ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য আজ চূড়ান্ত পরীক্ষার দিন
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৩ | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি নিয়ে সমকালের সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছেন লেখক, অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক গবেষক আনু মুহাম্মদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। সমকালের পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম।
সমকাল: সরকারের নির্বাচনী প্রস্তুতি কীভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ: কিছু বিষয়ে অপূর্ণতা থাকলেও নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ভালো মনে হচ্ছে। প্রথমত, একটি বড় দল এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ভোটগুলোর কী হবে, কোথায় যাবে– সেটিও একটি প্রশ্ন। এর বাইরে সংস্কারের প্রশ্ন ছিল। কেননা, আমাদের নির্বাচন আরও গণতান্ত্রিক করে গড়ে তোলার জন্য বহু সংস্কার দরকার। ‘না’ ভোটের সুযোগ থাকা দরকার, সেই সঙ্গে জামানতের পরিমাণ আরও কমিয়ে আনা প্রয়োজন ছিল। যাদের টাকা-পয়সা নেই, কিন্তু যোগ্য প্রার্থী, তাদের বিজয়ী হওয়ার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এই সম্ভাবনা এখনও বাধার মুখে পড়ছে। এদিক থেকে এবারের নির্বাচনে ব্যতিক্রম কিছু দেখছি না। সারাদেশে এ রকম যোগ্য এবং জনগণের জন্য কাজ করবেন এমন অনেক লোক রয়েছেন। তারা পরীক্ষিত কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণায় পিছিয়ে। ফলে যোগ্য প্রার্থী হওয়ার পরও বিজয়ের পথে নানা বাধা। তবে সরকারি প্রস্তুতি কেমন, তা আমরা নির্বাচনকালে দেখতে পাব।
সমকাল: নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, তারা এবার একটি অবাধ নির্বাচন উপহার দিতে যাচ্ছে।
আনু মুহাম্মদ: নির্বাচন কমিশন যা দাবি করছে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য প্রশাসন যেসব কথা বলছে, তার পরীক্ষা আমরা কাল (আজ) দেখতে পাব। এখন পর্যন্ত তাদের প্রস্তুতি ঠিকই আছে বলে মনে হচ্ছে।
সমকাল: জননিরাপত্তার ব্যাপারেও কি একই কথা বলবেন? আমরা তো ইতোমধ্যে কিছু ইঙ্গিত পাচ্ছি।
আনু মুহাম্মদ: এ ব্যাপারে উদ্বেগ নিশ্চয় রয়েছে। তবে আমরা সঠিক চিত্র পাব নির্বাচনকালীন ভোটকেন্দ্রগুলোতে কীভাবে পরিবেশ রক্ষিত হচ্ছে তার ওপর। এরই মধ্যে মব সহিংসতা ও বিচারহীনতার কারণে কিছু উদ্বেগ রয়েই গেছে। মাজার, সংখ্যালঘু ও নারীদের ওপর হামলা তো রয়েছেই। বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা– নির্বাচনী রায় যা-ই হোক না কেন, তাদের মধ্যে একটা আতঙ্ক রয়েই যায়। কোনো কোনো জায়গায় তাদের আতঙ্কে রাখার মতো কথাবার্তা বলা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন এ সবকিছু সুরক্ষা পেলেই সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন বলা যাবে। ইতোমধ্যে যারা বিভিন্ন জায়গায় হামলা করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারের এ ধরনের ভূমিকার কারণে শঙ্কা রয়েছে।
সমকাল: এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষ কোনো দিক কি চোখে পড়েছে?
আনু মুহাম্মদ: এবারে আমরা দেখেছি উল্লেখযোগ্যভাবে অনলাইন প্রচারণা বেড়েছে। সেই সঙ্গে অফলাইনে তো রয়েছেই। সেখানে বিভিন্ন ধরনের অসহিষ্ণুতা, কুৎসাসহ নানামুখী প্রচারণা দেখলাম। প্রচারণায় অর্থ একটি বড় ব্যাপার। যারা অর্থবিত্তে পিছিয়ে আছেন, স্বাভাবিকভাবেই তারা প্রচারণায়ও পিছিয়ে। আরেকটি ব্যাপার হলো, নির্বাচনের প্রার্থিতা ও প্রচারণায় নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম; যদিও মোট জনসংখ্যার অর্ধেক সংখ্যকই নারী। কিন্তু নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৪ শতাংশের মতো।
সমকাল: নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা কেমন দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ: এই সরকারের ওপর তিনটি দলের প্রভাব রয়েছে। এই সরকারকে একাধিক বা তিনটি দলের সরকার বলা যায়। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির প্রভাবের মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দল তিনটির পদায়ন আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়ন ও সরকারি উদ্যোগ দেখলে মনে হয়, জামায়াতের প্রভাব বেশি। এদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে এনসিপি। তবে নির্বাচনে এই প্রভাব কতটা পড়বে তা এখন বলা যাচ্ছে না। সেদিক থেকে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির। সরকার তদারকির জায়গায় দুটি দলের ওপর গুরুত্ব দিলে নিরপেক্ষতার ভারসাম্য রক্ষা হবে। সুতরাং ভোটের দিন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

সমকাল: নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কীভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে বিশেষত পুলিশের অবস্থান এখনও দুর্বল এবং বিভিন্ন টানাপোড়েন রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও বিমানবাহিনী। যদি ওপর থেকে অন্য কোনো নির্দেশ না থাকে, তাহলে যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। আসলে পুলিশ কিংবা অন্য যে কোনো বাহিনীর কথাই বলুন না কেন, তাদের ভূমিকা নির্ভর করে ওপরের নির্দেশদাতার ওপর। তাদের সক্রিয়তা কিংবা নিষ্ক্রিয়তা– সব ধরনের ভূমিকাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয়। কাজেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেমন ভূমিকা রাখবে।
সমকাল: নির্বাচনী রায় পক্ষে না গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
আনু মুহাম্মদ: দীর্ঘদিন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য কমিশনে আলাপ হয়েছে। সুতরাং তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা, যদিও এরই মধ্যে নির্বাচনী তৎপরতায় বিভিন্ন বিষয়ে সেই সহিষ্ণুতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কথাবার্তায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব দেখা গেছে। অনলাইনে যে ধরনের ফেক নিউজ ছড়িয়ে পড়েছে, তাতেও বিভিন্ন সংকট তৈরি হয়েছে। আচার-আচরণে অসংস্কৃত ভাব দেখা গেছে। যদি নির্বাচন কমিশন যে কোনো অভিযোগ বা অনিয়ম যথাযথভাবে সমাধান করে, এর পরও বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দল রায় মেনে না নিলে জনগণই দলটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। কাজেই নির্বাচন যথাযথভাবে শেষ করাই হলো নির্বাচন কমিশন ও সরকারের দায়িত্ব। এর পরও যদি কোনো রাজনৈতিক দল রায় গ্রহণ না করে, তাহলে দলটি জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
সমকাল: নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি কীভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ: কারা বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করছে, এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন সরকারের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করেছে। ইতোমধ্যে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারও আমরা দেখেছি। সেখানে সব কয়টি দলই স্বচ্ছতা, জবাবদিহির কথা বলেছে; কিন্তু এগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা আমরা অতীতে দেখেছি। তারা জাতীয় স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুধু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী নয়, দেশের জন্য ভয়াবহ বিপজ্জনক ও অধীনতা তৈরি করে দেওয়ার মতো চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের একাধিক চুক্তি হয়েছে। অথচ এসব রাজনৈতিক দল এ ধরনের জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির ব্যাপারে কোনো কিছুই বলল না। ফলে ক্ষমতায় এসে দলগুলো কতটা গণতান্ত্রিক সংস্কারে রূপান্তরের দিকে যাত্রা করবে, তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি।
সমকাল: নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতাসীন দলগুলো কি পুরোনো ধাঁচে শাসন করবে?
আনু মুহাম্মদ: দলগুলো ক্ষমতায় এসে আগের মাত্রায় আচরণ করতে পারবে কি পারবে না– সেদিক থেকে খুব বেশি প্রত্যাশাও করা যায় না। আমাদের মনে রাখা দরকার, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্লোগান দিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। কিন্তু আমরা বৈষম্যবাদী রাজনীতির দাপট দেখতে পাচ্ছি এবং ধর্মের নামে এই দাপট বেশি দেখা যাচ্ছে। যাদের বৈষম্য ধর্মীয় ও জাতিভেদের ওপর দাঁড়ানো, তাদেরই আওয়াজ বেশি শোনা যাচ্ছে। তারা সামাজিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফলে আমরা তাদের দাপট সামনে আরও দেখব। এ সরকার দুই ধরনের ফ্যাসিবাদকে পুষ্ট করেছে। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন করপোরেট ফ্যাসিবাদ। সরকার এ দুই ফ্যাসিবাদে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এগুলোও আমাদের সামনে মোকাবিলা করতে হবে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই আবারও সামনে আসবে।
সমকাল: নির্বাচনের পর তরুণদের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ: সব নির্বাচনেই তরুণদের অংশগ্রহণ থাকে। সেদিক থেকে এটি আলাদা কোনো ব্যাপার নয়। একটি গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা থাকবেই। মুক্তিযুদ্ধ ও সব ধরনের সংগ্রামে তরুণদের অংশগ্রহণ থাকেই। এটিও কোনো বিশিষ্ট কোনো দিক নয়। তরুণ মানেই কিন্তু তারুণ্য নয়। তরুণ মানেই যে নতুন আদর্শ, তা নয়। তরুণদের মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতাও থাকতে পারে। তরুণ বলে একাত্মা কোনো জনগোষ্ঠী নেই। তরুণদের মধ্যে শ্রেণিগত বৈষম্য আছে, লিঙ্গীয় বৈষম্য আছে, পেশাগত ভেদাভেদ আছে, মতাদর্শগত পার্থক্য আছে। সেই তরুণদের মধ্যে তারুণ্য কতটা শক্তিশালী হয়, জনস্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পায়, তরুণরা পুরোনো লুটেরা থেকে কতটা মুক্ত, তার ওপর নির্ভর করে আগামী দিনের রাজনীতি।
সমকাল: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা করছি।
আনু মুহাম্মদ: আমিও সুষ্ঠুভাবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রত্যাশা করছি।
সমকাল: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আনু মুহাম্মদ: সমকালকেও ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- আনু মুহাম্মদ
