প্রতিবেশী
জেনজিরা বরং ভেতর থেকেই ব্যবস্থাটা বদলে দিক
শশী থারুর
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রিয় জেনজি ভারতীয় বন্ধুরা, যারা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপিতে যোগ দিয়েছ, তাদের উদ্দেশে বলছি। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি– সংবাদ শিরোনাম, পরীক্ষা কেন্দ্রের খবর এবং সামাজিক মাধ্যমে ছেয়ে যাওয়া রাখঢাকহীন মন্তব্যের দিকে তাকালে তোমাদের প্রজন্মের তীব্র হতাশা অনায়াসে অনুভব করা যায়।
১৬ মে অভিজিৎ দীপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’তে যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে একটি পোস্ট করেন। মাত্র পাঁচ দিন পরই তাঁর ইনস্টাগ্রামে যুক্ত হয় দুই কোটি ফলোয়ার। তাঁর এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনটি জেনজি এবং আপনার মতো অন্যদের মন জয় করেছে, যারা আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ঘাটতি এবং আপনাদের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। ইনস্টাগ্রাম হলো আপনাদের গণচত্বর, কিন্তু এটি কোনো ব্যালট বাক্স নয়।
আপনাদের মধ্যে যারা দিশেহারা, ক্রুদ্ধ এবং মোহগ্রস্ত নন, তাদের কষ্ট আমরা বুঝতে পারছি। আপনাদের ক্ষোভের কারণও বোঝা যায়। আপনারা যে কারণে সিজেপিতে নাম লিখিয়েছিলেন, সেই কারণগুলো যথার্থ। যখন আপনি একটি স্বপ্ন অর্জনের প্রস্তুতির জন্য জীবনের বহু বছর উৎসর্গ করেন; ঘুম, সামাজিক মাধ্যম এবং মানসিক সুস্থতা বিসর্জন দেন, তখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং ব্যবস্থার ব্যর্থতার খবর শুধু একটি শিরোনাম নয়। এটি আপনার সময়, প্রচেষ্টা এবং আপনার ভবিষ্যতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
হতাশায় শিক্ষার্থীদের জীবন হারানোর মর্মান্তিক খবরটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়– এই ‘পচা ব্যবস্থা’ কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা নয়। এর বাস্তব ও মানবিক পরিণতি রয়েছে, যা আমাদের সমাজের মূলে আঘাত করে। কিন্তু আপনার হতাশা প্রকাশের মাধ্যমকে সমস্যার সমাধান বলে ভুল করবেন না। এতে বিপদ রয়েছে।
সিজেপির মতো আন্দোলনের উত্থান হৃদয়বিদারক হলেও তা শক্তিশালী রাজনৈতিক মঞ্চেরই অংশ। এর মধ্য দিয়ে এমন এক তীব্র অনুভূতির প্রকাশ ঘটে, যার সৃষ্টি হয় সিস্টেম বা ব্যবস্থার দ্বারা নিজেকে বর্জ্যে পরিণত করার ফলস্বরূপ। এ ব্যবস্থা সাধারণ নাগরিকদের সংগ্রামের প্রতি উদাসীন বলে মনে হয়।
বেকারত্বের চরম বোঝা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং মানসম্মত শিক্ষার পথ সংকুচিত হয়ে আসার মতো সমস্যায় জর্জরিত আপনাদের জন্য এটিই নিরাপদ জায়গা বলে মনে হয়। কিন্তু মানসিক মুক্তির জন্য এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা এবং সংহতি খুঁজে পাওয়া দরকারি হলেও সেখানেই থেমে যাওয়ার একটি বিপদ রয়েছে। ইতিহাস আমাদের দেখায়– ক্রোধ আগুন জ্বালাতে পারলেও একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার জন্য স্থির নেতৃত্ব এবং একটি সুস্পষ্ট কৌশল প্রয়োজন। শুধু ইনস্টাগ্রাম দিয়ে তা হয় না।
আপনি যদি শুধু ক্ষণস্থায়ী মনোযোগের চেয়ে বেশি কিছু চান, তবে আপনাকে এই শক্তিকে এমন কিছুতে চালিত করতে হবে, যা প্রচলিত ব্যবস্থাকে দুর্বল হতে বাধ্য করে। এ কারণে যে ব্যবস্থাটি আপনাকে ব্যর্থ করেছে বলে মনে হয়, তার মধ্যে থেকেই কাজ করা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে সেটিকে আপনার প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী করে তোলাই হলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আমি আপনাদের বলতে চাই, আপনারা আপনাদের প্রতিনিধিদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারেন। এই ব্যবস্থা একচেটিয়া কোনো একক সত্তা নয়। এটি এমন সব মানুষ দ্বারা গঠিত, যারা অন্তত তাত্ত্বিক দিক থেকে হলেও আপনাদের কাছে দায়বদ্ধ। আপনাদের স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদদের কার্যালয়ে সুসংগঠিত অভিযোগ নিয়ে হাজির হোন এবং কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করার জন্য তাদের কাছে দাবি তুলুন। পরীক্ষা পরিচালনা এবং নিয়োগ কোটার বিষয়ে স্বচ্ছতার দাবি জানাতে আরটিআই (তথ্য অধিকার) আইন ব্যবহার করুন। যখন যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে জবাব চায়, তখন নীরবতা একটি রাজনৈতিক দায় হয়ে সামনে আসে।
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী; দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- প্রতিবেশী
