ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমতা

সিডও সনদের বাস্তবায়ন এবং নারীর অধিকার

সিডও সনদের বাস্তবায়ন এবং নারীর অধিকার
×

রেখা সাহা

রেখা সাহা

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৬ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৭

সিডও নারীর মানবাধিকার সংরক্ষণের অনন্য দলিল। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ সিডও। ১৯৮৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এই সনদের কার্যকারিতা শুরু হয়। এটি জাতিসংঘের একটি যুগান্তকারী বৈশ্বিক দলিল। শতাব্দীকালের নারী আন্দোলনের মাইলফলক অর্জন। সিডও সনদের ভিত্তিতে রয়েছে তিনটি মূলনীতি– বৈষম্যহীনতা, প্রকৃত সমতা এবং রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা।  

বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে নারীর মানবাধিকার রক্ষা এবং নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য বৈষম্যমূলক আইন বাতিল, নতুন আইন প্রণয়ন এবং আইনি সমতার পাশাপাশি নারীদের জীবনে প্রকৃত সমতা আনতে ইতিবাচক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সিডওতে নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকারসহ ব্যাপক পরিসরে নারীর মানবাধিকারের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিধি নারীর ব্যক্তিজীবন থেকে জনজীবন পর্যন্ত প্রসারিত। সিডও সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য রাষ্ট্র ব্যক্তিজীবন ও জনজীবন উভয় ক্ষেত্রেই নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিহত করবে; বৈষম্যমূলক আইন এবং সামাজিক প্রথা বাতিলের মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং নারীর মানবাধিকার ত্বরান্বিত করতে সব ধরনের কার্যকর সুনির্দিষ্ট নীতি, আইন, কর্মপরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

এই বৈশ্বিক চুক্তির আওতায় প্রতিটি অনুমোদনকারী রাষ্ট্রকে চার বছর অন্তর ২৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির কাছে সিডও বাস্তবায়নের অগ্রগতিবিষয়ক প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। সিডও কমিটি সরকারের প্রতিবেদন এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জমাকৃত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে।

বাংলাদেশে সিডও বাস্তবায়ন
বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে চারটি ধারায় আপত্তি রেখে সিডও সনদে স্বাক্ষর করে। পরে নারী আন্দোলনের দাবির ফলে ১৯৯৭ সালে পারিবারিক কল্যাণে নারী-পুরুষের সমস্বার্থ এবং সমানাধিকার বিষয়ক সিডও ধারা ১৩ (ক) এবং অভিভাবকত্ব বিষয়ক ধারা ১৬ (১) (চ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করলেও এখনও ২ এবং ১৬(১) (গ) ধারায় সরকারের আপত্তি বহাল আছে।    
সিডও-এর ২ নম্বর ধারাকে বলা হয় সনদের হৃৎপিণ্ড। যেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে; বৈষম্য বিলোপ করতে সমতার নীতি এবং আইন প্রণয়ন করবে; দেশের সংবিধান এবং আইনে জেন্ডার সমতার বিষয় যুক্ত করবে; বৈষম্যমূলক আইন সংস্কার করবে, প্রয়োজনে বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করবে। শুধু সরকারি নয়; বেসরকারি খাতেও বৈষম্য নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা এখানে বলা হয়েছে। কাজেই এ ধারাতে আপত্তি বহাল রেখে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার এবং আইনি বাধ্যবাধকতা কোনোটাই পূরণ হবে না। ১৬(১)(গ)ধারায় নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়– বিয়ে এবং বিয়ে বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় আপত্তি বিয়ে সম্পর্কিত বিষয়ে নারীর অধিকারহীনতা এবং উত্তরাধিকার আইনে লিঙ্গভিত্তিক অসমতা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।  

নারীর জীবনের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সিডও
১৯৮৬ সাল থেকে সিডও কমিটির সুপারিশকৃত এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সাধারণ সুপারিশে  নারীর প্রতি সহিংসতা, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, ন্যায়বিচারে অভিগম্যতা, জেন্ডারভিত্তিক গৎবাঁধা প্রথা, নেতৃত্বে সমপ্রতিনিধিত্বসহ নারীর জীবনের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

১৯ নম্বর সাধারণ সুপারিশে বলা হয়, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নারীর প্রতি বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ এবং নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন। সুপারিশে সিডওতে অনুমোদনকারী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয় নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, কার্যকর আইনি সুরক্ষা, ভুক্তভোগী নারী ও কন্যাশিশুর জন্য সহায়তা কার্যক্রমসহ আইনগত, সামাজিক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। তারও ২৫ বছর পর ২০১৭ সালে ১৯ নম্বর সাধারণ সুপারিশের আলোকে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং জোর দেওয়া হয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ধর্মের নামে যেসব সামাজিক প্রথা, গৎ বাঁধা ধারণা নারীর প্রতি সহিংসতাকে সমর্থন করে সেসব প্রথা ও ধারণা পরিবর্তনের ওপর। ২০১০ সালে ২৮ নম্বর সাধারণ সুপারিশে সিডও সনদের ২ নম্বর ধারার বিস্তারিত এবং পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়ে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতার পুনরায় স্মরণ করিয়ে বৈষম্যের বহুমাত্রিক ধরন তুলে ধরে বলা হয়: ধর্ম-বর্ণ, প্রতিবন্ধিতা, আর্থসামাজিক অবস্থানের ভিন্নতার কারণে লিঙ্গবৈষম্য বৃদ্ধি পায়। 

২০২৪ সালে গৃহীত হয় সিডও সাধারণ সুপারিশ ৪০। এই সুপারিশে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বক্ষেত্র ও পর্যায়ে বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব বলতে ৫০:৫০ সমতা বোঝানো হয়েছে। সুপারিশে কমিটি উল্লেখ করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নারীকে শতাব্দীকাল ধরে বাইরে রাখার রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শুধু নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না; এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবে সারাবিশ্ব তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অপার সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হয়। 

সিডও কমিটির সুপারিশ, বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের দাবি
বাংলাদেশ সরকারের অষ্টম সাময়িক প্রতিবেদনের ওপর ২০১৬ সালে সিডও কমিটির সমাপনী মন্তব্যে নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন ঘটেছে।

সিডও সনদের ২ নম্বর ধারায় সংরক্ষণ বাংলাদেশের সংবিধান ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং নারীর মানবাধিকারের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা বিধায় এ ধারা থেকে সরকারের সংরক্ষণ প্রত্যাহার অপরিহার্য বলে সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ১৬ (১) (গ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে বিয়ে এবং বিয়ে বিচ্ছেদে সমানাধিকার ও সমদায়িত্ব, সর্বোপরি সম্পদ-সম্পত্তিতে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। নারী আন্দোলন বিশ্বাস করে, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র-সমাজ গড়ার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয় এবং এরই পূর্বশর্ত সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন।   

রেখা সাহা: লিগ্যাল এইড সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

আরও পড়ুন

×