ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধর্ষণ মামলার বিশ্লেষণ

ভীতিকর ভবিতব্য

ভীতিকর ভবিতব্য
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৮:১০ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:২৪

একগুচ্ছ ধর্ষণ মামলার এজাহার, চার্জশিট ও রায় বিশ্লেষণ করিয়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) যেই হতাশাজনক উপসংহার টানিয়াছে, উহা নির্মম বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। রবিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ১০৪টি ধর্ষণ মামলার রায় পর্যবেক্ষণ করিয়া পিবিআই দেখিয়াছে, মাত্র ১২টি মামলায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। অর্থাৎ সাজার হার মাত্র সাড়ে ১১ শতাংশ।

অবশিষ্ট ৯২টি মামলায় আসামিরা খালাস পাইয়াছেন, যাহা মোট মামলার প্রায় সাড়ে ৮৮ শতাংশ। অতীতেও বিষয়টি লইয়া নারী অধিকার ও মানবাধিকার-বিষয়ক একাধিক সংস্থা গবেষণা করিয়া প্রায় অভিন্ন ফল পাইয়াছিল। তখন সামাজিক পরিসরেও সংশ্লিষ্ট আইন, বিচার প্রক্রিয়া ও অন্যান্য দুর্বলতা লইয়া আলোচনা হইয়াছিল। কিন্তু সকলই যেন কার্যত গরল ভেল– পিবিআইর গবেষণায় তাহাও ফুটিয়া উঠিল।

প্রসঙ্গত, ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার হইতে বঞ্চনার নেপথ্যে ধর্ষণ মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দুর্বলতার ভূমিকা পিবিআইও বলিয়াছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, অসম্পূর্ণ অথবা অপর্যাপ্ত তথ্য-সংবলিত এবং ত্রুটিপূর্ণ এজাহার মামলার পরবর্তী তদন্তের ক্ষেত্রে বৃহৎ অন্তরায় হইয়া দেখা দেয়।  গবেষণায় বলা হইয়াছে, ঘটনার পর অনেক ভুক্তভোগীর মানসিক পরিস্থিতি নাজুক হইয়া যায়। কেহ গুরুতর অসুস্থ হইয়া এমনকি প্রাণও হারান। তাই ভুক্তভোগী কখন, কোন পরিস্থিতিতে, কীভাবে ধর্ষণের শিকার হইয়াছেন; নির্ভুলভাবে সেই বর্ণনা পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতিনীতি ও পারিপার্শ্বিকতায় অনেক ভুক্তভোগী এই বিষয়ে কথা বলিতে চাহেন না; এই সত্যও প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে।

পিবিআইর মতে, আইনি সচেতনতার অভাবও অনেক সময় বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে কাজ করে। পরিধেয় বস্ত্র বা অন্যান্য আলামত সংরক্ষণ এবং উপস্থাপনে ব্যর্থতাও ধর্ষণের মামলা সুষ্ঠু তদন্তের ক্ষেত্রে অন্তরায়। বিচারের দীর্ঘসূত্রতাও যে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাহাও আমরা জানি। আরও গুরুতর বিষয় হইল, বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হইলেও উহাতে ভীত নহে অন্তত সাড়ে ২৭ শতাংশ অভিযুক্ত। ৮৪টি আলোচিত ধর্ষণ মামলার বাদী, ভুক্তভোগী ও আসামিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করিয়া এই তথ্য পাইয়াছে। অর্থাৎ আইনে ধর্ষণের শাস্তি যত কঠোর হউক, তাহা ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে যথেষ্ট নহে।

ধর্ষণের ন্যায় অপরাধ ভুক্তভোগীর উপর কী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহা আমরা সকলেই জানি। ইহা শুধু সংশ্লিষ্ট নারীর জীবনকেই তছনছ করিয়া দেয় না; সংশ্লিষ্ট পরিবারকেও অনেক সময় বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলিয়া দেয়। ফলে ধর্ষণ একদিকে যদ্রূপ নারীর মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করে, তদ্রূপ তাহার পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দাবাইয়া রাখিবার আদিম আয়োজনস্বরূপ। কোনো সভ্য সমাজ এই অবস্থা সহ্য করিতে পারে না। এই ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তাই সকলের একযোগে সক্রিয় হওয়া জরুরি।

এই ক্ষেত্রে পিবিআই যে সুপারিশমালা দিয়াছে, তাহা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। পিবিআই বিশেষত ধর্ষণের ঘটনার ক্রাইমসিন যথাযথভাবে সংরক্ষণ হইতে তদন্ত প্রক্রিয়া, সাক্ষী নির্বাচন, চার্জশিট আদালতে জমাদানের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি আইন কর্মকর্তাদের দ্বারা পুনঃপুন যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা চালু, এমনকি বিচারকার্য দ্রুত ও সঠিকভাবে সমাপ্তকরণের স্বার্থে বিচারকালীন গড় সময় হ্রাসের বিষয়েও সুপারিশ করিয়াছে।

সাক্ষীদের আদালতে উপস্থাপন এবং যথাযথ সাক্ষী প্রদানে উৎসাহিত করিবার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ বিষয়েও সংস্থাটি পরামর্শ দিয়াছে। সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের গুরুত্বও পিবিআই তাহার সুপারিশে তুলিয়া ধরিয়াছে। এই বিষয়ে সামাজিক সচেতনতার গুরুত্ব কতটা, তাহাও আমরা জানি। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার অবিলম্বে সুপারিশমালা কার্যকর করিবার উদ্যোগ লইবে।

আরও পড়ুন

×