ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধে চিত্রকলার প্রসার জরুরি

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধে চিত্রকলার প্রসার জরুরি
×

শেখ হাফিজুর রহমান সজল

শেখ হাফিজুর রহমান সজল

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫ | ১৭:৫৩

‘শিল্পকলা আত্মা থেকে দৈনন্দিন জীবনের সব ধুলো ধুয়ে দেয়’- পাবলো পিকাসোর এই অমর বাণীটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কারু ও চারুকলা মানসিক প্রশান্তি, মানবতাবাদ, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সাংস্কৃতিক উন্নতি, টেকসই উন্নয়ন, সাম্য ও জাতীয় ঐক্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই আবেগ, অনুভূতি, সৃষ্টিশীলতা, মুক্তচিন্তা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মত প্রকাশ, অতীত ঐতিহ্য ও গৌরবগাঁথা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে মানুষ চিত্রকলাকে ব্যবহার করে আসছে। কালে কালে এই ভাব প্রকাশের ধারায় বদল এসেছে, অভিনব পন্থা ও নান্দনিকতার ছোঁয়াও এসেছে। আধুনিক কালে একটি দেশ কতটা সভ্য, মানবিক ও উন্নত সেটা অন্যান্য মাপকাঠির পাশাপাশি চারুকলা ও শিল্প কলার ওপর নির্ভর করে। এ ছাড়া বিশ্ব হ্যাপিনেস ইনডেক্সের দশটি স্থিতিমাপের মধ্যে ষষ্ঠ পরিমাপক হিসেবে ‘শিক্ষা, শিল্পকলা ও সংস্কৃতি’ প্রসারকে ধরা হয়। সে বিবেচনায় আমাদের দেশে চারুকলা, চিত্রকলা ও শিল্পকলাকে আমরা সেই অর্থে সার্বজনীন করতে পারিনি। 

কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয় আর রাজধানীকেন্দ্রিক চিত্রকলা চর্চা সীমাবদ্ধ আছে বলেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রসার দেশব্যাপী করা সম্ভব হয়নি; যা সত্যি হতাশাজনক। এছাড়া শুধু শিল্প-সংস্কৃতির জন্য নয় বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞাপন শিল্প, গণমাধ্যম, নাটক, চলচ্চিত্র শিল্প, হোটেল ব্যবস্থাপনা, প্রচ্ছদ শিল্প, ডিজাইনিং, স্থাপত্যকলাসহ অন্যান্য খাতেও চারু ও কারু শিল্পীদের চাকরির সুযোগ আগের চেয়ে দিন দিন বাড়ছে। সর্বোপরি, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন ও বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে শিল্পকলা, চারু ও কারুকলা চর্চা, বিকাশ ও প্রসারে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

১. প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অংকন ও চিত্রায়ণ, ভাস্কর্য, ছাপচিত্র, কারুশিল্প, পেইন্টিং, মৃৎশিল্প, গ্রাফিক্স শেখার জন্য হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া দেশে আর কোন প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। চারু ও কারুকলা চর্চা একটি ধারাবাহিক বিষয় হলেও উচ্চশিক্ষা ছাড়া আমাদের দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। সুতরাং সম্ভব হলে সবগুলো সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে কারু ও চারুকলা নিয়ে আলাদাভাবে বিষয় খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এই চর্চাকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায় সে বিষয়ে নতুন নতুন কোর্স চালু করা যেতে পারে। 

২. সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিজ্ঞাপন শিল্পে, গ্রাফিক্স, পেইন্ট মেকিং, ছাপচিত্র বিভাগের উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের উপযোগী পাঠ্যক্রম ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। দক্ষ ও পেশাদার কিউরটর তৈরি ও শিল্পকর্ম যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশু উদ্যোগী হওয়া উচিত। 

৩. বিশ্বমানের চিত্রকর্ম তৈরি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচারের জন্য দেশের বিভিন্ন শহর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজন  এবং একই সঙ্গে বিদেশে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারি আর্থিক সহয়তার পাশাপাশি বেসরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মিশনগুলোকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরদিকে, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ছবি পাঠানোর ক্ষেত্রে শুল্ক বিভাগকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। 

৪. মানসম্মত গ্যালারির অভাব চিত্রকলার প্রসারে অন্যতম প্রধান বাঁধা হিসেবেই মনে করা হয়। দেশের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদ থাকলেও অধিকাংশেই সর্বসাধারণের প্রদর্শনীর জন্য আলাদা কোন গ্যালারি নেই। চারুকলা অনুষদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বরাদ্দকৃত সামান্য বাজেট দিয়ে আলাদা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়নুল গ্যালারি ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জাদুঘরগুলো ছাড়া রাজধানীতে সরকারি কোন আর্ট গ্যালারি নেই। আবার রাজধানীর বাইরে অন্য বড় শহরগুলোতে বেসরকারি আর্ট গ্যালারির মাধ্যমে প্রদর্শনীর সুযোগ নেই। বেসরকারি আর্ট গ্যালারির প্রদর্শনীতে ছবি বিক্রির অর্থ সিংহভাগই গ্যালারির মালিকরা রেখে দেন বলে শোনা যায়। এতে চিত্রকররা ছবি প্রদর্শনীতে নিরুৎসাহিত হন। তাই কারু, চারুকলার বিকাশ ও বিশ্বমানের চিত্রকর তৈরিতে সরকারিভাবে গ্যালারি নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। 

৫. প্রতিটি জেলার শিল্পকলা ভবন প্রাঙ্গণে স্থায়ীভাবে চারুকলা প্রদর্শনীর জন্য পৃথক গ্যালারির ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি সব জাতীয় দিবসসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান উদযাপনের সময় চিত্রকলা প্রদর্শনী বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিলে তৃণমূল পর্যায়েও কারু ও চারুকলা চর্চার প্রসার ঘটবে।  

৬. কারু ও চারুকলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারিভাবে গ্যালারি নির্মাণ আবশ্যক। এ বিষয়ে সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে নির্ধারিত একটি ফ্লোর প্রদর্শনীর উপযোগী করে নির্মাণ করতে গণপূর্ত ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। তাছাড়া, সিনেপ্লেক্স, অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে গ্যালারির ব্যবস্থা করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করা উচিত। এ ছাড়া, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন এয়ারপোর্ট বা স্টেশনগুলোতে স্থায়ী গ্যালারি জন্য নির্ধারিত জায়গা সংরক্ষণ করতে পারে। এখানে মনে রাখা উচিত, চিত্রকলা ও শিল্প-সংস্কৃতির উন্নয়ন ছাড়া শুধু ইট পাথরের অট্টালিকা দিয়ে একটি মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

সর্বোপরি, বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে ক্রমবর্ধমান বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে দেশীয় কারু ও চারুকলার বিকাশ ও প্রসারে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। পরবর্তী প্রজন্মের সামনে ও বিশ্বের বুকে আমাদের কারু ও চারুশিল্পকে তুলে ধরতে চিত্রকলা সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্মিলিতভাবে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

(লেখক: উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়)

আরও পড়ুন

×