উচ্চ মাধ্যমিকের ফল
অঞ্চল ও সময় বিবেচনায় পাবলিক পরীক্ষায় ন্যায্য বিচার হচ্ছে কি?
অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রাজ্জাক
মাহবুবুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:৫৪
এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় সারাদেশের মোট ১১টি বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড বাদে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে ভালো করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড আর খারাপ করেছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৫৯ দশমিক ৪০, যশোরে ৫০ দশমিক ২০, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ৫৭, বরিশালে ৬২ দশমিক ৫৭, সিলেটে ৫১ দশমিক ৮৬, দিনাজপুরে ৫৭ দশমিক ৪৯ এবং ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। অন্যদিকে কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ আর মাদ্রাসা বোর্ডে ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।
এবারের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ ব্যাপারটি বেশ স্পষ্ট– অঞ্চলভেদে ফলাফলে বেশ তারতম্য হয়েছে। এ তারতম্য এবারই নতুন হয়েছে তা নয়, প্রতিবছরই হয়ে থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন, তাদের উচিত এর কারণগুলো বের করে আনার চেষ্টা করা। শুধু পরীক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে নিলে অন্যায় করা হবে। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের জনগোষ্ঠী সারাদেশে প্রায় একই রকম। আমাদের সংস্কৃতি এক, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এক, সিলেবাস এক, পাঠ্যপুস্তক এক, খাতা দেখার পদ্ধতি এক। তবে ফলাফলে এত তারতম্য কেন? ঢাকা বোর্ডের পাসের হার কুমিল্লা বোর্ডের পাসের হারের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। ঢাকা বোর্ডের অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কি তুলনামূলক বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়? কুমিল্লা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা কি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার? অভিযোগ আছে, কুমিল্লা ও যশোর বোর্ডের প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন হয়। এবার পাসের হারও সবচেয়ে কম এ দুই বোর্ডেই। এটি তো কোনো কোনো এলাকার পরীক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের বড় অবিচার।
কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা পদ্ধতি ভিন্ন– তাই তাদের ফলাফল অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ পাসের হার হওয়ার ব্যাপারটির ব্যাখ্যা কী? একই অঞ্চলের একজন আলিম পরীক্ষার্থী কি একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী থেকে বেশি সুযোগ পাচ্ছে? নাকি মাদ্রাসায় পড়াশোনার পরিবেশ কলেজের পরিবেশের চেয়ে উন্নততর? কুমিল্লা বোর্ডের পাসের হার মাদ্রাসা বোর্ডের পাসের হারের চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ কম। এ ব্যবধানটি বিশাল, কোনোভাবেই হেলা করার মতো নয়। কাছাকাছি সিলেবাস অনুসরণ করা সত্ত্বেও কলেজের পরীক্ষার্থীদের তুলনামূলক খারাপ ফল করার কারণ কী হতে পারে? কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জীবনাচারের ভিন্নতা আছে। তাই বলে কি সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে এত বিশাল ব্যবধান হতে পারে?
বলা হচ্ছে, এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম পাসের রেকর্ড হয়েছে। ২০০৫ সালে যখন পরীক্ষা ব্যবস্থার গুণগতমান সর্বমহলে প্রশংসিত হতো, তখন এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর থেকে প্রায় প্রতিবছরই পাসের হার বেড়েছে বা সামান্য কমবেশি হয়েছে। কিন্তু এবার তাতে বড় ধস নেমেছে। এ বছর প্রায় ৪১ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বিপুল পরিমাণে কমেছে। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৭৬ জন, তার আগের বছর পেয়েছিলেন ৭৮ হাজার ৫২১ জন; কিন্তু এ বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৬৩ হাজার ২১৯ জনে। এই যে এ বছর এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী পাস করতে পারল না বা ফল তুলনামূলক খারাপ করল এতে তাদের কর্মজীবনের পথটাই অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হলো। এদের নিয়ে চিন্তা তো রাষ্ট্রকেই করতে হবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এ বছর যার যা নম্বর প্রাপ্য তাই দেওয়া হয়েছে। ছাড় দিয়ে বা বেশি নম্বর দিয়ে কাউকে পাস করিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষকদের বেশি সময় দেওয়া হয়েছে। এদিকে শিক্ষা উপদেষ্টা এ বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশে শিখন প্রক্রিয়ার ঘাটতি হিসেবে। তাঁর মতে, বিগত বছরগুলোয় প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর পুঞ্জীভূত হয়ে আজকের এই বিপর্যয়কর অবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চাইনি। ফলাফল ভালো দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রটি আড়াল করেছি। শিক্ষা উপদেষ্টা ও অন্যান্য কর্তাব্যক্তিদের ভাষ্যে মনে হয় শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রকাশ করে দিতে পেরেই তারা খুশি। এতে পরীক্ষার্থীরা গিনিপিগ মাত্র। তাদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কি না তা কেউ ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করছেন না।
পরীক্ষা পরিচালনা ও পরীক্ষায় খাতা দেখায় যথাযথ মান ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এ ধরনের পরিবর্তন পারিপার্শ্বিক অবস্থা আমলে না নিয়ে হঠাৎ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে পরীক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায় করা হয়। আজকাল অনেক জায়গায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসির গ্রেড বিবেচনা করা হয়। চাকরির ক্ষেত্রেও এ দুটি পরীক্ষার গ্রেড গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। খাতা দেখা ও প্রশ্নের মানের লেভেল যদি বছরভেদে হেরফের হয়, তবে নিঃসন্দেহে কোনো কোনো ব্যাচের পরীক্ষার্থী অন্য ব্যাচের সমান মেধার একজন পরীক্ষার্থীর তুলনায় বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। এ কথা একই বছরের বিভিন্ন বোর্ডের ফলাফলের ক্ষেত্রেও বলা যায়। ফলাফল বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হয়ে যায় কোন বোর্ড বেশি সুবিধা দিচ্ছে আর কোন বোর্ড কম। একই দেশে মেধার মূল্যায়নে এ ধরনের বৈষম্য মোটেও কাম্য নয়।
ইংরেজি মাধ্যমের পরীক্ষা পদ্ধতির গ্রেডিং সিস্টেম অনুসরণ করে প্রচলিত জিপিএ পদ্ধতিতেই এ বৈষম্য দূর করা সম্ভব। বর্তমানে লেটার গ্রেডের বাউন্ডারি নির্দিষ্ট করা আছে। এটি নির্দিষ্ট না রেখে প্রশ্নের মান অনুসারে একটু সমন্বয় করতে হবে। বিভিন্ন বছরের এবং বিভিন্ন বোর্ডের ফলাফলের ডিস্ট্রিবিউশনের ধরন কাছাকাছি করার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু। অর্থাৎ পাসের হার, জিপিএ ৫-এর হার, ফেলের হারের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য নিয়ে আসা প্রয়োজন। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তত্ত্বাবধানে শিক্ষকদের একটি বিশেষজ্ঞ দল পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরপরই প্রতিবছর প্রতিটি বোর্ডের প্রতিটি প্রশ্নের জন্য গ্রেড বাউন্ডারি নির্ধারণ করতে পারেন। যেমন ধরুন এ প্লাস পাওয়ার জন্য সাধারণত ৮০ শতাংশ নম্বর পাওয়া প্রয়োজন।
কোনো বছর কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন বেশি কঠিন হয়ে গেলে এ প্লাস পাওয়ার জন্য নম্বর একটু কমিয়ে আনা উচিত; যাতে এ প্লাসপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীর শতকরা হার কাছাকাছি থাকে। ফেলের হারও গ্রেড বাউন্ডারি সমন্বয় করে যৌক্তিক মাত্রায় সীমিত রাখতে হবে। গ্রেডশিটে মূল প্রাপ্ত নম্বর এবং সমন্বয়কৃত লেটার গ্রেড দুটিই লিপিবদ্ধ থাকবে। লেটার গ্রেডিং পদ্ধতির উদ্দেশ্যই ফলাফলের গুণগত মান সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা। যদি ফলাফল সমন্বয়ের ব্যবস্থা না থাকে তবে লেটার গ্রেড পদ্ধতি রেখে লাভ কি? আগের নিয়মে প্রাপ্ত নম্বর সরাসরি ঘোষণা করে দিলেই হয়।
গত বছর যেই মানের একজন ছাত্র জিপিএ-৫ পেল, খাতা দেখার কড়াকড়ির কারণে এ বছর সেই মানের একজন ছাত্র যদি জিপিএ-৫ না পায়, তবে নিসঃন্দেহে এবারের পরীক্ষার্থীরা এমন বৈষম্যের শিকার হলো– যার রেশ সে বাকি জীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, চাকরি, পদোন্নতি– প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের এ বঞ্চনা বয়ে বেড়াতে হবে। কাজেই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল শুধু গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। এ ফলাফল দিয়ে মেধার মান বিচারে বিভিন্ন বোর্ড ও বিভিন্ন বছরের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত তুলনার সুযোগ আছে কিনা– তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
[email protected]
- বিষয় :
- এইচএসসির ফলাফল
- পরীক্ষা
- পরীক্ষার ফল
