তাপপ্রবাহে অতিষ্ঠ জনজীবন
দিনাজপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি
কাজের ফাঁকে পানিতে মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন গরমে ক্লান্ত রিকশাচালক। ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ১২:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকাসহ দেশের ৪১টি জেলার ওপর দিয়ে গতকাল বুধবার মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। জ্যৈষ্ঠের শেষভাগে এসে তীব্র রোদ, গরম বাতাস ও ভ্যাপসা আবহাওয়ায় জনজীবন অতিষ্ঠ। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিক, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিকসহ খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, আজ বৃহস্পতিবারও তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। আগামীকাল শুক্রবার থেকে বৃষ্টিপাত বাড়লে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলাসহ রাজশাহী বিভাগের আটটি, রংপুর বিভাগের আটটি এবং খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হামিদ মিয়া বলেন, আজ বৃহস্পতিবারও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও বৃষ্টিপাত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে গরম কমবে না। তবে আগামীকাল শুক্রবার নাগাদ তাপপ্রবাহের বিস্তার কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজধানীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে উচ্চ আর্দ্রতার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা ছিল আরও বেশি। সকাল থেকেই রোদের তেজ এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় নগরবাসী চরম অস্বস্তিতে ছিলেন। মোহাম্মদপুরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বাংলামটর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন বেসরকারি চাকরিজীবী আশা মুনতাহা। তিনি বলেন, গরমের কারণে বাসে ওঠার সাহস পাইনি। অটোরিকশায় কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়েও স্বস্তি পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দুপুরের পর সড়কে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা গেছে। ফুটপাতের দোকানি, রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিকদের অনেকে একটু স্বস্তি পেতে ছায়াময় স্থানে আশ্রয় নেন।
গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুরে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ৩৮ ডিগ্রি এবং নাটোরের লালপুরে ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ জামিনুর রহমান বলেন, কয়েক দিন ধরেই জেলার তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাতাসে আর্দ্রতার ওঠানামার কারণে ভ্যাপসা গরম আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার থেকে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেককে বারবার গাছের ছায়া বা ঠান্ডা স্থানে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে।
নাটোরের লালপুরে বুধবার মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে মঙ্গলবার ছিল ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং সোমবার ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক নাজমুল হক বলেন, ঈশ্বরদী ও লালপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আপাতত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ থাকায় তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুপুরের দিকে বাইরে বের হলেই গরম বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগে। পাত্রে রাখা পানিও দ্রুত গরম হয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
এদিকে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে একটি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।
সাধারণত জুন মাসে দেশে গড় বৃষ্টিপাত হয় ৪৫৯ মিলিমিটার, যা বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় জুলাই মাসে, গড়ে ৫২৩ মিলিমিটার। তবে চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, বিশেষ করে এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টি হয়। ওই সময়ের অতিবৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য শুধু এল নিনোকে দায়ী করা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, সবুজায়ন কমে যাওয়া, বায়ুদূষণ এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক পরিবর্তন– সব মিলিয়েই গরমের তীব্রতা। তিনি বলেন, এল নিনোর সময় দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং আকাশ দীর্ঘ সময় পরিষ্কার থাকে। ফলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূমিতে পৌঁছে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তবে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহকে শুধু এল নিনো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। দীর্ঘ মেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা দেশের গড়ের তুলনায় আরও দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী তিন মাসে দেশজুড়ে ৮ থেকে ১০টি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই তিন থেকে চারটি তাপপ্রবাহ হতে পারে।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, এল নিনোর প্রভাবে এ বছরের বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে এবং তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। তবে আগামী মাসগুলোতে তাপমাত্রা কতটা বাড়বে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য তাপজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। তারা দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা সানগ্লাস ব্যবহার, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান, ডাবের পানি ও লেবুর শরবত গ্রহণ এবং শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে জুন মাসজুড়ে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা ও লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি]
