ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নৃ-মুখ

শ্রমজীবী আজিজুরকে নিয়ে এত কাণ্ড

শ্রমজীবী আজিজুরকে নিয়ে এত কাণ্ড
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩৪ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩৫

রিকশাচালক আজিজুর রহমান গত তিন দিন আলোচনায় ছিলেন। গত ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হয়েছিলেন তিনি। এর পর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে চর্চিত জুলাই আন্দোলনের এক হত্যাচেষ্টা মামলায় আটক দেখায়। আদালতও তাঁকে জেলে পাঠান। তবে বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে হইচই শুরু হলে পুলিশ বলে, তাঁকে নাকি হত্যচেষ্টা নয়, সন্দেহজনক গতিবিধির এক মামলা দেওয়া হয়েছিল। আজিজুর জামিন পেয়ে যান।

প্রশ্ন হলো, ৩২ নম্বরে যাওয়ার কারণে কেন একজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হলো? সরকার কি তবে ভয়ে আছে? এর উত্তর নিশ্চয় সরাসরি ‘হ্যাঁ’ হবে না। তবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বলছে, সরকার সম্ভবত রজ্জুকেও সর্প মনে করছে। না হলে আজিজুরের মতো ক্ষমতাহীন একজনকে নিয়ে এত কাণ্ড হতো না। 

১৫ আগস্ট সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধার ব্যাপকতা দেখা গেছে। অনেকাংশেই তা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। আমার ধারণা, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের বক্তব্য- ‘১৫ আগস্ট কেউ ধানমন্ডিতে বা কোথাও কর্মসূচি করতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে’(এনটিভি অনলাইন, ১০ আগস্ট ২০২৫) এই স্বতঃস্ফূর্ততার আগুনে ঘি ঢেলেছে। পুলিশের পাশাপাশি বিএনপি সেই হুমকি কার্যকরের দায়িত্ব নিয়েছিল। ওই দিন যারাই সেখানে গিয়েছে, তাদেরই হেনস্তা ও মারধর করা হয়েছে। রাতভর সেখানে চলেছে গানবাজনা। যদিও এবারের ১৫ আগস্টে ৫০ বছর আগে নিহত শেখ মুজিবের প্রতি অধিকাংশ মানুষের শ্রদ্ধায় আওয়ামী লীগ তেমন ছিল না। সরকার যেন সারাদিন আওয়ামী লীগ আতঙ্কে ছিল।

‘জয় বাংলা, জিতবে আবার নৌকা’ গান বাজিয়ে ওই দিন চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ে উৎসব করছিল কিছু ছাত্র। তা শুনে ‘আওয়ামী লীগ ফিরে এসেছে’ ভেবে সেখানে অতর্কিতে হামলা করে আরেক দল লোক। এ সময় মিউজিক পার্টির জন্য আনা সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়। যে দলের দলীয় প্রধানসহ বহু নেতা দেশের বাইরে, বাকিরা জেলে নয়তো আত্মগোপনে; যে দল এবং তার অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে সরকার, সেই দলকে কেন এত ভয়? এর আগেও ন্যায্য দাবি নিয়ে কোনো গোষ্ঠী রাস্তায় নামলেই তাদের আওয়ামী লীগের দোসর তকমা দিয়ে আন্দোলন দমন করা হয়েছে। এ কারণে এমন কথাও রটেছে, সরকার মুখে আওয়ামী-বিরোধিতা করলেও কার্যত আওয়ামী লীগের রীতিতেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তাতেও সরকারের হুঁশ ফিরেছে, বলা যায় না। 
সরকার দৃশ্যত আওয়ামী ভয় কাটাতে বিএনপিকে ব্যবহার করছে। যে কারণে ১৫ আগস্ট ৩২ নম্বর পাহারায় বিএনপিকেও সঙ্গে রেখেছিল। তবে বিএনপিকেও যে সরকার ভয় পাচ্ছে না– তা বলা যায় না। এ সরকারের অপত্য স্নেহের বৃহত্তম ভাগীদার এনসিপি যে বিএনপির বিরুদ্ধে লেগে আছে, সেটাই তো এর বড় প্রমাণ। ত্রয়োদশ নির্বাচন যে ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগেই হবে বলে সরকার বলছে, তারও পেছনে বিএনপি। বিএনপি কিন্তু শুরু থেকেই বলে আসছে, দ্রুত নির্বাচন না হলে আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে এবং এর দায় নিতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারকে।

এই সরকার আন্তর্জাতিক আশীর্বাদপুষ্ট– এমন কথা সরকারের শুরুতে বেশ চাউর হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও যেন ভয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখতেই জনমত উপেক্ষা করে সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের তিন টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে দ্রুত তুলে দিতে চাচ্ছে। ভারতের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐক্যের ব্যর্থ প্রদর্শনী তো কারও অজানা নয়।


আমার মনে হয়, সরকারের সবচেয়ে বড় ভয় সাধারণ মানুষকে। সরকারপ্রধান যে সেই শুরুতেই গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষের ভূমিকাকে খাটো করে বলেছিলেন, ছাত্ররাই তাঁর নিয়োগকর্তা; তারা বললেই তিনি চলে যাবেন, তা তো নিছক কথার কথা ছিল না। জনপরিসরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে দেশের জনগণই ক্ষমতায় পরিবর্তন এনেছে– ইদানীং এমন কথা বললেও প্রধান উপদেষ্টা জুনে লন্ডন সফরকালে চাথাম হাউসের সভায় কী বলেছিলেন, তা মনে আছে? উপস্থাপকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, এ দেশের মানুষ নাকি বলে– ‘তুমি টাকা দাও, আমি ভোট দেব।’ (আজকের পত্রিকা, ১৫ জুন, ২০২৫) 
অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, সরকার জনগণ থেকে যত দূরে থাকে তত বেশি ‘জনগণ’ শব্দটিকে সে ব্যবহার করে তার কর্মকাণ্ডের বৈধতা দিতে। আবার তার স্বরও তত বেশি শাসানো হয়ে ওঠে। বিগত সরকারের সময় এটা আমরা অনেক বেশি প্রত্যক্ষ করেছি। তারা একদিকে জনগণ তাদের সঙ্গে আছে বলে মুখে খৈ ফোটাত, অন্যদিকে ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা বা সরকারবিরোধী স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ডিএসএ বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো এক দানবীয় বিধানের প্রয়োগ চলত। এখন সেই ডিএসএ নেই সত্য; তবে এ সরকার প্রণীত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় চাকরি চলে যাওয়া কিংবা একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার মতো পদক্ষেপ কিন্তু চলছে। 

কেন জনগণকে এত ভয়? রিকশাচালক আজিজুরের গ্রেপ্তারকে ‘পুঁজি’ করে সামাজিক মাধ্যমে বেশ সরব ছিল আওয়ামী লীগ, যদিও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আবেগ ছিল নিখাদ, এতে কোনো দলপ্রীতি ছিল না। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ আমলে চাটুকারদের ধাক্কাধাক্কিতে তিনি কোনোদিন হয়তো ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যেতেই পারেননি। কিন্তু আজিজুর বিরোধীপক্ষের রাজনীতির নতুন পুঁজি হয়ে উঠতে পারেন– এমন ভয় অমূলক ছিল না। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যে রিকশাচালক আন্দোলনকারীদের প্রতি স্যালুট জানিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন, তাঁর কথা মনে আছে? গ্রাফিতিতে তাঁর সেই স্যালুট জায়গা পেয়েছিল। আবার সেই ছবিই জামায়াতে ইসলামী তার মতো ব্যবহার করে দেখাতে চেয়েছিল, ওই রিকশাচালক তাদেরই লোক।
সরকার জেনে গেছে– উচ্চ দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মব সন্ত্রাস ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এ ধরনের পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শ্রমজীবী মানুষ, উপযুক্ত নেতৃত্ব পেলে যারা বিদ্রোহ করতে পিছপা হয় না। বিশেষত গত আন্দোলনে এর ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। অন্তর্বর্তী সরকার তো ওই আন্দোলনেরই ফসল। তাই আজিজুরের মতো শ্রমজীবীদের খ্যাপানোর মাশুল কী হতে পারে– তার চেয়ে আর কে তা ভালো বোঝে? সরকারের ভয়টা আসলে সেখানেই।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও পড়ুন

×