ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

আশ্বাস বনাম বাস্তবতা

আশ্বাস বনাম বাস্তবতা
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছর থেকে ঐকমত্য কমিশনের সংস্কারের সঙ্গে আরেকটি বহুল উচ্চারিত দাবি ছিল নির্বাচন। গণঅভ্যুত্থানের পর যখন রাজনৈতিক দলগুলো বারবার নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার ছিল, তখন প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সময় ঘোষণা করলে দলগুলো শান্ত হয়। কেউ কেউ তখন সংস্কার ও নির্বাচনকে বিপরীতে দাঁড় করালেও অনেকে এটিকে সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখেছেন। এই বিতর্ক চলতে চলতে আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে নির্বাচনের ঘোষণা পাই।

ইতোমধ্যে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, নির্বাচন না হলে দেশের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে পারে। গত ১৫ বছর ‘রাতের ভোটের’ কারণে দেশের মানুষ নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিল, গণঅভ্যুত্থানের পর সেই উৎসাহ নতুন করে ফিরে এসেছে। কিন্তু সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদের কারণে অস্থিতিশীলতা কোনোভাবে কাটছে না। তা ছাড়া অভ্যুত্থানের হত্যাযজ্ঞে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিচারকাজও সম্পন্ন না হওয়ায় বিচিত্র প্রশ্ন সামনে আসছে। 
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন সংকট আরও কমিয়ে আনার একটা হাতিয়ার হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে মনে করেন, কেবল নির্বাচন হলেই চলবে না; বরং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য মৌলিক সংস্কারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। তাদের শঙ্কা হলো–সংস্কার না হলে শুধু ক্ষমতার হাতবদল ঘটবে, তাতে সমাজে মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।

সারা দুনিয়াতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের পক্ষে বেশ সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশের মতো বহু দেশে গণতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল, এখানে ক্ষমতার হাতবদলই কেবল গণতন্ত্রের রূপ নিয়েছে। কথায় কথায় রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রের কথা বলেন, যদিও তার কোনো সার থাকে না।

নির্বাচন গণতন্ত্রেরই একটা অংশ, তবে নির্বাচন একমাত্র গণতন্ত্র নয়। গত দেড় দশক আওয়ামী লীগের আমলে ঠিক সময়ে নির্বাচন হয়েছে। সেখানে গণতান্ত্রিক চর্চার লেশমাত্র ছিল না। এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নির্বাচন কোনো ফল দিতে পারে না, বরং বহু ক্ষেত্রে নির্বাচন ক্ষমতার বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্র যে কোনো জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না, যা ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী শাসন পাকাপোক্ত করে।

গত দেড় বছরের মধ্যে বাংলাদেশ এখন একটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তে এসে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের ডাকা লকডাউন, বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগের কারণে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ভাষণ দিয়েছেন, যা বেশির ভাগ মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের ব্যাপারেও একমত হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এ পর্যন্ত একটা স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে, তবে আতঙ্ক রয়ে গেছে। এ অবস্থায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন হলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে অনেকে মনে করছেন।

শুধু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কি সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করা আদৌ সম্ভব? বিশেষত বিচার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন না হলে সমাজে অস্থিতিশীলতা রয়েই যাবে। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা সাধারণ ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি, তা না হলে নির্বাচনের পরও সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

সুতরাং দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করতে হলে নির্বাচনের পাশাপাশি সংস্কার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে কোনোভাবে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া মঙ্গলজনক কিছু হবে বলে মনে হয় না। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং দেশের মানুষকে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেওয়া জরুরি। অন্যথায় দেশ আবারও সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×