ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শতক সন্ধ্যা

‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শতক সন্ধ্যা
×

এথিক থিয়েটারের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ নাটকের দৃশ্য

নন্দন প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সময় বদলেছে, বদলেছে নাটকের মঞ্চও। ঢাকায় একসময় মহিলা সমিতির মঞ্চ ছিল নাট্যচর্চার প্রধান ঠিকানা। পাশাপাশি গাইড হাউস মঞ্চেও নাটক হতো। এখন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে রয়েছে ছোট-বড় তিনটি মঞ্চ। অথচ শুক্র ও শনিবারের ছুটির দিন বাদে শিল্পকলায় দর্শক পাওয়া অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। তাই বলে নাটকের চর্চা কমে গেছে, তা নয়। শুধু ঢাকা মহানগরীতে সক্রিয় রয়েছে ৬৫টি নাট্য সংগঠন। সারাদেশে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানভুক্ত নাট্যদলের সংখ্যা প্রায় ৩০০। একটি নাটকের দল চালানো কতটা কঠিন, তা সংশ্লিষ্টরা জানেন। শহরের সংকট এক রকম, মফস্বলের আরেক রকম। তবু সেই প্রতিকূলতা পেরিয়ে নাট্যদলগুলো এগিয়ে চলছে। এমন বাস্তবতায় একটি নাটকের শততম মঞ্চায়ন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ‘হাঁড়ি ফাটিবে’কে শততম প্রদর্শনীতে পৌঁছাতে পেরোতে হয়েছে ১৬ বছর। এথিকের প্রথম প্রযোজনা ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র মূল সুর দেশ ও সমাজের অনিষ্টকারী মানুষদের মুখোশ উন্মোচন। বাইরে থেকে যাদের ভালো মানুষ মনে হয়, তাদের কেউ কেউ ভেতরে নীতিহীন ও স্বার্থপর। নাটকটি তাদের থেকে দূরে থাকার বার্তা দেয়। তবে সেই দূরে থাকা বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং সুন্দর ও কল্যাণের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান। 
নাটকটির শুরুর নির্দেশক ছিলেন নাট্যকার ও নির্দেশক অপু শহীদ। পরে সময়ের প্রয়োজনে নতুন আঙ্গিকে নির্দেশনার দায়িত্ব নেন মিন্টু সরদার। নাটকে মোট ১১টি চরিত্র। মাঝি চরিত্রটি নির্দেশকের সৃষ্টি। সব মিলিয়ে ১২টি চরিত্রে এ পর্যন্ত অভিনয় করেছেন ৫১ জন শিল্পী। শম্ভু চরিত্রে পথিক পলাশ, রাতুল মীর, এনামুল মীর, আজিম উদ্দিন ও নাহিদ মুন্না; বিকাশ মুখার্জি চরিত্রে হাসান রিজভী, ইমতিয়াজ আসাদ ও অপু শহীদ; সুলোচনা দেবী চরিত্রে ভাবনা হাসান, নীলা আহমেদ, আফসা পারভিন, উম্মে হাবিবা মায়া, নূর সাবা, হাসনে আরা ডালিয়া ও আফনান অপ্সরা; সদাশীব রায় চরিত্রে প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ও মনি কাঞ্চন; জগন্ময় লাহিড়ী চরিত্রে রবিউল হাসান রুবেল, মনিরুল হক ঝলক ও তারেক চৌধুরী রিমন; রেবা জোয়ার্দার চরিত্রে দেবী বিশ্বাস, লীজু আহমেদ, শ্রাবণ ইসলাম প্রীতিকা, শাপলা খাতুন, রূপা ইমতিয়াজ, হাসনে আরা ডালিয়া, সুমনা সোমা, রওনক বিশাকা শ্যামলী, আফনান অপ্সরা, উর্মি আহমেদ ও দীপান্বিতা রায়। এই চরিত্রে সর্বোচ্চ ১১ জন অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন। জ্ঞানেন্দ্র নাথ, পুলিশ অফিসার ও সেপাই চরিত্রেও একাধিক শিল্পী অভিনয় করেছেন। তবে চিত্তব্রত চরিত্রে সুকর্ণ হাসান এবং কালিকিংকর চরিত্রে মিন্টু সরদার নাটকের সব প্রদর্শনীতে অভিনয় করেছেন। 
শতক সন্ধ্যায় দর্শকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। টিকিট না পেয়ে অনেক দর্শক ফিরে গেছেন। পরিবার নিয়ে নাটক দেখতে আসা দর্শকের অনেকেই বলেছেন, ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র মতো মঞ্চসফল নাটক আরও বেশি মঞ্চস্থ হওয়া দরকার। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও নাটকটির প্রদর্শনী হওয়া উচিত। শতক সন্ধ্যার অতিথি ছিলেন নাট্যজন আবুল হায়াত ও রামেন্দু মজুমদার। ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ শতক সন্ধ্যার আয়োজনটি উপস্থাপনা করেন এথিক সভাপতি রেজানুর রহমান। 
আয়োজন উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় মঞ্চনাটক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাবনার কথা বলেছেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। তাঁর মতে, মঞ্চনাটকের দর্শক একেবারে হারিয়ে যায়নি; বরং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর্শককে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন। চ্যানেল আইয়ের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আইস্ক্রিনে দেশের ৫০টিরও বেশি মঞ্চনাটক ধারণ করে প্রকাশ করা হলেও দর্শকের আগ্রহ সেভাবে পাওয়া যায়নি। কেন মঞ্চনাটকের দর্শক কমছে, এ নিয়ে গবেষণারও প্রয়োজন রয়েছে। ফরিদুর রেজা সাগরের মতে, দর্শক ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন আধুনিক কনটেন্ট ও উপস্থাপনা। মঞ্চের ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, লাকী ইনামসহ অনেকে কাজ করে যাচ্ছেন। জামিল আহমেদ ঈদের ছুটিতে মঞ্চনাটকের আয়োজন করে নতুন ভাবনারও জন্ম দিয়েছেন। একসময় বগুড়া ও ঢাকায় ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চে নিয়মিত নাটক হতো। এখন ঢাকার মঞ্চটির অস্তিত্ব নেই, বগুড়ারটিও পরিত্যক্ত। এগুলো পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি স্টুডিও থিয়েটারের বাইরে উঠোন থিয়েটার, ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদ বা লনেও নাটক আয়োজন করা যেতে পারে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজনও শুরু করা প্রয়োজন। ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়ন তাই শুধু একটি নাটকের সাফল্যের গল্প নয়; এটি মঞ্চনাটকের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। যারা বলেন, মঞ্চের দর্শক কমে গেছে, তারা পুরোপুরি সঠিক নন। যুগের প্রয়োজনে মঞ্চনাটকেরও বদল প্রয়োজন। কাহিনি বাছাই, কনটেন্ট ও উপস্থাপনায় আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটাতে পারলে দর্শক আবারও মঞ্চে ফিরবে। পথ কঠিন, তবে সম্মিলিত উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অসম্ভব নয়। মঞ্চনাটকের জয় হোক। 

আরও পড়ুন

×