দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
রাশিয়ায় ভূমিকম্প-সুনামি এবং আমাদের প্রস্তুতি
এম. এ. হালিম
এম. এ. হালিম
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৬
সম্প্রতি রাশিয়ায় ৮.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা দুই মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়। রাশিয়ার ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই, জাপানসহ ১৫টি দেশে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। এর মধ্যে জাপানের হোক্কাইডো ও তোকাচি বন্দরে সুনামি আঘাত হানে। প্রসঙ্গত, সমুদ্রের কোনো অংশজুড়ে হঠাৎ স্থানচ্যুতি ঘটলে সুনামি সৃষ্টি হয়। এ ধরনের স্থানচ্যুতির অন্যতম কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠে ভূমিকম্প। যার ফলে সমুদ্রের পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং উপকূলের দিকে ঢেউ আকারে ধেয়ে আসে। প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, রাশিয়ায় ভূমিকম্প ও সুনামিতে ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়নি। বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতি জানতে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে, তবে তা কোনোভাবেই পূর্ব এশীয় ভূমিকম্প ও সুনামির মতো ব্যাপক হবে না, বলা যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত দুর্যোগ-পরবর্তী মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার ধারায় সুনামির পর ইন্দোনেশিয়ায় অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দুর্গতদের জন্য মানবিক সেবায় এগিয়ে আসে। তবে সমস্যা দেখা দেয় দুই সহস্রাধিক সংস্থার কার্যক্রমে সুষ্ঠু সমন্বয় সাধনে। কারণ এ ধরনের বড় দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সব সংস্থাই ‘অতি মানবিক’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় সমন্বয়হীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে তৎপর থাকে। ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের চাহিদা ও প্রয়োজনের চেয়ে বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব অগ্রাধিকার বেশি গুরুত্ব পায়। উল্লেখ্য, সমন্বয়হীনতার এ চিত্র আমাদের দেশেও বিদ্যমান, যা ২০২৫-এ ফেনীর বন্যায় ত্রাণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়নের সময় দেখা গেছে। আমাদের এসওডিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনা-পরবর্তী কার্যক্রমে কিছুটা হলেও সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশ সুনামি ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। মনে আছে, ইন্দোনেশিয়ায় সুনামির সময় আমি হাতিয়ায় অবস্থানকালে ভোরে রেড ক্রিসেন্ট কমপ্লেক্সের পুকুরে শীতের শান্ত সকালে হঠাৎ ঢেউ দেখতে পেয়েছি। এর পরপরই জেনেছিলাম ভূমিকম্পের সংবাদ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের জন্যও সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। সুতরাং আমাদের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সুনামি প্রস্তুতি বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রসঙ্গত, সুনামি থেকে বাঁচতে প্রয়োজন ভূমিকম্পের পরই উঁচু স্থান বা পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া। ইন্দোনেশিয়া থাকতে পূর্বপূরুষদের অভিজ্ঞতাকে (ইনডিজিনিয়াস নলেজ) কাজে লাগিয়ে কীভাবে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সিমোলুতে শূন্য মৃত্যু (জিরো ক্যাজুয়ালটি) ঘটেছে, তা শুনেছি। দ্বীপের অধিবাসীরা পূর্বপূরুষদের কাছ থেকে জেনেছিলেন, কোনো এলাকায় ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রপাড়ের পানি হঠাৎ অনেক গভীরে নেমে গেলে সুনামি ঘটে। ২৬ ডিসেম্বর এলাকার জেলে ও সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারীরা সকালে পানি অনেক গভীরে সরে যেতে দেখে দ্রুত গ্রামবাসীকে পাহাড়ে উঠতে প্রচার করে। ফলে ২০ মিনিট পরে সংঘটিত সুনামিতে সম্পদের ক্ষতি হলেও সে দ্বীপে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে। ভারতীয় ও বার্মা প্লেটের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকায় বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘটিত ঘন ঘন ছোট ও মাঝারি শক্তিমাত্রার ভূমিকম্প এ আশঙ্কাকে ঘনীভূত করে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৫৪টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ২০২৫ সালে এ পর্যন্ত ১২টি ছোট মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। সর্বশেষ সম্প্রতি দেড় ঘণ্টার মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পোর্টব্লেয়ারের অদূরে (আন্দামান) স্বল্পমাত্রার (৪.৬ থেকে ৫) ৪টি ভূমিকম্প হয়েছে বলে জানা গেছে, যা সুনামি আকারে বাংলাদেশসহ উপকূলে আঘাত হানার সমূহ আশঙ্কা ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় তাৎক্ষণিক দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হবে। সাবেক এক রাজউক চেয়ারম্যান বলেছেন, ঢাকায় ৯৬ শতাংশ ভবনই নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত। সারাদেশে বিল্ডিং কোডসহ নিয়ম না মানায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভবন ধ্বংস ছাড়াও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হবে– নিশ্চিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি বড় ভূমিকম্পের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হয় কম-বেশি ১০০ বছর। ১৮৯৭ সালে এ অঞ্চলে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল, যা আসাম ভূমিকম্প হিসেবে পরিচিত। এ বিবেচনায় বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের বার্তা গত শতকের ৯০ দশক থেকেই বিদ্যমান। ব্যক্তি/পারিবারিক ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, ভবন-স্থাপনা নির্মাণে আইন ও নিয়ম প্রতিপালন এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমেই ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার জনগণের জন্য সুনামি সতর্কতা প্রচারসহ প্রস্তুতি বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এসব কার্যক্রমে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ তারা স্থানীয় বিধায় সারাবছর প্রচারণা ও প্রস্তুতি কার্যক্রম, সুনামি সতর্কতা জারিসহ বিপদাপন্ন মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারবেন।
এম. এ. হালিম: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং দুর্যোগ,
জলবায়ু ও মানবিকবিষয়ক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
