ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

নতুন সরকারকে শুরুতেই যেসব দিকে নজর দিতে হবে

নতুন সরকারকে শুরুতেই যেসব দিকে নজর দিতে হবে
×

হোসেন জিল্লুর রহমান

হোসেন জিল্লুর রহমান

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ব্যাপক ভীতি ও আশঙ্কার মাঝেও নির্বাচনটি ছিল উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ। ভোটার উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। জনগণ মধ্যপন্থা ও স্থিতিশীল পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। বিরোধীপক্ষ ফল মেনে নেওয়ায় নির্বাচনোত্তর পরিবেশ ছিল আশাব্যঞ্জক।

এই নির্বাচনে সাধারণ নাগরিকরা দেশের ওপর নিজেদের মালিকানার অনুভূতি ফিরে পেয়েছেন।  বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন নারী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তাই এই ব্যালট কেবল নতুন সরকার গঠন করেনি, বরং সুশাসন ও ন্যায়বিচারের স্পষ্ট প্রত্যাশাও বহন করেছে।

ভোটের তথ্য-উপাত্তের গভীর বিশ্লেষণ বিজয়ীদের জন্য জরুরি। আসন-প্রাপ্তির তুলনায় ভোট-প্রাপ্তির হার অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক চিত্র হাজির করেছে। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বোঝাপড়ার জন্য বিএনপিকে ভোটারদের মনোভাব গভীরভাবে পড়তে হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংযমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা প্রশংসা পাচ্ছে। এই শুরুটা নিঃসন্দেহে আশাবাদপূর্ণ। তবে সামনের দিনগুলোতে সরকারের কার্যক্রমের ওপরই নির্ভর করবে দেশের ভবিষ্যৎ। এখানে আমি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করছি।

প্রথমত যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রশ্ন। জনগণের ভোটে ম্যান্ডেট পাওয়া বিএনপি কীভাবে যোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়, সেটি দেখা দরকার। ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। প্রশাসনিক বিভিন্ন পদেও রদবদল শুরু হয়েছে। এর আগে আমি বলেছি, দায়িত্বের ক্ষেত্রে কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখার বিষয় নয়; বরং বাস্তব দুনিয়ার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা এবং কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সক্ষমতাও বিষয়। মন্ত্রিত্বে কিংবা প্রশাসনে যারা দায়িত্বে এসেছেন, তাদের বিষয়ে এখনও বলার মতো সময় হয়নি। অন্তত ১০০ দিন তাদের কর্মতৎপরতা দেখার পরই হয়তো বাস্তব চিত্র বোঝা যাবে। যদিও কারও কারও বিষয়ে ইতোমধ্যে কথা উঠেছে। 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রে দুটি ভয়াবহ ব্যাধি গেড়ে বসেছে: তোষামোদি তথা লবিং এবং পুরোনো অভিযোগকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার। ঔপনিবেশিক আমলের লালফিতার দৌরাত্ম্য এবং কাগজে-কলমে কাজের অগ্রাধিকারের সংস্কৃতি যে কোনো সদিচ্ছার নীতিকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষ কিছু করতে পারেনি। মেধা লালনের প্রশ্নটি নতুন সরকারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। 

দ্বিতীয় প্রশ্নটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের। নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক সংকট বড় আকারে হাজির হবে। এটি কীভাবে দেখা হচ্ছে ও সামলানো হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে কিছুটা সফল হলেও বৃহত্তর অর্থনৈতিক গতিসঞ্চারে সফলতা দেখাতে পারেনি। পিপিআরসির ২০২৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদন ‘রিয়েল ইকোনমি রিপোর্ট’ দেখাচ্ছে: প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও রাজস্ব সংগ্রহে স্থবিরতা চলছে;  দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ক্রমবর্ধমান এবং ক্রমেই গভীর হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। শুধু রাজস্ব শৃঙ্খলার একমাত্রিক এজেন্ডা চলবে না–ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে পলিসি সহায়তার মাধ্যমে চাঙ্গা করতে হবে।

তৃতীয় বিষয়, সহানুভূতি ও সামাজিক সুরক্ষা। এটি জনগণের জন্য জরুরি। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারকে তাদের পাশে সহায় হয়ে দাঁড়ানো। পিপিআরসির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের পরিবারগুলো গড়ে কোনো রকমে খরচের সঙ্গে আয় মেলাতে পারছে। শহরে মাসিক ঘাটতি হাজার হাজার টাকা। প্রায় ২৮ শতাংশ নাগরিক উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, আর নিম্নআয়ের পরিবারে মাসিক ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি যায় খাবারে। মানুষ কষ্ট সহ্য করে যখন মনে করে ব্যবস্থাটা ন্যায্য; কিন্তু ফলাফল অন্যায্য মনে করলে প্রতিরোধ করে। সামাজিক সুরক্ষা শুধু সুবিধা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও সম্মান বজায় রেখেই তাদের নাজুকতা কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন দল যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের বিষয়টিও দেখতে হবে। বিশেষ করে জনগণ কত সহজে সেগুলো পাচ্ছে এবং সামাজিক সুরক্ষায় তা কতটা কার্যকর, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে মাঠে নামানো যাচ্ছে কিনা তাতে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। স্থানীয় সরকারের পুনর্গঠন ও ক্ষমতায়ন বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক সাফল্যের কেন্দ্রীয় উপাদান হতে পারে। বছরের পর বছরের কেন্দ্রীয় আধিপত্য বৈষম্য বাড়িয়েছে, স্থানীয় উদ্যোগকে শৃঙ্খলিত করেছে। আসল ক্ষমতা, পর্যাপ্ত সম্পদ ও সুস্পষ্ট জবাবদিহির সঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে এই ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। ‘ঢাকা বনাম বাকি দেশ’–এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করার এটাই উপযুক্ত সময়। এ ক্ষেত্রে সকল পর্যায়ে গণতন্ত্রায়নও গুরুত্বপূর্ণ। সব জায়গায় প্রশাসক বসানো শাসন সাধারণ মানুষ গণতান্ত্রিক সরকার থেকে কতটা আশা করছে, সেটিও ভেবে দেখার বিষয় আছে।

পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনগণের হিলিং বা নিরাময়। স্বৈরাচারী শাসন কেবল মানুষকে দমন করেনি, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর যে জাতীয় ঐক্যের আবহ তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা অনেকটাই ক্ষীণ হয়েছে। এই ক্ষত সারাতে কেবল বক্তব্য বা প্রতীকী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সৎ উদ্দেশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে, যেখানে সরকার নেতৃত্ব দেবে, তবে সমাজের সব পক্ষকে সম্পৃক্ত হতে হবে। বর্তমান সরকারও সে দায় এড়াতে পারে না।

ষষ্ঠত, ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায়ও সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ–উভয়ই। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকের তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন হওয়া চুক্তিগুলো কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে। ‘বাংলাদেশ প্রথম’ অবস্থানটিই এখানে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। ভূরাজনৈতিক মাঠে সম্পৃক্ততাকে জিরো-সাম (একজনের লাভ মানেই অপরজনের ক্ষতি) গেম হিসেবে দেখলে চলবে না–পজিটিভ-সাম (ইতিবাচক) ফলাফলের দিকেই মনোযোগ দিতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি কেবল দলের কাজ নয়, এটি সরকারের দায়িত্ব জাতির স্বার্থে। 
সামগ্রিকভাবে এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। এই নির্বাচন জনগণকে নতুন আশা দিয়েছে। কিন্তু সেই আশাকে টেকসই করতে হলে নতুন সরকারকে দক্ষতা, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগোতে হবে। মর্নিং শোজ দ্য ডে, সরকারের প্রারম্ভিক দিনগুলোই সেই সকাল; যার মাধ্যমে বোঝা যাবে, বাকি সময়টা কেমন যাবে। এ ছয়টি বিষয়ের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোতে সরকার দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নেবে–এটাই প্রত্যাশা। গণতান্ত্রিক উত্তরণে দেশকে সঠিক পথেই চালাতে হবে। 

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পিপিআরসি

আরও পড়ুন

×