ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শারীরিক ও সংগীত শিক্ষক পদ বাতিল

সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করুন

সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করুন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১২ | আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা, তৎসহিত সংগীত বিষয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ বাতিলে সরকারি সিদ্ধান্তটি হতাশাজনক। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং সুস্থ দেশীয় সংস্কৃতিচর্চাকে উৎসাহিত করিবার লক্ষ্যে সরকার এই দুই বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় ২০২০ সালে। গত বৎসর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় উভয় পদে আড়াই সহস্র করিয়া পাঁচ সহস্রাধিক শিক্ষকের পদ অনুমোদন দিয়াছিল। তাহারই আলোকে আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে নূতন নিয়োগবিধির প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপন জারির পর হইতেই একটি পক্ষ উহার বিরোধিতা করিতে থাকে। অবশেষে তাহাদের দাবির মুখে সরকার উক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করিয়াছে। নিশ্চিতভাবে উহা খারাপ দৃষ্টান্ত হইয়া থাকিবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষকের গুরুত্ব ব্যাখ্যার প্রয়োজন নাই। বিশেষ করিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বাহিরেও খেলাধুলার মাঠ হ্রাস পাইবার কারণে শিক্ষার্থীরা যখন গৃহে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশীয় ক্রীড়াচর্চার প্রসারে শারীরিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতে পারে। সকলেরই জানা, দেশীয় বহু খেলা আছে, যেগুলির জন্য স্বল্প পরিসর প্রয়োজন। শরীরচর্চার সহিত সংগীতচর্চার শিক্ষকও অনুরূপ শিক্ষার্থীর সুষম বৃদ্ধির পশ্চাতে অন্যতম নিয়ামক হইতে পারে। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম, যেখানে সংগীত ও নৃত্য অপরিহার্য। শিশুর মানসিক বিকাশে পাঠ্যপুস্তক, তৎসহিত সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন, যাহার অনুপস্থিতিতে ইদানীং শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভরতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে। আমরা জানি, দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় সেই ব্যবস্থা নাই বলিলেই চলে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরাজি ও গণিত বিষয়ে পড়ানো হয়; যেইখানে তৃতীয় হইতে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরাজি, গণিত, প্রাথমিক বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং নিজ নিজ ধর্মশিক্ষা রহিয়াছে। কিন্তু প্রথম হইতে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে সংগীতের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের আলাদা পাঠ্যপুস্তক নাই, যদিও শিক্ষক নির্দেশিকায় সংগীত মূল্যায়নের একটি বিষয় রহিয়াছে। সংগীত এমন একটি মাধ্যম, যাহা কোমলমতি শিশুদের মন ও শরীরে প্রশান্তির জোগান দেয়। এই জন্য শিশুকে ছোটবেলা হইতেই সংগীতের সহিত পরিচয় করাইয়া দেওয়া জরুরি। গবেষণার ফল বলিতেছে, শিল্পচর্চার মাধ্যমে শিশুদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

আমরা জানি, সরকারি নির্দেশনার আলোকেই প্রতি বৎসর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। সেইখানে সংগীত, ক্রীড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেলেও উহা বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিবসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই সকল বিষয়ে নির্ধারিত শিক্ষক থাকিলে শিক্ষার ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের বৎসরব্যাপী সক্রিয় রাখা সম্ভব। এই কারণে শিক্ষানুরাগী মহলসহ সচেতন মানুষেরা বহু বৎসর যাবৎ প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের জন্য ললিতকলার বিবিধ বিষয়ে চর্চার সুযোগ সৃষ্টির জন্য দাবি জানাইয়া আসিতেছিলেন। সম্ভবত তাহারই ফলস্বরূপ সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শারীরিক ও সংগীত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করিয়াছিল। তাই আমরা মনে করি, মহলবিশেষের বিরোধিতার মুখে উক্ত ব্যবস্থা বাতিল করিবার বিষয়টি অস্বাভাবিক। শারীরিক ও সংগীত শিক্ষকের পদ বাতিল করিবার পূর্বে সরকার ইহার বিরোধিতাকারীদের সহিত বসিয়া তাহাদের বুঝাইতে পারিত। প্রয়োজনে এই বিষয়ে জনমত গড়িয়া তুলিবারও প্রয়াস চালাইতে পারিত। তাহা না করিয়া যেইভাবে সরকারি প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হইয়াছে, উহা দুঃখজনক। বিষয়টি লইয়া গণপরিসরে বড় প্রতিক্রিয়া হওয়ায় গতকাল সরকার এর ব্যাখ্যা দিয়াছে। তাহাতে বৈষম্যের যে দাবি করা হইয়াছে, উহা ঠুনকো যুক্তি বৈ কিছুই নহে। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করিতে বিষয়টি সরকারকে পুনরায় বিবেচনা করিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×