স্মরণ
মানবতার শিল্পী ফকির আলমগীর
গণসঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর
সুরাইয়া আলমগীর
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৫ | ০৫:৪৭
গণনায়ক, মানবতার গায়ক, মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর গণশিল্পী ফকির আলমগীরের প্রয়াণ দিবস আজ। চার বছর আগে ২০২১ সালের এই দিনে পরিবার-পরিজন, ভক্ত-শ্রোতাকে কাঁদিয়ে, অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বলতে গেলে হঠাৎ করেই চলে যান না ফেরার দেশে। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। তখন করোনার বিস্তার ছিল ভয়াবহ। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশেই এর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে ছিল মহামারি আকারে। সারাদেশে চলছিল লকডাউন। সেই পরিস্থিতিতেও ফকির আলমগীর লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে। ভার্চুয়ালি যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন লাইভ প্রোগ্রামে। চিরতরুণ, চিরসবুজ এই শিল্পীকে ক্লান্তি কখনও পরাভূত করতে দেখিনি। দীর্ঘ ৪৪ বছর তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছি। দেখেছি এক সত্যবাদী, শুদ্ধতা, সততার এক মানুষের স্বরূপ। সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুম থেকে গান কণ্ঠে তুলে নেমেছেন রাজপথে। ফকির আলমগীর জাতশিল্পী– দ্রোহে নজরুল, দেশাত্মবোধে জীবনানন্দ দাশ, প্রেমে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় চে গুয়েভারা। পল্লিনির্ভর বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলে সেই সংস্কৃতির শরীরে ও মর্মে লেগে আছে লোকায়ত গান।
ফকির আলমগীর লোকায়ত গানকে সমৃদ্ধ করেছেন। মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন, সংগ্রামের আবেগ তিনি স্পর্শ করার চেষ্টা করেছেন। লোকজীবনকেন্দ্রিক বাঙালি সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে ধারণ করা শত শত সখিনা, শব মেহেরদের দুঃখভরা বেদনার জীবনের আর্তি মানুষের মনে এক বেদনার আবহ সৃষ্টি করেছে।
জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁকে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়েছে। স্বপ্নচারী, স্বপ্নদ্রষ্টা এ মানুষ জীবনযুদ্ধে হয়েছেন জয়ী, সফলকাম। এই গণশিল্পীর জন্ম হয়েছিল ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ফরিদপুরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এক নির্জন পল্লি কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। ফকির আলমগীর ছোটবেলা থেকেই হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন যাপিত জীবনের পথ বড় দুর্গম, কণ্টকময়। তাঁকে এ দুস্তর পথ পাড়ি দিতেই হবে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর মনমানসিকতা নিয়ে। কালা মৃধা গোবিন্দ হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে মায়ের মমতা মাখা আঁচল ছেড়ে চলে আসেন ইট-পাথরের নগরী ঢাকা শহরে। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। ভর্তি হন ঐতিহাসিক জগন্নাথ কলেজে। পল্টনের সেই বাঁশি বিক্রেতা হ্যাজাক বাতির আলোয় বাঁশির মনোমুগ্ধকর সুর তাঁকে আকৃষ্ট করে। গ্রামের ছেলে ফকির আলমগীর বাঁশির সুরে আকৃষ্ট হন, তুলে নেন হাতে বাঁশের বাঁশরী। পরিবেশ-পরিস্থিতি তাঁকে শিল্পী হওয়ার মন্ত্রণা জুগিয়েছে।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সঙ্গে সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স করেন। চাকরি নেন বাংলাদেশ কেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনে। গেয়েছেন গণসংগীত, গণযোগাযোগে করেছেন পড়াশোনা, চাকরি করেছেন গণসংযোগে। এই গণমানুষের শিল্পী সাধারণ মানুষের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন তাঁর সৃজনশীলতায়। তুমি কি আবার আসিবে, বই প্রকাশের তাগিদ নিয়ে ছুটবে বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রাণের স্পন্দনে। তাঁর অপেক্ষায় লিখেছিলাম। লিখতে গিয়ে অঝোর ধারায় জল নেমে এসেছিল।
ফকির আলমগীর একজন সুবক্তা, একজন সফল লেখক, একজন গীতিকার, একজন সুরকার। তাঁর গাওয়া প্রায় সব গান তিনিই লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন। একজন সফল সংগঠকও বটে। ১৯৭৬ সালে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন প্রগতিশীল গণসংগীত, এর দল ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সব গণসংগীতের দল নিয়ে গঠন করেছেন ‘গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ’। ফকির আলমগীর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলা একাডেমির ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য ও পল্লীমা সংসদের আজীবন সদস্য। প্রায় পঁচিশটি বই লিখেছেন। লিখেছেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘আমার কথা’। এ ছাড়াও তাঁর গাওয়া গণসংগীত নিয়ে ‘ফকির আলমগীরের কণ্ঠের গান’ বই প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করেছেন, নামাজের ব্যাপারেও সচেষ্ট ছিলেন। নিরলস সংগ্রামী গুণী মানুষটিকে ক্লান্তি কখনও পরাভূত করতে দেখিনি। ২০২১ সালে করোনায় আক্রান্ত হলে যখন হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল তখনও নিবন্ধ লিখছিলেন পত্রিকায় দেওয়ার জন্য। একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর লিখছিলেন। পবিত্র হজব্রত উপলক্ষে গবেষণাধর্মী বই ‘ইহরাম থেকে আরাফাত’ মৃত্যুর ১০ দিন আগে অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।
যাপিত ও পারিবারিক জীবনে শিল্পী সুখী ছিলেন। তিন পুত্র রানা, রাজীব, রাহুলকে আদর্শ শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে তুলেছেন; তিন নাতি উজান, ফারদিন, ফারহান; দুই নাতনি উজমা ও ফারিন; দুই বৌমা লিটা ও তানিয়াকে নিয়ে এক সুখের সংসার পেছনে রেখে শিল্পী চলে যান না ফেরার দেশে আজকের এই দিনে। ৩০ বছর সফলতার সঙ্গে বাংলাদেশ কেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনে চাকরির পর ২০০৭ সালে জিএম হিসেবে অবসর নেন। জীবনে রাষ্ট্রীয় পদক, একুশে পদক, মওলানা ভাসানী পদক, জসীম উদ্দীন পদক, তর্কবাগীশ পদক ছাড়াও দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন। সবচেয়ে বড় তিনি এত সব পুরস্কার ছাপিয়ে তাবৎ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন।
গণমানুষের শিল্পী ফকির আলমগীর। সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ভূপেন হাজারিকা, আব্দুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুতফর রহমান, নিজাম-উল-হক, সাধন দাস, কামাল লোহানীর মতো ব্যক্তিত্বের সাহচর্য তাঁর জীবনকে বর্ণিল করেছে। কবি শামসুর রাহমান ফকির আলমগীরকে ভালোবেসে কবিতায় ভালোবাসার শব্দে শব্দে যে শংসাবচন উচ্চারিত করেছিলেন, তা উদ্ধৃত করলাম– ‘যে জীবন বেদেনীর শরীরের মতো, নদীর বাঁকের, যে জীবন বাউলের উদাসীন- আলখাল্লা প্রায় হুহু প্রান্তরের মতো। যে জীবন জোৎস্নাময় পাহাড়ি পথের। তারই ধ্বনি, প্রতিধ্বনি বাজে তাঁর সতেজ কণ্ঠে। কী কীর্ত্তন কী মাইজভাণ্ডারী, আশ্চর্য ফুল হয়ে ঝরে যায় তাঁর স্পন্দিত সত্তা থেকে।’
আজ ফকির আলমগীরের চতুর্থ প্রয়াণ দিবসে আমার একান্ত চাওয়া মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।
বেগম সুরাইয়া আলমগীর: ফকির আলমগীরের সহধর্মিণী ও সভাপতি, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী
- বিষয় :
- ফকির আলমগীর
- শিল্পী
- মৃত্যুবার্ষিকী
