ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

প্রতিবেশী

ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ কতদূর গড়াতে পারে 

ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ কতদূর গড়াতে পারে 
×

ভারতে সোমবারের সিজেপির এই বিক্ষোভ বিগত বহু বছরের মধ্যে সরকারবিরোধী সবচেয়ে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়

হান্না এলিস-পিটারসন

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ২০:২৬


ককরোচ জনতা পার্টি (সিজিপি) অনলাইনে কৌতুক হিসেবে যার সূচনা ঘটেছিল, তাই ভারতের লাখ লাখ ক্ষুব্ধ তরুণ-তরুণীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। এই তরুণদের ওপর ভর করে এটি অল্প সময়ে নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী ডানপন্থি সরকারের জন্য সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

সিজেপি যেসব ইস্যুতে লড়াই করছে
সিজেপি সমর্থকদের ডাক দেওয়া শুরু করে এবং দলটির প্রতিষ্ঠাতা দীপকে এই আন্দোলন ভারতের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর অন্যতম প্রধান সমস্যার ঘিরে গড়ে তোলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, যা বারবার সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাছে বিক্রি হয়ে আসছে।
সফল হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর প্রবল মানসিক চাপ থাকে। মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার আসনের জন্য লড়েন ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। পরিবারগুলো সর্বস্ব হারিয়ে এবং বিপুল ঋণের জালে জড়িয়ে সন্তানদের ‘নিট’ নামে পরিচিত এই কঠিন পরীক্ষার কোচিং করায়। এমনকি বর্তমানে ভারত সরকার উচ্চশিক্ষায় যে বাজেট দেয়, তার চেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয় এই প্রাইভেট টিউশনে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি ধারাবাহিক চক্রের কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে বারবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সঙ্গে জড়িত ডজন ডজন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তাছাড়া শুধু নিট পরীক্ষা নয়, অন্য আরও অনেক পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। এই পরীক্ষার জালিয়াতির দায় না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। সিজেপি এই ইস্যুতে সমর্থকদের একজোট করতে শুরু করে এবং প্রশ্ন ফাঁসের জন্য সরকারকে জবাবদিহি করার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলে।

সিজিপি প্রথম কবে রাজপথে নামে?
এবার সিজেপি সমর্থকরা দিল্লিতে তাদের দ্বিতীয় বড় ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা পণ করে যে, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত মাঠ ছাড়বে না। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন লাদাখের বিশিষ্ট প্রকৌশলী ও শিক্ষা সংস্কারপন্থি সোনম ওয়াংচুক। গত বছর সরকার তার কর্মকাণ্ডের জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করেছিল। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ওয়াংচুক অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে অনশনের ঘোষণা দেন। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি কিছুই গ্রহণ করবেন না বলে ঘোষণা দেন। 
বিক্ষোভ এবং ওয়াংচুকের অনশন চলতে থাকায় বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বিরোধীদলীয় নেতা তাদের দেখতে যান। কিন্তু মোদি সরকার সিজেপি বা ওয়াংচুকের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসেননি, উল্টো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তাদের ‘সন্ত্রাসীদের বি-টিম’ বলে উড়িয়ে দেন।

সোনম ওয়াংচুক যেভাবে সমর্থন আদায় করেছেন
অনশনের দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হলেও ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এতে সরকার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ১৮ দিন পর দিল্লির আদালত প্রতিদিন তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দেয়। অনশনের ২০তম দিনে, অর্থাৎ রোববার ভোরের দিকে দিল্লি পুলিশ এসে জোরপূর্বক ওয়াংচুককে তুলে নিয়ে যায় এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে। এ নিয়ে সারাদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। পুলিশ দাবি করে যে তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই এটি করা হয়েছে, তবে ওয়াংচুকের স্ত্রী এটাকে ‘বেআইনি আটক’ হিসেবে আখ্যা দেন। হাসপাতালের বিছানা থেকেই ওয়াংচুক সিজেপির সমর্থকদের সোমবার সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করার এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে ডাক দেন। 

সোমবারের আন্দোলন কতটা বিশাল ছিল?
সোমবারের সিজেপির এই বিক্ষোভ বিগত বহু বছরের মধ্যে সরকারবিরোধী সবচেয়ে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়। সকাল থেকেই হাজার হাজার বিক্ষোভকারী মধ্য দিল্লির রাজপথে জড়ো হতে শুরু করেন এবং রাতভর সেখানে অবস্থান নেওয়া শত শত মানুষের সঙ্গে যোগ দেন। জনতার সিংহভাগই ছিল শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের, প্রশ্ন ফাঁসে ক্ষতিগ্রস্ত বহু শিক্ষার্থীর অভিভাবকরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করার অনুমতি দেয়নি। শহরের বিভিন্ন সড়ক ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আন্দোলনকারীদের সংসদ ভবন থেকে প্রায় এক মাইল দূরে ঘিরে রাখা হয়। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ আসতে থাকেন এবং বিকেলের আগেই সেখানে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের জমায়েত ঘটে।
জনতা যখন জোর করে সংসদের দিকে এগোনোর চেষ্টা করে, তখন পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসসহ সহিংস দমনপীড়ন চালায়। এতে সিজেপি নেতা ও বিরোধী রাজনীতিকরা ক্ষুব্ধ হন। সংঘর্ষে আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য উভয়ই আহত হন। দীপকে পুলিশের এই আক্রমণকে ‘অত্যন্ত নির্মম’ বলে তীব্র নিন্দা জানান।

এরপর কী হবে?
সিজেপির এই আন্দোলনকে এতদিন ধরে উপেক্ষা করার পর, অবশেষে সোমবার সকালে মোদি সরকার এক বৈঠকের প্রস্তাব দেয়। ১০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত সেই আলোচনায় সিজেপির পক্ষ থেকে তিনটি দাবি তুলে ধরা হলেও দলটির মুখপাত্র জানান যে সরকার ‘কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি’।
এই আন্দোলনের ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। সোমবারের শেষদিকে পুলিশ দিল্লির ওই প্রতিবাদ শিবির খালি করার চেষ্টা করলেও দীপকে জোর দিয়ে বলেছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা সরবে না। সামাজিক মাধ্যম এক্স পোস্টে দলটির পক্ষ থেকে লেখা হয় যে, ‘আমাদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শেষ হচ্ছে না!’

হান্না এলিস-পিটারসন: গার্ডিয়ানের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×