‘বন্যথেরিয়াম’ নাটকের দৃশ্য
কামাল আরিফ
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৭:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
হুঁকোমুখো হ্যাংলা বাড়ি তার বাংলা মুখে তার হাসি নাই দেখেছো? আয়রে ভোলা খেয়াল খোলা স্বপনদোলা নাচিয়ে আয়/ ঠাস ঠাস দ্রম দ্রাম শুনে লাগে খটকা/ ফুল ফোটে? তাই বল, আমি ভাবি পটকা/ ভয় পেওনা ভয় পেওনা তোমার আমি মারবো না/সত্যি বলছি, কুস্তি করে তোমার সঙ্গে পারবো না।
আমাদের কৈশোর রাঙিয়ে দেওয়া সুকুমার রায়ের মজার মজার ছড়া-কবিতাগুলোর সঙ্গে হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরির মঞ্চ উপস্থাপন হয় পরিবেশ সচেতনতা ও রাজনৈতিক স্যাটায়ারের আবহে। বটতলা নাট্যদলের প্রযোজনায় এই প্রজন্মের শিশুরা ছাড়াও সব বয়সী দর্শক নাটক দেখে ঋদ্ধ হয়েছেন। বটতলার নাটক ‘বন্যথেরিয়াম’ এ উপলক্ষ তৈরি করে দেয় মহিলা সমিতি মিলনায়তনে পহেলা মে পরপর দুটি শো করে। এ নাটকের গল্পে দেখা যাবে, প্রাণিবিজ্ঞান সংস্থা ওয়াইল্ড ভিশন এক অদ্ভুত প্রজাতির ট্যাঁশ গরুর সন্ধান পায়। এরপর সেটিকে ধরে নিয়ে আসা হয় কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হারুর নির্দেশে। এমন অদ্ভুত আর বিরল বন্যপ্রাণীর সন্ধান ওয়াইল্ড ভিশনকে এনে দেয় খ্যাতি। খবর পেয়ে ছুটে আসে বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ী মিস হুক্কি। সে আরও ট্যাঁশ গরুর সন্ধান চায়।
এরই মধ্যে আরও অদ্ভুত বন্যপ্রাণী আর প্রকৃতির সন্ধান নিয়ে আসে বিখ্যাত গবেষক প্রফেসর হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ভাগনে চন্দ্রখাই। তার কাছে প্রফেসর হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের অদ্ভুত অভিযানের কাহিনি শুনে হারু আর মিস হুক্কি রোমাঞ্চিত হতে থাকে। নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হচ্ছে ভেবে উৎফুল্ল হয়। তখন তারা অক্সিজেন, খাদ্যচক্র আর পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভুলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সবুজ প্রকৃতিকে ধূসর করে মুনাফা লাভের। চন্দ্রখাইও গল্পের ছলে পৌঁছাতে থাকে তাঁর চূড়ান্ত উদ্দেশ্যে।
আমাদের দেশে শিশুদের জন্য নির্মল সাংস্কৃতিক বিনোদনের সত্যিই অভাব রয়েছে। সুকুমার রায় শিশুতোষ আনন্দ জগতে অন্যতম সাহিত্য আশ্রয়।
নাট্যমঞ্চে নাটকটি উপস্থাপনের আগে হলরুমে প্রবেশ করেই বন ও বন্যপ্রাণীর বিচিত্র ও প্রায় বাস্তব একটি অনুভূতি পায় দর্শকরা, শিশুদের জন্য এটি বাড়তি আনন্দ। দু একজন শিশুকে সত্যি সত্যি ভয়ংকর প্রাণী ভেবে ভয় পেতেও দেখেছি। বিচিত্র সব প্রাণী, বিচিত্র সব নাম, বিচিত্র সব কস্টিউম। আচ্ছা, অন্যসব বন্যপ্রাণীর নামকরণেও কি মানুষের এমনই অভিযান, নামকরণের ঘটনাপ্রবাহ রয়েছে? হাতি, হরিণ, বাঘ, সিংহ, জিরাফ, গন্ডার কত সহজ সহজ নাম। হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরিতে পায় বিচিত্র সব প্রাণীদের উপস্থিতি–হিংস্রথেরিয়াম, গোমড়াথেরিয়াম, ল্যাংড়াথেরিয়াম, চিল্লানোসরাস, বেচারাথেরিয়াম। দর্শক সারিতে শিশুদের বেশ ভালোভাবেই একাত্ম হতে দেখেছি। শিশু কল্পনার জগতে ভিন্ন রকম আনন্দ তৈরি করেছে। এখনকার শিশুরা সাধারণত এসব বিষয় স্ক্রিনে দেখে অভ্যস্ত। প্রচলিত অভ্যস্ততার বাইরে শিশু মনোজগত ও নিউরনে নতুন আনন্দ জমা হলো নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কস্টিউম ও সেট ডিজাইনে জঙ্গলময় আবহ বেশ ভালো লেগেছে।
নাটকটির রাজনৈতিক স্যাটায়ার উপস্থাপনে আরও ভাবনাচিন্তা ও যত্নের সুযোগ ছিল। একটি বিশেষ সময়ে হয়তো মিস্টার হারু চরিত্রটির নাট্যকৌতুকময় উপস্থাপনের বিশেষ আবেদন ছিল, সময় ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে চরিত্র উপস্থাপনে বৈচিত্র্য আনন্দে ব্যঙ্গবিদ্রুপের ধার আরও তীব্র ও প্রাসঙ্গিক মনে হতো। যদিও রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও ব্যবসায়িক স্বার্থকেন্দ্রিক বাস্তবতায় মিস্টার হারু চরিত্রটির প্রাসঙ্গিকতা কখনও অস্ত যায় না।
বলতে দ্বিধা নেই, বটতলার অন্যসব প্রযোজনার (খনা, ক্রাচের কর্নেল, মার্ক্স ইন সোহো, সখী রঙ্গমালা) তুলনায় এই নাটকে যত্নের আরও সুযোগ রয়েছে বলে দর্শক হিসেবে মনে করি। বাদ্যযন্ত্র ও কণ্ঠে ঠিকঠাক লাগলেও আলোক পরিকল্পনায় জঙ্গলময় আবহ তৈরিতে আরও যত্ন আশা করছি।
নাটকটি সার্বিকভাবে শিশুশিল্পীদের দ্বারা উপস্থাপনে অধিক মনোগ্রাহী হবে বলে ধারণা করছি। সম্ভবত বটতলার শিশু শিল্পীদের দ্বারা পরিবেশিতও হয়েছে, আমার অবশ্য দেখা হয়নি।
‘বন্যথেরিয়াম’ নাটকটি নিয়ে নির্দেশক ইভান রিয়াজ বলেন, ‘সুকুমার রায় এই রচনায় তৈরি করেছেন ঘোরলাগা কাল্পনিক এক জগৎ, জীববৈচিত্র্যসহ অদ্ভুত সব চরিত্র। প্রাণ প্রকৃতি নিয়ে একটি গল্প উপস্থাপনেরই প্রয়াস হেঁসোরামের হুঁশিয়ারের ডায়েরি থেকে তৈরি হলো নতুন এক গল্প।’
বন্যথেরিয়ামে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাহবুব মাসুম, মোহাম্মদ আলী হায়দার, সুমিত তেওয়ারি রানা, আশরাফুল ইসলাম অশ্রু, লায়কা বশীর, তৌফিক হাসান ভূঁইয়া, হাফিজা আক্তার ঝুমা, জেঈরান জুহী, লোচন পলাশ, সবুজ সরকার, আফনান রহমান, অন্তু চন্দ্র নাথ, ফিরোজ শেখ ও মনিরা খাতুন সৃষ্টি।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ২৭ আগস্ট যাত্রা শুরু করে ‘বটতলা’। এই দীর্ঘ সময়ে দলটি মঞ্চে এনেছে ‘ক্রাচের কর্নেল’, ‘সখী রঙ্গমালা’, ‘খনা’, ‘রাইজ অ্যান্ড শাইন’, ‘সোহোতে মার্ক্স’, ‘বন্যথেরিয়াম’, ‘জতুগৃহ’সহ অনেক আলোচিত নাটক।
- বিষয় :
- বিনোদন
