স্মরণ
জোহার আত্মত্যাগ
ড. শামসুজ্জোহা
এ. এইচ. এম. জেহাদুল করিম
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৪৯ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের স্বনামধন্য মেধাবী শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বুলেট ও বেয়নেটের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রক্রিয়ায় ১৯৬৯ সাল ছিল মহা আন্দোলনের বছর।
আসাদ থেকে শুরু করে সার্জেন্ট জহুরুল হক, মতিউর রহমান– এমনি অগণিত মৃত্যু আমরা ঢাকার রাজপথে প্রত্যক্ষ করেছি ও ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিতে এই অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেড় মাস সময়ের মধ্যে সমগ্র দেশে প্রায় অর্ধশত মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ১৪৪ ধারা এবং কারফিউ দিয়েও পূর্ব বাংলার উত্তাল জনস্রোতকে আন্দোলনবিমুখ করা সম্ভব হয়নি। এমনি এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বুলেট ও বেয়নেটের আঘাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক ও প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা নিহত হন। তিনি তাঁর পেশাগত প্রক্টরিয়াল দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং ছাত্রদের পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের হাত থেকে রক্ষার নিমিত্তে বিভিন্ন কৌশলী প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী বুলেট ও বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
ড. জোহার মৃত্যুর ঘটনা শুধু দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী বিভাগীয় শহর রাজশাহীর মধ্যেই আবদ্ধ থাকেনি; তাঁর মৃত্যু দেশের চলমান আন্দোলনকেও এক ভিন্নতর মরিয়া-গতিময়তা এনে দেয়। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্ররা বিভিন্ন হল থেকে কারফিউ ভঙ্গ করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। ইতোমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপকের মৃত্যু সংবাদ সমগ্র ঢাকা শহরের জনগণকে রাতের মধ্যেই উত্তাল করে তোলে এবং সব বাধা উপেক্ষা করে জনতার ঢল রাস্তায় নেমে আসে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ছাত্র-জনতার প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ বাধে। ঢাকার রাজপথে রক্তের স্রোত বয়ে যায় এবং ওই রাতেই অন্তত ২০ জনের মৃত্যু ঘটে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। এর পরই তৎকালীন সরকার উপায়ান্তর না দেখে সব রাজনৈতিক নেতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ড. জোহার মৃত্যু মূলত আইয়ুবের পতনকে ত্বরান্বিত করে এবং দেশময় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। বলা বাহুল্য, ড. জোহার মৃত্যুর মাত্র ৩৪ দিনের মধ্যেই জেনারেল আইয়ুব খান তাঁর পরবর্তী সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাই এবং এর পরবর্তী ইতিহাস সবারই জানা।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, ড. জোহাকে আঁকড়ে ধরে আছে শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর ১৮ ফেব্রুয়ারি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এই দিনটি পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয়ভাবে একজন জোহা স্মারক বক্তাকে এনে একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদ থেকে সারাদিন বিভিন্ন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের অন্য কোনো স্থানে ড. জোহাকে নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় না। দেশে বর্তমানে এত টিভি চ্যানেল থাকলেও ড. জোহাকে নিয়ে কোথাও কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করতে দেখা যায় না বললেই চলে। এমনকি খোদ রাজশাহীতেই শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁকে নিয়ে সেইভাবে স্মরণ অনুষ্ঠান হয় না। ১৯৬৯-এর পর ২০০৮ সালে আমি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে কর্মরত অবস্থায় ড. জোহাকে মরণোত্তর একুশে পদকের জন্য সুপারিশ করি এবং অতি বিনয়ের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমিই সেখানে ড. জোহার নাম রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একুশে পদকের জন্য প্রস্তাব করি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তৎকালীন সম্মানিত চেয়ারম্যান প্রফেসর নজরুল ইসলাম এতে আমাদের খুব সহযোগিতা করেন। তাঁর কাছে এই ক্ষেত্রে আমাদের কৃতজ্ঞতা অনেক। কেননা, তিনিই ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আমার উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি কার্যে পরিণত করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। যার ফলশ্রুতিতে ড. জোহাকে ২০০৮ সালে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়।
ড. এ. এইচ. এম. জেহাদুল করিম: সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)
[email protected]
- বিষয় :
- স্মরণ
