ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক মহলে অন্যতম দাবি ছিল অবাধ নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পেয়েছি, কিন্তু নির্বাচনের পরপরই নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে বিরোধী দলের কর্মীদের ওপর হুমকি-ধমকি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, তা বেশ উদ্বেগজনক। 

গত সপ্তাহে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স (ইডব্লিউএ) নামে এক প্রতিষ্ঠান ‘নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি: প্রতিবেদন ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী দুই দিনে সারাদেশে মোট ২১০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ড, শারীরিক হেনস্তা, হামলা, হুমকি ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা। প্রতিবেদনমতে, এসব ঘটনার মধ্যে ৫৩ শতাংশই শারীরিক হামলা। বাড়িঘর-অফিস-চেম্বারে হামলা হয়েছে ১৪ শতাংশ, ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রে হুমকি দেওয়া হয়েছে, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য সহিংসতা হয়েছে ১০ শতাংশ। নির্বাচনের দিনসহ পরবর্তী কয়েক দিনে সারাদেশে ২১০টি সহিংসতার ঘটনা জনমনে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। 

সহিংসতা কখনোই হঠা জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, রাজনৈতিক মেরূকরণ, বৈরিতাপূর্ণ রাজনীতি এবং আইনের শাসনের দুর্বল প্রয়োগ।
নির্বাচন ঘিরে যখন রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বা প্রতিপক্ষের পরিবর্তে শত্রু হিসেবে দেখে, তখন মাঠের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও সে মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে।
এ ধরনের সহিংসতার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ নাগরিক এবং দরিদ্র কর্মী। ভোট দিতে যাওয়া একজন বৃদ্ধ, প্রথমবার ভোট দিতে উৎসাহী এক তরুণ বা দায়িত্ব পালনরত শিক্ষক– তাদের কারোরই রাজনৈতিক সংঘর্ষের বলি হওয়ার কথা নয়। বাস্তবে তারাই ঝুঁকির মুখে পড়েন। এতে নাগরিকদের মনে ভয় জন্মায়; ভোটার উপস্থিতি কমে। ফলে গণতন্ত্রের মূল শক্তি তথা রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ কমতে শুরু করে। 

গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু আমরা দেখেছি, গণঅভ্যুত্থানের পর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শত্রু মনোভাব বেড়েছে, যা নির্বাচনের পর স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। এসব সহিংসতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিদ্যমান ব্যবস্থাকে তুলে ধরে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। 
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি বিষয় জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখার দরকার, পেশিশক্তি বা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকলেও স্থায়ী হয় না। গণঅভ্যুত্থান সেই বার্তাই দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষত নেতাদের সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। শীর্ষ নেতৃত্বের ভাষা ও আচরণ মাঠ পর্যায়ে বড় প্রভাব ফেলে। দায়িত্বশীল বক্তব্য, প্রতিদ্বন্দ্বীকে সম্মান করা এবং কর্মীদের সংযত থাকার আহ্বান বাস্তব পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত প্রতিক্রিয়া, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলনিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সহিংসতার প্রবণতা কমে। শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সহনশীলতা জাগিয়ে তুলতে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্নমতকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা; বিতর্ককে যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখা– এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
সর্বশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে– রাজনীতি কোনো যুদ্ধ নয়। এটি দেশ, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করার প্রতিযোগিতা। এখানে জয়-পরাজয় থাকবে, কিন্তু সহিংসতা আমাদের পিছিয়ে দেবে। তাই নির্বাচনী সহিংসতা আসলে আমাদের সবার পরাজয়।

 ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×