রইদের আলোয়...
নাজিফা তুষি ছবি :: রফিকুল ইসলাম রাফ
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঈদের সিনেমার ভিড়ে ‘রইদ’ যেন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া এক আলো। সেই আলোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন নাজিফা তুষি। সিনেমাটি মুক্তির পর দর্শকের কাছে ‘সাধুর বউ’ হিসেবেই যেন পরিচিতি মিলছে তাঁর। সিনেমাটি দেখার পর তুষির নাম ভুলে গিয়ে তাঁকে চরিত্রটির নামেই চিনতে শুরু করেছেন দর্শক। একজন অভিনেত্রীর জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! এমন প্রাপ্তিতে তুষিও উচ্ছ্বসিত। বললেন, ‘আমার পরিশ্রম সার্থক। দর্শকের এই ভালোবাসা পেতেই তো আমাদের সকল চেষ্টা।’
মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ মুক্তির পর সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে প্রেক্ষাগৃহের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে তুষির অভিনয়ের প্রসঙ্গ। দর্শকের পাশাপাশি নির্মাতা, অভিনেতা ও সমালোচকরাও তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা করছেন। তবে এই সাফল্যকে একক অর্জন হিসেবে দেখতে নারাজ তুষি। তাঁর বিশ্বাস, ‘রইদ’ আসলে একটি সম্মিলিত শ্রমের ফসল।
সিনেমাটি প্রথমবার প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের সঙ্গে বসে দেখার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর জন্য আবেগের। পর্দায় দৃশ্যগুলো চলছিল আর তাঁর মনে ভেসে উঠছিল শুটিংয়ের দিনগুলোর স্মৃতি। কখনও কাদা, কখনও রোদ, কখনও দূর গ্রামের নির্জনতায় শুটিংয়ের কর্মযজ্ঞ–সবকিছু যেন আবার ফিরে এসেছিল। দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখে তখন মনে হয়েছে, দীর্ঘ সেই যাত্রার কষ্ট সার্থক।
চরিত্রের জন্য বদলে যায় জীবনযাপন
‘রইদ’-এ তুষির চরিত্রটি শুধু অভিনয়ের চ্যালেঞ্জ ছিল না, ছিল জীবনযাপনেরও পরিবর্তন। শহুরে চেহারা ও অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে তৈরি হতে হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার জন্য। প্রায় ছয় মাস তিনি সাবান, শ্যাম্পু কিংবা প্রসাধনী ব্যবহার করেননি। ত্বকের স্বাভাবিক দাগ, রোদে পোড়া ছাপ কিংবা জীবনের ক্লান্তি যেন মুখে স্পষ্ট ফুটে ওঠে, সেই চেষ্টাই ছিল। চরিত্রের প্রয়োজনে নিয়মিত পান খেয়েছেন, ব্যবহার করেছেন চুন। এমনকি গায়ের রং আরও রুক্ষ ও পোড়া দেখাতে সরিষার তেল মেখে রোদে সময় কাটিয়েছেন। তাঁর মতে, বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল চরিত্রটির ভেতরে প্রবেশ করা। একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারীর অনুভূতি, নিঃসঙ্গতা আর নীরব যন্ত্রণা বুঝে ওঠাটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ।
পাগলিকে খুঁজেছেন বাস্তব জীবনে
চরিত্রের প্রস্তুতির সময় তুষি শুধু চিত্রনাট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। রাস্তাঘাটে ঘুরে বাস্তবের মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের হাঁটাচলা, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ–সবকিছু বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর উপলব্ধি ছিল, বাইরে থেকে যাদের আমরা সহজে ‘পাগল’ বলে ডাকি, তাদের জীবন আসলে অনেক জটিল। সেই জটিলতার সামান্য অংশও ধারণ করতে পারা একজন অভিনেতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
‘রইদ’ সিনেমার জন্য তৈরি হওয়া বাড়িটি শুধু সেট ছিল না, ছিল শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক শিল্পকর্ম। পরিচালক যে আস্ত একটি গ্রামই বানিয়ে ফেলেছিলেন। সেই গ্রামের অংশ হয়ে উঠতে তুষি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মাঠে কাজ করেছেন, গাছ লাগিয়েছেন, মাটি কেটেছেন, টিলায় উঠেছেন। শুটিংয়ের আগে ব্যবহৃত পুরোনো কাপড় সংগ্রহ করে সেগুলো পরতেন, যাতে পোশাকও চরিত্রের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
এই পুরো প্রক্রিয়া তাঁকে শহরের পরিচিত জীবন থেকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই–পর্দায় যেন তাঁকে অভিনেত্রী নয়, ওই অঞ্চলের একজন সাধারণ নারী বলে মনে হয়।
হাওয়ার পর আরও কঠিন পরীক্ষা
নাজিফা তুষির ক্যারিয়ারে ‘হাওয়া’ একটি মাইলফলক। কিন্তু তাঁর নিজের মূল্যায়নে ‘রইদ’ ছিল আরও কঠিন। কারণ ‘হাওয়া’র চরিত্রে রহস্য ছিল, শক্তি ছিল। ‘রইদ’-এর নারী চরিত্রটি ভেঙে পড়া, নিঃসঙ্গ এবং অনেকটাই নীরব। সেই নীরবতার ভেতর অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া সহজ কাজ নয়। তাই হাওয়ার জার্নির পর রইদের জার্নি তুষির জন্য ছিল চাপেরও। এই চাপ থেকেই দীর্ঘ প্রস্তুতি নেওয়ার তাড়না ছিল। সেই তাড়না থেকেই তুষি যেন পরীক্ষায় দশে দশ পেয়ে সফল হয়ে উঠলেন।
সুমনের পরিচালনায় অন্যরকম অভিজ্ঞতা
মেজবাউর রহমান সুমনের সঙ্গে এটি তুষির দ্বিতীয় কাজ। অভিনেত্রীর ভাষায়, সুমনের কাজের ধরন অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি অভিনেতাকে চরিত্রের মধ্যে ঠেলে দেন না, বরং এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে চরিত্র নিজে থেকেই জন্ম নেয়। এই স্বাধীনতাই অভিনয়কে আরও স্বাভাবিক করে তোলে। তাই ‘রইদ’-এর চরিত্রগুলোকে কখনও অভিনীত মনে হয় না, বরং বাস্তব জীবনের মানুষ বলে মনে হয়।
অন্য এক পরিচয়
মজার ব্যাপার হলো, সিনেমায় তুষির চরিত্রটির কোনো নাম নেই। পুরো গল্পে তিনি পরিচিত ‘সাধুর বউ’ হিসেবে। নাম না থাকাটাই যেন চরিত্রটির শক্তি হয়ে উঠেছে। এখন দর্শক যখন তুষিকে ‘সাধুর বউ’ বলে ডাকেন, তখন সেটিকে তিনি নিজের অভিনয়-জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন। তাঁর কাছে এই ভালোবাসা কোনো পুরস্কারের চেয়ে কম নয়। ‘রইদ’-এ শুধু অভিনয় নয়, কণ্ঠও দিয়েছেন তুষি। ‘পাগলির প্রেম জ্বালা’ গানটি ইতোমধ্যে দর্শকের মধ্যে আলাদা সাড়া ফেলেছে। অভিনয়ের বাইরে গানের জগতে তাঁর এই উপস্থিতি অনেকের জন্যই ছিল চমক। প্রথমে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও গানটি প্রকাশের পর দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তাঁকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
সামনে নতুন পথ
‘রইদ’-এর সাফল্যের মধ্যেই নতুন কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে তুষির। রবিউল আলম রবির ‘সুরাইয়া’, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের সিরিজ ‘অ্যানি’র পাশাপাশি ‘আন্ধার’, ‘সখী রঙ্গমালা’সহ একাধিক কাজ অপেক্ষায় রয়েছে মুক্তির। তবু এই মুহূর্তে তাঁর মন পড়ে আছে ‘রইদ’-এর দর্শকের কাছেই। কারণ আন্তর্জাতিক উৎসব বা বিদেশি
স্বীকৃতির চেয়ে দেশের মানুষের ভালোবাসাকেই তিনি সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন। সেই ভালোবাসাই হয়তো প্রমাণ করে, ‘রইদ’-এর আলো শুধু পর্দায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে দর্শকের মনেও।
- বিষয় :
- বিনোদন
