ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ড্যাপ সংশোধন

অবাসযোগ্য ঢাকার অশনিসংকেত

অবাসযোগ্য ঢাকার অশনিসংকেত
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৫ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মূলত আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে পড়িয়া সরকার হতাশাজনকভাবে পুনরায় ঢাকাকে বাসযোগ্য করিবার উদ্দেশ্যে প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সংশোধনী আনিল। সোমবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যমান ড্যাপে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে ভবনের উচ্চতা ও ফ্ল্যাটের সংখ্যা আরেক দফা বৃদ্ধি করা হইয়াছে। ইহার ফলে অধিকাংশ স্থানে বাসযোগ্যতার মান অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হইবে না। উপরন্তু ঢাকা নগরী আরও জনবহুল হইয়া পড়িবে, যদিও ২০২২ সালে প্রণীত ড্যাপের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাজধানীর জনঘনত্ব হ্রাসকরণ। প্রসঙ্গত, ড্যাপ প্রণয়নকারীদের যুক্তি ছিল, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত না করিয়া শুধু ভবনের উচ্চতা বৃদ্ধি করিয়া ভারসাম্যহীন জনবসতি গড়িবার সুযোগ দিলে ঢাকা মহানগরী আরও অবাসযোগ্য হইয়া যাইবে। তাই ড্যাপে ভবন তৈরির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত রাখিবার নির্দেশনা যুক্তকরণ, তৎসহিত ‘ফ্লোর এরিয়া র‍্যাশিও’ (ফার) হ্রাস করা হয়। কিন্তু বিশেষত আবাসন ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। এক পর্যায়ে তাহাদের চাপে তৎকালীন সরকার ড্যাপ সংশোধনপূর্বক কিছুটা ফার বৃদ্ধি করিয়া দেয়। ইহাতেও সন্তুষ্ট না হইয়া তাহারা ড্যাপের বিরোধিতা অব্যাহত রাখে। শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারও সেই চাপের নিকট নতি স্বীকার করিল। তাই সম্প্রতি ড্যাপ বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের ড্যাপ রিভিউ কমিটি আবারও ফার বৃদ্ধি, তৎসহিত ড্যাপে বেশ কিছু সংশোধনী আনয়ন করে, যেইখানে রাজধানীর জনঘনত্ব পূর্বের ২৫০ হইতে ৩০০ করা হয়। সর্বশেষ সংশোধনীর কারণে ড্যাপে জনঘনত্ব ব্লক ১৭৫টি হইতে হ্রাস পাইয়া ৬৮টি হইয়াছে। বিশেষজ্ঞদের এই আশঙ্কা অমূলক নহে, সংশোধিত ড্যাপ কার্যকর হইলে উহার মূল উদ্দেশ্যই বিফলে যাইতে পারে। 

ফার বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারীদের যুক্তি হইল, ফার কম থাকিবার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে বিশেষত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাসমূহে বহুতল ভবন তথা ফ্ল্যাটের সংখ্যা হ্রাস পায়। পরিণামে ফ্ল্যাটের মূল্য ও ভাড়া বৃদ্ধি পায়। ইহার কারণে সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্য ঢাকায় টিকিয়া থাকা কঠিন হইয়া পড়ে। কিন্তু আলোচ্য সংশোধনীর কারণে ফ্ল্যাটের দাম ও ভাড়া কিছুটা হ্রাস পাইলে এই সকল অতিরিক্ত অবকাঠামো ব্যবহারকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশনসহ বিভিন্ন পরিষেবার ব্যবস্থা কী প্রকারে হইবে? এমনিতেই যানজট, দূষণ, জীবনযাত্রার ব্যয়, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ইত্যাদি বিবেচনায় ঢাকা বাসযোগ্যতা প্রায় হারাইয়াছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ যে এই ক্ষেত্রে সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ করিতে পারে, সেই বিবেচনা সম্ভবত নীতিনির্ধারকগণ বিস্মৃত হইয়াছেন। যেইখানে দশকের পর দশক ধরিয়া নগর পরিকল্পনাবিদগণ ঢাকা মহানগরীর সুষম উন্নয়ন এবং বাসযোগ্যতা নিশ্চিতকরণের জন্য বিকেন্দ্রীকরণ কর্মকৌশলের কথা বলিয়া আসিতেছেন, সেইখানে ফার বৃদ্ধির এহেন সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। 

আমরা জানি, বিশ্বে যেই সকল রাজধানী শহর চরম অপরিকল্পিত নগরায়ণের শিকার হইয়াছে, ঢাকা সেইগুলির মধ্যে অন্যতম। চার শতাধিক বৎসর বয়সী শহরটিকে ইচ্ছা করিলেও আর প্রত্যাশিত মাত্রায় পুনর্বিন্যাস করা যাইবে না। মূলত স্বাধীনতার পর হইতে গত ৫৪ বৎসরে ক্ষমতাসীন সরকারগুলিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থের সেবা করিতে গিয়া উহারা রাজধানী শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়িয়া তুলিবার উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই, যদিও তাহাদের চোখের সম্মুখে ঢাকা দ্রুত কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হইয়াছে। এই একই কারণে তাহারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজউককে ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা পালনে বাধ্য করিয়াছে; সংস্থাটির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগও বিস্তার। প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্র সংস্কারের বিপুল অঙ্গীকার করিয়া ক্ষমতা গ্রহণকারী অন্তর্বর্তী সরকার রাজধানীকে যথাসম্ভব পরিকল্পিত নগরীতে রূপ দিবার লক্ষ্যে বিশেষত রাজউককে ঢালিয়া সাজাইবে। আলোচ্য ড্যাপ সংশোধনী সেই আশার গুড়ে বালি ফেলিলেও এখনও সরকার তাহার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতকে প্রাধান্য দিয়া ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখিতে ড্যাপ কার্যকর করিবার পথে আগাইয়া যাইতে পারে।

 

আরও পড়ুন

×