ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন
বিশ্ব বিবেককে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৫৫ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২২
গত শনিবার মার্কিন সেনাবাহিনী যেভাবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁহার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে রাজধানী কারাকাসের বাসভবন হইতে তুলিয়া লইয়া গিয়াছে, উহা গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল সকল মানুষকেই হতবাক করিয়াছে। ঘটনার অব্যবহিত পর স্বীয় মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবহিত করিয়াছেন, মাদুরো ও তাঁহার স্ত্রীকে ট্রাম্পেরই নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে লইয়া গিয়াছে তাঁহার সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স।
সমকাল অনলাইনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদুরোকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি কারাগারে অন্তরীণ করা হইয়াছে। নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে দায়েরকৃত এক অভিযোগপত্রে মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ’ এবং কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হইয়াছে। সেই অভিযোগে মাদুরোর বিচার করা হইবে। একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে অপর এক রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ যেখানে সকল দেশেরই আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ, সেখানে ভুক্তভোগী রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে তুলিয়া আনা নিঃসন্দেহে দস্যুবৃত্তির শামিল।
স্মরণ করা যাইতে পারে, ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময়ে একই অভিযোগে মার্কিন আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে মামলা করা হইয়াছিল। তখন সমগ্র বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের এহেন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হইয়াছিল। শনিবারের ঘটনায়ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় উঠিয়াছে। কিন্তু কোনো কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্পের দখলদার মনোবৃত্তিকে নিবৃত্ত করিতে পারিতেছে না। মাদুরোকে অপহরণের পর শনিবার সকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়াছেন, এখন হইতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার শাসন পরিচালনা করিবে। তজ্জন্য তাঁহার মন্ত্রিসভার পদধারী ব্যক্তিদের ভেনেজুয়েলায় নিয়োগ দেওয়া হইবে, যদিও ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে দেশটির দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়াছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়াছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হইতে পারে। অর্থাৎ বিশ্বের শীর্ষ তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রটি দখলই সেখানে মার্কিন আগ্রাসনের প্রধান উদ্দেশ্য।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে অনুরূপ পন্থায় যুক্তরাষ্ট্রে তুলিয়া লইয়া যায়। মাদক পাচারের অভিযোগে মার্কিন আইন অনুসারে নরিয়েগার বিচারও করে তাহারা। তবে ঐ ন্যক্কারজনক মার্কিন অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানামা খালের উপর পানামার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়াস বন্ধ করা।
আমরা জানি, ১৯৯৮ সালে বিপুল ভোটে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হইয়া বলিভারিয়ান বিপ্লবের অনুসারী হুগো শ্যাভেজ জাতীয় আয়ের প্রধান খাত জ্বালানি তৈল ক্ষেত্রগুলি জাতীয়করণ করেন, যাহার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ববর্তী বৎসরগুলিতে উক্ত তৈল ক্ষেত্রগুলির প্রধান নিয়ন্ত্রক মার্কিন কোম্পানিসমূহ। মূলত তখন হইতেই ভেনেজুয়েলায় স্বীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয় মার্কিন প্রশাসন। ২০১৩ সালে ক্যান্সারের কারণে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন হইয়া মাদুরো শ্যাভেজের সেই পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন। ফলে জাতীয় স্বার্থে অনমনীয় মাদুরো একের পর এক মার্কিন প্রশাসনের চক্ষুশূলে পরিণত হন। এই দিক হইতে ভেনেজুয়েলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসন অপ্রত্যাশিত কিছু নহে।
তবে এই আগ্রাসনের নেতিবাচক প্রভাব যে শুধু ভেনেজুয়েলা বা দক্ষিণ আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকিবে না– তাহা হলফ করিয়াই বলা যায়। একদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন বিশ্বকে কতটা টালমাটাল করিয়া রাখিয়াছে তাহা আমরা জানি। এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলির নানাবিধ ভোগান্তি কাহারও অজানা নহে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হইল, এই সকল যুদ্ধ ও আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা সর্বাধিক। তাই যে কোনো উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরদেশ দখল এবং পরদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করিয়া ফায়দা লোটার অপকৌশল প্রতিরোধ করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নগ্ন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হইয়াছে। আশার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও নিউইয়র্কে সদ্য শপথ গ্রহণকারী মেয়র জোহরান মামদানির মতো নেতারা প্রতিবাদকারীদের সহিত কণ্ঠ মিলাইয়াছেন। এই প্রতিবাদে মার্কিন সাধারণ জনগণকেও শামিল হইতে হইবে। কারণ ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আগ্রাসন শুধু আন্তর্জাতিক আইনই লঙ্ঘন করে নাই; যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনেরও ব্যত্যয় ঘটাইয়াছে, যেখানে মার্কিন সংবিধানে শুধু কংগ্রেসই অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিতে পারে, সেখানে ট্রাম্প একক সিদ্ধান্তে উক্ত অভিযান চালাইয়াছেন।
