ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্মরণ

বাংলা বানানের বিপাকে

বাংলা বানানের বিপাকে
×

বিমল সরকার

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বানানে ভিন্নতার কবলে ‘শহীদ’ আর ‘শহিদ’, ‘ঘুষ’ আর ‘ঘুস’, ‘বীমা’ আর ‘বিমা’, ‘কাহিনী’ আর ‘কাহিনি’। একই ব্যক্তি, পত্রিকা বা সংস্থা একবার ‘মুখোমুখী’, পরক্ষণেই আবার ‘মুখোমুখি’ লিখছে। সংবাদপত্রগুলো অনেকটা যার যার স্টাইলে বানান চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে কচি-কাঁচা, কিশোর-কিশোরী, এমনকি তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় বিপাকে। 

বাংলা বানান নিয়ে নিজের বা অন্যদের জন্য আমার তেমন ভাবনা নেই, যতখানি রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য। কেন থাকবে না? সিলেবাস অনুযায়ী বোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অনেক সময় বাংলা সঠিক বানানের ওপরেও ৫-১০ নম্বরের প্রশ্ন থাকে। অতএব বয়স্করা (যারা এখন আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দান-গ্রহণে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নন) যেমনই হোন শিক্ষার্থীদের তো আর এ ক্ষেত্রে ‘ফ্রি-স্টাইল’ শিখলে চলে না। 
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘উপ-উপাচার্য’ লেখা ও বলা হলেও লক্ষ্য করা যায়, কোনো কোনো জাতীয় দৈনিক সবসময় লেখে ‘সহ-উপাচার্য’। আমার বাল্যশিক্ষা শুরু হয় রামসুন্দর বসাক প্রণীত ‘বাল্যশিক্ষা’ দিয়ে। এ ক্ষেত্রে বাবাই আমার প্রথম শিক্ষক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একেবারে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হবার আগে বাড়িতেই আমার ‘আবিষ্কার’ ও ‘পুরস্কার’ বানানের পার্থক্য শেখা হয়ে যায়। আরও জানা হয় ‘জ্ঞান’ ও ‘গঞ্জ’ বানানের পার্থক্য। এ ছাড়া উল্লিখিত বাল্যশিক্ষার সুবাদে স্কুলে যাবার আগেই আমার সহজে পরিচয় ঘটে ‘কৃষ্ণ’, ‘উষ্ণ’, ‘বিষ্ণু’ এমন সব শব্দের সঙ্গে। কিন্তু কলেজে অধ্যয়নকালে একবার শ্রেণিকক্ষে বানান নিয়ে আমাদের বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। শৈশব থেকে শব্দটি এবং এর অর্থ জানা হলেও ‘কৃষ্ণ’ বানান আমার জানা ছিল না। ষ-এর পিঠে সুন্দর একটা ‘পুঁটলি’ যুক্ত করে অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতোই জীবনের বড় অংশ পার করেছি। 

আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগের কথা। আমি তখন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র (শিক্ষাবর্ষ: ১৯৭৫-৭৬)। এক দিন ক্লাসে স্যার (মরহুম শামসুদ্দীন আহমেদ) অন্যান্য শব্দের মতোই প্রসঙ্গক্রমে ‘কৃষ্ণ’ বানানটি জিজ্ঞেস করলেন। ক্লাসভর্তি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে আমরা কেউই তা বলতে না পারায় স্যারই শেষ পর্যন্ত বানানটি বুঝিয়ে দিলেন (কৃ-র পর ষ+ণ)। আমাদের সবারই জানা হলো। এরপর আমি তা আর ভুলিনি। তবে সেদিন মনে মনে বড় দুঃখ পেলাম। কারণ, আমি ‘বাল্যশিক্ষা’ পড়া ছাত্র। সেকালে (১৯৬৫) স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে অপেক্ষাকৃত সহজ ‘সবুজ সাথী’ বইটি পাঠ্য ছিল। ফলে স্কুল কিংবা বাড়িতে বাল্যশিক্ষার মতো কঠিন শব্দ ও বানান-সংবলিত বই কারও কাছে দেখা যেত না। বাল্যশিক্ষাতেই উল্লেখ আছে: কৃষ্ণ দ্বারকার রাজা ছিলেন এবং পক্ষ দুটি: শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ। কিন্তু হলে কী হবে, সবকিছু কি আর আমরা বুঝে পড়েছি কিংবা মুখস্থ করেছি?    

আমার পড়ার মূল বিষয় ইতিহাস। অনধিকারচর্চা বলে মনে হলেও আমার সুদীর্ঘ শিক্ষক-জীবনে শ্রেণিকক্ষে সময়-সুযোগমতো কখনও কখনও শিক্ষার্থীদের কাছে কৃষ্ণ শব্দের বানানটি জানতে চেয়েছি। কিন্তু বিগত তিন-চার দশকেও এ বিষয়ে পরিস্থিতির খুব একটা অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত আমার মুখ থেকে বানানটি শুনে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকেই বিস্মিত হতে 
দেখেছি। নির্দেশনা অনুযায়ী কৌতূহলীরা কম্পিউটারের কাছে গিয়ে প্রমাণ পেয়ে কেউ কেউ পরে আমার সঙ্গে দেখা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যায়। বলতে গেলে বেশির ভাগ শিক্ষকেরই যা জানা নেই, তা শিক্ষার্থীরা জানবে কোত্থেকে?
আমাদের কথা ভিন্ন। গোঁজামিল আর বাউলি কেটে যেভাবেই হোক জীবনের বেশির ভাগ সময় আমরা কাটিয়ে দিয়েছি। ভাবনা কিংবা দুর্ভাবনা হলো বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। কেবল বাংলা বানান নয়; শিক্ষার মানই বড় দাগে আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। আক্ষেপ, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এলে এ নিয়ে তবু কিছু আলোচনা হয়। এরপর সারাবছর বলতে গেলে আর নামগন্ধ থাকে না।
 
বিমল সরকার: অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক 

আরও পড়ুন

×