ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার : সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী

চাপের মুখে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী স্থগিত বিচ্ছিন্ন ঘটনা

চাপের মুখে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী স্থগিত বিচ্ছিন্ন ঘটনা
×

আলোকচিত্র : সমকাল

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে মাগুরা-২ আসন থেকে নির্বাচিত নিতাই রায় চৌধুরী নতুন সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর আগে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি মন্ত্রীর মর্যাদায় মাগুরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালে তিনি যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২ জুন মন্ত্রণালয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সমকাল: দেশের সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে সরকার কোন ধরনের কাজ করছে? 

নিতাই রায় চৌধুরী: দীর্ঘদিন ধরে আমরা জনগণের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করে এসেছি। দেশে গণতান্ত্রিক মানের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে– এ প্রত্যাশায় আমাদের অনেক নেতাকর্মীর অসীম আত্মত্যাগ রয়েছে। আমাদের হাজার হাজার মানুষকে গুম-খুন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরীক্ষার খাতায় লিখুক আর না লিখুক, সবাইকে ৯৮ শতাংশ পাস করাতে হবে– এমন সিদ্ধান্ত ছিল। এভাবে ধ্বংস হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। এ দেশের সংস্কৃতির জায়গা দখল করেছে জীবনবিমুখ, সংগ্রামবিমুখ শৃঙ্গার রসাত্মক অপসংস্কৃতি। সারাদেশে মাদকের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ক্ষমতাসীনরা যুবসমাজকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। ওটাকে আমরা তমসাচ্ছন্ন যুগ বলতে চাই। এ সময়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, বিচার ব্যবস্থা, আইন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সব ভেঙে তছনছ করা হয়েছে। 

সমকাল: সেই অন্ধকার সময় থেকে বের হতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

নিতাই রায় চৌধুরী: এই পরিস্থিতিতে এক পর্যায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটে গেল। এই যে গণঅভ্যুত্থানের ফলে দেশের সব মানুষ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছেলেমেয়ে পথে নেমে এলো; এক পর্যায়ে অনেকের অমূল্য জীবন গেল– তাদের ওপর অনেক রকম নির্যাতন হয়েছে। অতএব, জুলাই অভ্যুত্থানের গভীরতা, ব্যাপকতা অনেক। সংস্কৃতি, শিক্ষা, মূল্যবোধ– এসবই উপরিকাঠামোগত ব্যাপার। মূল হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। একটা দেশের অর্থনীতি নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট সমাজের সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি কেমন হবে। নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবনা শুধু সংস্কৃতি না। দেখুন, দেশের লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাট হয়েছে। সেই অর্থনীতির জায়গা পুনরুদ্ধার এখন চ্যালেঞ্জ। 

সমকাল: সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ হওয়া অর্থই ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। হাজার হাজার পুঁথি, নথি, দলিল পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন আর্কাইভে। সংরক্ষণ, পাঠোদ্ধার এবং প্রদর্শনের জন্য কী উদ্যোগ?

নিতাই রায় চৌধুরী: আপনি বললেন, আমাদের পুঁথি নষ্ট হচ্ছে। এ জন্য আমাদের আর্কাইভস এবং গ্রন্থাগার ডিপার্টমেন্ট আছে। এটা এক ধরনের সংগ্রহশালা। এটা লাইব্রেরির মতো। এ অঞ্চলের সভ্যতা হাজার বছরের। কৃষি সভ্যতা এখানে বিকাশ লাভ করেছে। শিলালিপি ছিল, তাম্রলিপি ছিল। খনার বচন, চর্যাপদ, অশোকের সময়ের তাম্রলিপি, মৌর্য যুগের ইতিহাস ছিল। যতদূর সম্ভব হয় এসব আমাদের সংগ্রহশালায় রাখব। তবে এই ভাবনা সব সরকারের সময় এক রকম ছিল না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এটি উপলব্ধি করে এই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় শুরু করেন। সংস্কৃতি জাতির আত্মা। একটা দেশ, সমাজ ও জাতিকে চেনা যায় তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে। আমি যে অর্থনীতির কথা বললাম, এর সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক কী, এটা বুঝতে হবে।

সমকাল: সেই সম্পর্কটা কী?

নিতাই রায় চৌধুরী: কিছু লোকের ধারণা, সংস্কৃতি মানে শুধু গান-বাজনা, নাটক, যাত্রা, থিয়েটার করা। আসলে সংস্কৃতি তা না। এখানে প্রত্নতত্ত্বের একটা ডিপার্টমেন্ট আছে। সেখানে যত পুরাকীর্তি আছে, আমরা খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করছি। আমরা প্রত্নতত্ত্ব গ্যালারি করছি। সম্প্রতি আমরা যশোরের পাবলিক লাইব্রেরি দেখতে গেলাম। সেখানে দেখলাম তালপাতার পুঁথি। সেখানে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। সেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম করতে চাই, যাতে অনলাইনে সার্চ করে সব পাওয়া যায়। লাইব্রেরি শুধু বই না; একটা অমূল্য সম্পদ; এর যে জীবনপ্রবাহ আছে, সেটাকে আমরা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছি, যাতে ছেলেমেয়ে আবার লাইব্রেরিতে যায়। আবার সব জেলায় শিল্পকলা একাডেমি আছে। আমরা উপজেলায় শিল্পকলাকে নিয়ে যাব।
এ দেশে ৯৫ শতাংশ লোক এক সময় কৃষক ছিল; গ্রামে বসবাস করত। ফরিদপুরের রেকর্ড রুম অনেক পুরোনো। সেখানে ফরিদপুরসহ আশপাশ অঞ্চলের সব তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। সেই ফরিদপুরে একসময় খানবাহাদুর, রায়বাহাদুর, বড় বড় জমিদার ছিলেন। কিন্তু চারপাশে ছিল কৃষক আর কৃষক। এই কৃষকদের জীবন নিয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠছে; নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে; যেমন– মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ থেকে জসীম উদ্‌দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। এসব কৃষি সংস্কৃতি, নদী সংস্কৃতিকে তুলে আনা, রক্ষার চেষ্টা করছি আমরা।  

সমকাল: বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসি। দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিনের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ তুলে ধরা হচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ সময়ে উল্লেখযোগ্য কী কাজ করেছে?

নিতাই রায় চৌধুরী: আমাদের এই মন্ত্রণালয় সর্বব্যাপী। সর্বত্র এর যাতায়াত। এর সীমা-পরিসীমা নেই। ৪৪টি দেশের সঙ্গে আমাদের কালচারাল ডিপ্লোমেসির সম্পর্ক। সেটি আরও বেড়ে যাচ্ছে। এবার বোধহয় ৮০টি দেশের সঙ্গে হবে। এই দেশগুলোতে আমাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শুরু করেছি। এটা নতুন পদক্ষেপ। আগেও ছিল, তবে আমরা এটাকে ব্যাপক করতে চাচ্ছি। আধুনিক ভাবনা হচ্ছে, কীভাবে একটা দেশের সঙ্গে আরেকটা দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করা গেলে সেখান থেকে নতুন কিছুর জন্ম হবে। 
আমাদের সম্পদ তো কম নেই। জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, কাইয়ুম চৌধুরীর মতো শিল্পী এ দেশে জন্মেছেন। আমাদের যাত্রা, নাটক, হাসন রাজার গান, লালনের গান, শাহ আবদুল করিমের গান, মরমি গান-কীর্তনের সবই নতুন করে রিভাইভ করে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করে দিয়েছি। 

সমকাল: এসব সাংস্কৃতিক চর্চা একটা ধারাবাহিকতা। আপনারা কীভাবে নতুন করে জোর দিচ্ছেন?

নিতাই রায় চৌধুরী: ইতোমধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিলে আমরা যৌথ কার্যক্রম শুরু করেছি। এরই মধ্যে আমাদের কমিটি গঠন হয়েছে, মিটিং করছি। দেখুন, সংস্কৃতি ব্যাপারটাই অ্যাবস্ট্রাক্ট। এর কোনো কংক্রিট রূপ নেই। আমরা প্রতিটি জেলায় ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছি। এক বছরব্যাপী নজরুলের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব। তা করতে গিয়ে উপজেলা পর্যায়েও মেলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজনের উদ্যোগ নিচ্ছি। বছরব্যাপী নজরুলের সৃষ্টির সবকিছুকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। 

সমকাল: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কট্টর বিরোধিতা ও হুমকির মুখে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থগিত হয়েছে। প্রদর্শনী হবে কিনা, এই সিদ্ধান্ত কি চাপের মুখে নেওয়ার? এটা আমাদের কী বার্তা দেয়?

নিতাই রায় চৌধুরী: এটা কোথায় হয়েছে, আমি ঠিক জানি না। চাপের মুখে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী স্থগিত হলে সেটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা সংস্কৃতিচর্চাকে থামিয়ে দিতে পারবে না। এই যে ঘটনাগুলো, এসব আশ্রয়-প্রশ্রয়ের মধ্য দিয়ে নানাভাবে চলে আসছে। সেগুলোকে মিনিমাইজ করা হয়নি। মাজারে হামলার মতো ঘটনাগুলো ফৌজদারি অপরাধ। তবে এসব যে সর্বব্যাপী ঘটনা, তা নয়। ঘটনাটা যদি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তাহলে আইন এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ইতোপূর্বে যেখানে যে ঘটনা ঘটছে, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমি একদিন যশোর বা মাগুরা থেকে আসছিলাম। তখন জানতে পারলাম, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি ঘটনা ঘটেছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে ডিসির কাছে খোঁজ নিয়েছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। এখান থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

সমকাল: ঘটনার পরে খবর নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এমন মব যেন না হয়, সে জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কী? বাউল-ফকিরের ওপর হামলার ঘটনা দেশে অব্যাহত রয়েছে। 

নিতাই রায় চৌধুরী: সেটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলাম আপনাকে। আমাদের দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ কারণে এ জিনিসগুলো তৈরি হয়েছে। এক দিনে তো হয় না। এখন ধরেন, মশায় ঘর ভরে গেছে। হাতে তালি দিয়ে তো মশা মারা যায় না। শুধু ওষুধ ছিটিয়েও মারা যায় না। মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে। যে অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে গেছে, তার পেছনে একটা আচরণ, ব্যবহার এবং তারও পেছনে দীর্ঘদিনের পরিস্থিতি, অভ্যাস কাজ করে। যেমন আপনি আমার সঙ্গে সাংবাদিকসুলভ আচরণ করছেন। আপনার প্রশ্ন, দৃষ্টি সবকিছু সাংবাদিকসুলভ। এই ব্যবহারের পেছনে আবার একটি আচরণ কাজ করে। সেই আচরণের পেছনে কাজ করে একটা সিস্টেম অব বিলিভ। এটাই নিয়ম। আজকে আমাদের দেশে যারা এমন আচরণ করছে, তাদের শিকড়টা এই সমাজেই। আমরা সেসব প্রতিহত করতে ব্যাপক কর্মসূচিতে হাত দিয়েছি।

সমকাল: সেই কর্মসূচি কেমন? দেশে কি নিরাপদ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ আছে?

নিতাই রায় চৌধুরী: তিন মাসে এই সরকার যে কাজ করেছে, অতীতে কোনো সরকার তিন বছরেও এত কাজ করতে পারেনি। আমাদের নির্বাচনের প্রতিটি অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পূরণের চেষ্টায় এগিয়ে চলেছি। আমরা অর্থনৈতিক জায়গাটা মজবুত করতে চেষ্টা করছি। কীভাবে মানুষকে স্বনির্ভর করা যায়, সে জন্য কাজ চলছে। সংস্কৃতির জায়গায় আসি। স্বনির্ভরতার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আবার আশা জাগছে। এর মধ্য দিয়ে আবার তারা শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উৎফুল্ল হয়ে উঠছে। মাদকাসক্তি, জুয়া খেলা প্রতিহত করতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে এবং অপরাধ করলে যাতে অপরাধীর শাস্তি হয়, এসব আমরা নিশ্চিত করে চলেছি। তারেক রহমানের সরকার ব্যর্থ হতে আসেনি। আমরা সফল হতে এসেছি। 

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নিতাই রায় চৌধুরী: আপনাকে ও সমকালকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

×